হুরমতে মুসাহারাত সাবেত হওয়ার শর্ত ও হানাফি ফিকহের দৃষ্টিতে গায়রে মাহরাম নারীর হাত স্পর্শের বিধান।
Halal and Haram · Hanafi
Question
শ্রদ্ধেয় মুফতি সাহেবগণ,
আমি বংশের এক চাচাতো বোন কে আমার বাসায় প্রাইভেট পড়াতাম। উল্লেখ্য যে আমি বিবাহিত পুরুষ। আর সে একজন বালেগা কুমারি মে।
আমরা যৌথ পরিবারের থাকি। যে রুমে আমি প্রাইভেট পড়াতাম সেখানেও বাসার মানুষগণ আসা যাওয়া প্রাই করতো প্রাইভেট পড়ানোর সময়ে।
তো পড়ানোর মাঝে আমি যখন একটু ফাকা সময়পাই তখন তার হাত (হাত মোজা বা কাপড় ছাড়া) স্পর্শ করি।
এখানে আরেকটি বিষয় উল্লেখ করা জরুরি সেটা হলো আমি কোনো নারীর সংস্পর্শে না গেলেও রুমে একায় যখন থাকি তখন আমার যৌন উত্তেজনা হয় এবং লিঙ্গ উত্থান হয়। এটা আমার জন্য খুবই কমন একটা হালত।
তবে আমি যখন তার হাত স্পর্শ করি তখন আমার উত্তেজনা আগের থেকে বেরে গেছিলো কি না বা স্পর্শ করার কারণেই উত্তেজনা শুরু হয়েছিলো না সেটা আমি মনে করতে পারছিলাম না।
এখন একজন মুফতি সাহেবের শরণাপন্ন হই। তিনি বিস্তারিত শোনার পরে বলেন যেহেতু আপনি নিশ্চিত নন তাহলে গাবেবুন নফস হবে।
পরবর্তি সময়ে আমি ইস্তেখারা ও তাহাজ্জুদে আল্লাহর কাছে দোয়া করতে থাকি যাতে এ বিষয়ের আল্লাহ সঠিক জ্ঞান অন্তরে ঢেলে দেন।
পরে আমার অন্তরে এই দৃঢ়তা আসে যে তার হাত স্পর্শ করার আগেই আমার উত্তেজনা থাকলেও (যেহেতু কোনো নারীর সংস্পর্শে না গেলেও আমার উত্তেজনা অনুভব হয়) হাত স্পর্শ করার পরে তা নতুন করে বেরে যায় নি।
কিংবা শুধু তার হাত ধরার কারণেই আমার উত্তেজনা জাগ্রত হয়নি।
এমতাবস্থায় কি আমাদের হুরমতে মুসাহারা সাবেত হবে?
যদিও পরে আরো একজন বড়ো মুফিত সাহেবের শরণাপন্ন হয়েছিলাম, তিনি বলেছিলেন যদি হাত স্পর্শ করার আগেই যৌন উত্তেজনা থাকে এবং স্পর্শ করার পরে তা অপরিবর্তিত থাকে বা বেরে না যায় তাহলে মুসাহারা সাবেত হবে না।
আর যদি স্পর্শ করার পরে উত্তেজনা আরো বেরে যায় বা স্পর্শ করার সাথে সাথে উত্তেজনা শুরু হয় তাহলে মুসাহারা সাবেত হয়ে যাবে।
যেহেতু আমার বর্তমান হালত অনুযায়ী এটি জানা এবং কনফার্ম হওয়া খুবই জরুরী। তাই আবারো আপনাদের শরণাপন্ন হলাম যাতে শতভাগ আমি পরিস্কার হতে পারি।
দয়া করে যদি উত্তর জানাতেন খুবই ভালো হতো।
জাযাকাল্লাহু খাইরান কাসিরান।
Answer
উত্তর:
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রশ্নটির জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। আপনার বর্ণিত পরিস্থিতি অত্যন্ত স্পর্শকাতর এবং সতর্কতার দাবি রাখে। আমরা হানাফি ফিকহের মূলনীতি ও নির্ভরযোগ্য কিতাবের আলোকে উত্তর প্রদান করছি।
হুরমতে মুসাহারার শর্ত:
হুরমতে মুসাহারা (বিবাহের কারণে সম্পর্ক হারাম হয়ে যাওয়া) সাবেত হওয়ার জন্য শাহওয়াত (যৌন উত্তেজনা) সহ স্পর্শ করা আবশ্যক। এই উত্তেজনার মানদণ্ড হলো লিঙ্গ উত্থান (ইনতিশার) বা প্রবল যৌন আকর্ষণ। (সূত্র: রদ্দুল মুহতার, ৩/৪১৮; ফাতাওয়া আলমগীরী, ১/২৭১)
হানাফি ফিকহের বিশিষ্ট ইমামগণ বলেছেন:
"يَثْبُتُ بِمَسِّ امْرَأَةٍ أَجْنَبِيَّةٍ بِشَهْوَةٍ حُرْمَةُ الْمُصَاهَرَةِ"
"বেগানা নারীর শরীরে শাহওয়াত সহ স্পর্শ করলে হুরমতে মুসাহারা সাবেত হয়।"
