জিহাদ নিয়ে মশকরা করলে কি ঈমান বাকী থাকবে?
Faith and Belief · Hanafi
Question
Answer
জিহাদ নিয়ে হাসি-ঠাট্টা: আকীদার আলোকে বিধান
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ
যদি কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে জিহাদ (ইসলামের একটি ফরয বিধান) নিয়ে উপহাস করে, তাহলে তার আকীদা (বিশ্বাস) সম্পর্কে কী ধারণা রাখা উচিত? এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, যা সরাসরি ঈমান ও কুফরের সীমানা স্পর্শ করে।
উত্তরের ভিত্তি: কুরআন, হাদীস ও হানাফী ফিকহ
১. কুরআনের স্পষ্ট নির্দেশনা: সূরা আত-তওবাহ (৯:৬৫-৬৬) এ আল্লাহ বলেন:
“যদি আপনি তাদেরকে জিজ্ঞেস করেন, তবে তারা বলবে, ‘আমরা তো কেবল আলাপ ও খেলাধুলা করছিলাম।’ আপনি বলুন, ‘তোমরা কি আল্লাহ, তাঁর আয়াতসমূহ ও তাঁর রাসূলকে নিয়ে উপহাস করছিলে?’ তোমরা কোনো অজুহাত দিও না। তোমরা তো ঈমান আনার পর কাফির হয়ে গেছ।” এই আয়াতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, আল্লাহ, তাঁর আয়াত ও তাঁর রাসূল (সা.)-কে নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করলে তা কুফরী। জিহাদ একটি কুরআনি নির্দেশ, সুতরাং জিহাদকে নিয়ে উপহাস করা এই আয়াতের আওতায় পড়ে।
২. হানাফী ফিকহের উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ:
- রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবেদীন): ইমাম ইবনে আবেদীন লিখেছেন, “যদি কেউ সালাত, যাকাত, সিয়াম বা জিহাদের মতো ফরয বিধানকে তুচ্ছ জ্ঞান করে বা উপহাস করে, তবে সে শরীয়তের বিধানকে অস্বীকার করার দোষে দোষী হয়। ইচ্ছাকৃতভাবে করলে তা কুফরী গণ্য হবে।” (রদ্দুল মুহতার, কিতাবুল মুরতাদ, ৪:২৩৬)।
- ফাতাওয়া উসমানী (মুফতি তকী উসমানী): তিনি বলেন, “যে ব্যক্তি ইসলামের কোনো সুস্পষ্ট বিধানকে (যেমন জিহাদ, হিজাব, নামায) হাসি-ঠাট্টার বিষয়বস্তু বানায়, তার ঈমান সম্পর্কে সন্দেহ পোষণ করতে হবে। যদি সে তা ইচ্ছাকৃতভাবে এবং দীনের প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শনের মাধ্যমে করে, তবে সে মুরতাদ (ধর্মত্যাগী) হয়ে যাবে।” (ফাতাওয়া উসমানী, ২:৪৫৪)
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (মাওলানা আশরাফ আলী থানভী): থানভী (রহ.) উল্লেখ করেছেন, “দীনের কোনো বিষয়কে মশকরা করা ঈমানের পরিপন্থী। এতে ব্যক্তির আকীদা সম্পর্কে সতর্ক থাকা জরুরি।”
- ফাতাওয়া আলমগীরী (হিন্দিয়া): এতে বলা হয়েছে, “যে ব্যক্তি জিহাদ বা অন্য কোনো ইসলামী বিধান নিয়ে এমনভাবে ঠাট্টা করে যা দ্বারা দীনকে নিচু করা হয়, সে কাফির হয়ে যায়।” (ফাতাওয়া আলমগীরী, ২:২৬২)
৩. হাদীসের দলিল: রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন: “তোমাদের মধ্যে কেউ যেন তার ভাইকে ‘কাফির’ না বলে। যদি সে তার ভাইকে ‘কাফির’ বলে এবং সে প্রকৃতপক্ষে কাফির না হয়, তবে সেই কথা তার নিজের দিকে ফিরে আসে।” (সহীহ বুখারী, হাদীস: ৬১০৪) অর্থাৎ, কাউকে কুফরীর ফতোয়া দেওয়া সতর্কতার বিষয়। তবে নিজের মুখে কুফরী বলা ব্যক্তির জন্য মারাত্মক বিপদ।
আকীদা সম্পর্কে করণীয় ধারণা
যে ব্যক্তি জিহাদ (বা অন্য কোনো ফরয বিধান) নিয়ে হাসি-ঠাট্টা করে, তার আকীদা সম্পর্কে আমরা নিম্নোক্ত ধারণা পোষণ করব:
-
সতর্কতা ও বিচার: তার কথার পেছনে কী উদ্দেশ্য ছিল তা বিবেচ্য। যদি সে দীনের প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শন করে, দীনকে তুচ্ছ করে, অথবা জিহাদের ফরযিয়াত অস্বীকার করে, তবে সে কুফরী কাজ করেছে। তবে যদি সে অজ্ঞতা বা বেখেয়ালে বলে ফেলে, কিন্তু তার অন্তরে দীনের প্রতি সম্মান থাকে, তাহলে তাকে সতর্ক করতে হবে এবং তওবা করতে হবে।
-
আকীদার সংকট: তার এই কাজ প্রমাণ করে যে, তার ঈমান দুর্বল বা বিপর্যস্ত। ইসলামের প্রতি তার অন্তরে শ্রদ্ধার অভাব রয়েছে। তাই তাকে বিশ্বাসযোগ্য দ্বীনী ব্যক্তি হিসেবে গ্রহণ করা উচিত নয়, যতক্ষণ না সে স্পষ্টভাবে তওবা করে ও ঈমান নবায়ন করে।
-
তওবা ও ইসলাহ: তাকে নরমভাবে বোঝানো উচিত যে, এ ধরনের কথাবার্তা ঈমান নষ্ট করার কারণ। যদি সে তা বুঝতে পারে এবং অনুতপ্ত হয়, তবে তার তওবা গ্রহণযোগ্য। অন্যথায়, তার সম্পর্কে সতর্ক থাকা ওয়াজিব।
গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা
ইসলামে কারো কুফরী সাব্যস্ত করার ব্যাপারে অত্যন্ত সতর্কতা অবলম্বন করতে হয়। ইমাম আবু হানীফা (রহ.) বলেন, “কোনো ব্যক্তিকে কাফির বলার আগে তার নিকট থেকে কুফরী স্পষ্ট প্রমাণিত হতে হবে এবং তাকে হুজ্জত (দলিল) পেশ করতে হবে।” (আল-ফিকহুল আকবর) সুতরাং ব্যক্তিগতভাবে কাউকে কাফির বলার আগে আলেমের শরণাপন্ন হওয়া জরুরি।
সারসংক্ষেপ
জিহাদ নিয়ে হাসি-ঠাট্টা করা অত্যন্ত গর্হিত কাজ। এটি কুরআন ও হাদীসের সুস্পষ্ট নির্দেশনার পরিপন্থী। হানাফী ফিকহের উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ (রদ্দুল মুহতার, ফাতাওয়া উসমানী, ইমদাদুল ফাতাওয়া) অনুযায়ী, ইচ্ছাকৃতভাবে জিহাদকে উপহাস করলে তা কুফরী পর্যায়ের। তাই এ ধরনের ব্যক্তির আকীদা সম্পর্কে সতর্ক থাকা এবং তাকে তওবা ও ঈমান পুনরুদ্ধারের পরামর্শ দেওয়া উচিত।