প্রতারণা করে বিয়ে করার বিধান কি?
Marriage and Divorce · Ahle Hadith / Salafi
Question
Answer
দ্বিতীয় স্বামীকে তালাক দিয়ে প্রথম স্বামীকে গ্রহণ করার ইসলামি বিধান
প্রশ্নের উত্তর
প্রথমেই বিষয়টি পরিষ্কার করা জরুরি যে, ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে এই পরিস্থিতি অত্যন্ত জটিল এবং এর সমাধানের জন্য কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট হতে হবে।
প্রথম বিবাহের অবস্থা
প্রথম স্বামী বিয়ের কাগজ ছিঁড়ে ফেলা এবং যোগাযোগ বন্ধ করে দেওয়া তালাক হিসেবে গণ্য হয় না। তালাকের জন্য স্বামীকে স্পষ্টভাবে তালাকের শব্দ উচ্চারণ করতে হবে অথবা লিখিতভাবে তালাক দিতে হবে। কেবল কাগজ ছিঁড়ে ফেলা বা যোগাযোগ বন্ধ করে দেওয়া তালাক নয়। সুতরাং প্রথম বিবাহ আইনত এখনও বহাল থাকতে পারে যদি স্বামী তালাক না দিয়ে থাকে।
দ্বিতীয় বিবাহের বৈধতা
যদি প্রথম বিবাহ তালাকের মাধ্যমে শেষ না হয়, তাহলে দ্বিতীয় বিবাহ শরিয়তসম্মত নয়। কারণ একই নারী একই সময়ে দুই স্বামী রাখতে পারেন না।
- কুরআনে বলা হয়েছে: "আর তোমরা বিবাহ করো না সেই নারীদের, যাদেরকে তোমাদের পিতা বিবাহ করেছেন... তবে যা অতীতে হয়ে গেছে তা ক্ষমা..." (সূরা আন-নিসা: ২২) এবং "আর তোমরা একসঙ্গে দুই বোনকে বিবাহ করতে পারবে না..." (সূরা আন-নিসা: ২৩) - এ থেকে বোঝা যায় একাধিক স্বামী রাখা নিষিদ্ধ।
দ্বিতীয় স্বামী থেকে বিচ্ছেদের প্রয়োজনীয়তা
যেহেতু প্রথম বিবাহ এখনও বহাল থাকার সম্ভাবনা রয়েছে, সেহেতু দ্বিতীয় বিবাহ বাতিল বলে গণ্য হবে। দ্বিতীয় স্বামীর সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করা জরুরি। তবে দ্বিতীয় স্বামী যদি তালাক দিতে রাজি না হন, তাহলে নারী খুলা বা ফাসখের মাধ্যমে বিচ্ছেদ চাইতে পারেন।
প্রথম স্বামীকে গ্রহণ করার শর্ত
শায়খ ইবন বাজ (রহ.) বলেছেন: যদি কোনো নারী তার স্বামী থেকে পৃথক হয়ে থাকে এবং স্বামী তালাক না দিয়ে থাকে, তাহলে স্ত্রী অন্যত্র বিবাহ করতে পারবে না। আর যদি দ্বিতীয় বিবাহ করে ফেলে, তাহলে তা বাতিল এবং তাকে প্রথম স্বামীর কাছেই ফিরে যেতে হবে। (মাজমু ফাতাওয়া, ২০/৪৪৭)
শায়খ ইবন উসাইমীন (রহ.) বলেন: যদি প্রথম স্বামী তালাক না দিয়ে থাকে এবং স্ত্রী জেনে-শুনে বা না জেনে দ্বিতীয় বিবাহ করে, তাহলে দ্বিতীয় বিবাহ বাতিল এবং তাকে প্রথম স্বামীর কাছে ফিরে যেতে হবে। (শরহুল মুমতি', ১২/২৫০)
শায়খ আল-আলবানী (রহ.) বলেন: নারীর জন্য একই সময়ে দুই স্বামী রাখা জায়েজ নেই। যদি কেউ এমন করে, তাহলে দ্বিতীয় বিবাহ বাতিল এবং প্রথম বিবাহ বহাল থাকবে। (সিলসিলাতুল হুদা ওয়ান নূর, ২/২৮৪)
গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা
১. প্রথম স্বামীর চরিত্র: তিনি বিয়ের কাগজ ছিঁড়ে ফেলেছেন, সব অস্বীকার করেছেন, তালাক না দিয়ে স্ত্রীকে ফেলে রেখেছেন - এটি অত্যন্ত নিকৃষ্ট আচরণ। কেবল "আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইছি" বলা যথেষ্ট নয়, বরং তার তওবার সত্যতা প্রমাণ করতে হবে এবং ভবিষ্যতে স্ত্রীর প্রতি দায়িত্ব পালনের নিশ্চয়তা দিতে হবে।
২. নারীর ইচ্ছা: নারীকে জোর করে প্রথম স্বামীর কাছে ফিরিয়ে দেওয়া যাবে না। তার নিজের ইচ্ছা ও পছন্দকে গুরুত্ব দিতে হবে।
৩. দ্বিতীয় স্বামীর অধিকার: দ্বিতীয় স্বামী যদি বিয়ে ঠিকভাবে করে থাকে এবং তার দোষ না থাকে, তাহলে তাকে ন্যায়সঙ্গতভাবে তালাক বা বিচ্ছেদ দিতে হবে।
চূড়ান্ত মতামত
এই পরিস্থিতিতে নিম্নলিখিত পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত:
১. প্রথমে দ্বিতীয় স্বামীর সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করুন - তালাক, খুলা অথবা ফাসখের মাধ্যমে।
২. প্রথম স্বামীর তওবা যাচাই করুন - তিনি কি সত্যিই পরিবর্তিত হয়েছেন? ভবিষ্যতে স্ত্রীর প্রতি দায়িত্ব পালনের সক্ষমতা ও ইচ্ছা তার আছে কি?
৩. প্রথম স্বামীকে গ্রহণ করা সম্পূর্ণ নারীর ইচ্ছাধীন - তাকে জোর করা যাবে না। যদি নারী তাকে গ্রহণ করতে রাজি থাকে, তবে তা সম্ভব। আর যদি না চায়, তাহলে প্রথম স্বামীকেও তালাক দিতে বলতে পারে অথবা বিচ্ছেদের জন্য আদালতে যেতে পারে।
৪. কোনো অবস্থাতেই একই সময়ে দুই স্বামী রাখা জায়েজ নয় - দ্বিতীয় স্বামী থেকে বিচ্ছেদের আগে প্রথম স্বামীর সাথে পুনরায় সম্পর্ক স্থাপন করা যাবে না।
শায়খুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ (রহ.) বলেন: "যদি কোনো নারী তার স্বামীর জীবদ্দশায় এবং তালাক ছাড়াই অন্য স্বামী গ্রহণ করে, তাহলে দ্বিতীয় বিবাহ বাতিল এবং প্রথম বিবাহ বহাল থাকবে।" (মাজমু ফাতাওয়া, ৩২/২৮২)
শায়খ সালেহ আল-ফাওযান (হাফি.) বলেন: "এক নারীর জন্য একই সময়ে একাধিক স্বামী রাখা হারাম এবং এটি ইসলামের আগে জাহিলিয়্যার প্রথা ছিল।" (আল-মুনতাকা, ৩/২৫০)
উপসংহার
এই জটিল পরিস্থিতিতে একজন আলেম বা ইসলামি বিচারকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত। যেহেতু প্রথম স্বামী কখনো তালাক দেননি, তাই প্রথম বিবাহ এখনও বহাল থাকতে পারে। দ্বিতীয় বিবাহ সেই অবস্থায় বাতিল বলে গণ্য হবে। তবে নারী যদি প্রথম স্বামীকে না চান, তাহলে তিনি তালাক বা বিচ্ছেদ চাইতে পারেন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো নারীর কল্যাণ ও তার ইচ্ছাকে সম্মান করা।
আল্লাহ সবচেয়ে ভালো জানেন।