(আল-হিদায়া, ২/৩২৪; বাদাইউস সানাই, ৪/৩৩)
আপনার অবস্থার বিশ্লেষণ:
- আপনি উল্লেখ করেছেন যে, নারীর সংস্পর্শ ছাড়াই আপনার সাধারণত উত্তেজনা (লিঙ্গ উত্থান) হয়ে থাকে। এটি আপনার জন্য একটি 'কমন' অবস্থা।
- আপনি নিশ্চিত যে, তার হাত স্পর্শ করার পূর্বেই আপনার উত্তেজনা বিদ্যমান ছিল।
- আপনি আরও নিশ্চিত যে, হাত স্পর্শ করার পরে আপনার উত্তেজনা আর বাড়েনি বা নতুন করে সৃষ্টি হয়নি।
এই অবস্থায় দ্বিতীয় মুফতি সাহেবের বক্তব্যই হানাফি ফিকহের মূলনীতির সাথে অধিক সামঞ্জস্যপূর্ণ। কারণ:
- হুরমতে মুসাহারা সাবেত হওয়ার জন্য স্পর্শের কারণেই উত্তেজনা সৃষ্টি হওয়া বা বেড়ে যাওয়া জরুরি। যদি উত্তেজনা পূর্ব থেকে থাকে এবং স্পর্শের কারণে তা অপরিবর্তিত থাকে, তাহলে তা 'শাহওয়াত সহ স্পর্শ' হিসেবে গণ্য হবে না। (সূত্র: ইমদাদুল ফাতাওয়া, ২/৩৬২; ফাতাওয়া উসমানী, ২/৪২৫)
- প্রথম মুফতি সাহেব 'গাবেবুন নফস' (অনিশ্চয়তার কারণে নফসের দায়িত্ব) বলেছেন, যা সতর্কতামূলক বক্তব্য। কিন্তু যেহেতু আপনি ইস্তেখারা ও তাহাজ্জুদের পর অন্তরে দৃঢ়তা পেয়েছেন যে, স্পর্শের কারণে উত্তেজনা বৃদ্ধি পায়নি, তাই সেই অবস্থাকেই প্রাধান্য দিয়ে ফতোয়া দেওয়া হবে।
সিদ্ধান্ত:
আপনার বর্ণনা ও অন্তরে প্রাপ্ত দৃঢ়তার ভিত্তিতে, আপনার ক্ষেত্রে হুরমতে মুসাহারা সাবেত হবে না। অর্থাৎ, আপনার স্ত্রী ওই মেয়েটির সাথে আপনার বৈবাহিক সম্পর্ক পূর্বের মতোই বৈধ থাকবে। ওই মেয়েটির সাথেও কোনো হারাম সম্পর্ক তৈরি হবে না।
তবে গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা:
- এটি কোনো বৈধতার সনদ নয়: আপনি যে কাজ করেছেন (গায়র মাহরাম নারীর হাত স্পর্শ) তা সম্পূর্ণ হারাম ও কবিরা গুনাহ। এটি তওবা ছাড়া মাফ হবে না।
- তওবা করুন: আপনার এই কাজের জন্য অবশ্যই আল্লাহর কাছে তওবা ও ইস্তিগফার করতে হবে এবং ভবিষ্যতে এমন কাজ থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকার সংকল্প করতে হবে।
- সতর্কতা অবলম্বন করুন: একজন বিবাহিত পুরুষের জন্য অপর নারীর সাথে নির্জনে (খালওয়াত) থাকা, অযথা স্পর্শ করা ইত্যাদি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। আপনার উচিত এই ধরনের পরিস্থিতি এড়িয়ে চলা।
আপনার জন্য নির্দেশনা:
- আপনার স্ত্রীর সাথে সম্পর্ক: আপনার স্ত্রী আপনার জন্য হালাল। এতে কোনো সন্দেহ নেই।
- ওই মেয়েটির সাথে সম্পর্ক: আপনার চাচাতো বোন আপনার জন্য গায়র মাহরাম। তার সাথে পর্দা করা, দেখা-সাক্ষাৎ ও কথা বলার ক্ষেত্রে শরয়ি সীমা মেনে চলা জরুরি। তাকে প্রাইভেট পড়ানোর সময়ও শারীরিক স্পর্শ থেকে বিরত থাকতে হবে।
- ভবিষ্যতের জন্য শিক্ষা: এই ধরনের পরিস্থিতি থেকে নিজেকে দূরে রাখুন। ইচ্ছাকৃতভাবে গায়র মাহরাম নারীর সাথে স্পর্শ বা নির্জনতা হারাম।
“কিন্তু এই ফতোয়ার অর্থ এই নয় যে, আপনার কাজটি বৈধ ছিল। বরং আপনার কাজ ছিল নাজায়েয ও গুনাহ। তাই তওবা করা এবং ভবিষ্যতে এ থেকে বিরত থাকা আপনার জন্য একান্ত জরুরি।”
মোটকথা: আপনার হুরমতে মুসাহারা সাবেত হওয়ার শর্ত পূর্ণ হয়নি। তবে আপনাকে অবশ্যই তওবা করতে হবে এবং ভবিষ্যতে গায়র মাহরামের সাথে স্পর্শ বা খালওয়াত থেকে বিরত থাকতে হবে।
**জাযাকাল্লাহু খাইরান।