স্বামীর দেওয়া শর্ত (তালাকের শর্ত) ভঙ্গ নিয়ে ওয়াসওয়াসা?
Waswasa-OCD · Ahle Hadith / Salafi
Question
আমার স্বামী আমাকে শর্ত দেয় "আমার তোমার রাগ ওই সময় যদি তুমি তোমার অতীতের ওই ব্যাক্তি (একজন নির্দিষ্ট লোক) ওনার নাম নাও বা বলো মিন করো আমি ওর সাথে খুশি ছিলাম ওকে মেসেজ দেই, ওর সাথে দেখা করি আমাকে ও কত বুঝত ব্যাস এসব করলেই তালাক হয়ে যাবে" মানে ওই ব্যক্তির নামই নেওয়া যাবে না বা কোন ধরনের কথা তাকে নিয়ে " এটুকু ছিল তার নির্দিষ্ট কথপোকথন এক্সাক্টলি। মানে ওই নির্দিষ্ট ব্যাক্তি নাম নেওয়াই যাবে না বা কোন ধরনের কথা
এরপর থেকে আমি খুব সাবধানে আছি যেন শর্ত ভঙ্গ না হয় তো আমার মার কাছে গতকাল কান্না করে স্বামীর কথা বলছিলাম, তখন মা রাগে ওই শর্তে উল্লেখ করা ব্যাক্তির নাম নেয় আমি সাথে সাথে বলি চুপ কর শর্ত আছে আমার উপর এসব বলো না নামও নিও না চুপ। তখন মা বলে তোর এসব কান্না তো অতীতেও দেখছি (ওই শর্তে উল্লেখ করা ব্যক্তির কথা বুঝায়) আমি বলি মা আগেও কান্না করছি কিন্তু এখন দেখো অনেক আগে এতো টাও কান্নাকাটি করি নাই। (এখানে কান্না করা দিয়ে বুঝাই শর্তে উল্লেখিত ব্যক্তির সাথে এতো কান্না করি নাই আবারো বলছি আমি বুঝাই এখানে কান্না করা দিয়ে বুঝাই শর্তে উল্লেখিত ব্যক্তির সাথে এতো কান্না করি নাই ) এটাই আমার মেইন ওয়াস ওয়াসা দিচ্ছে কারণ কথা তো আমার মা ওই শর্তের ব্যক্তির ব্যাপারে বলে আমিও তাকে বুঝিয়ে বললাম । আর একটা প্রশ্ন এখানে মাশয়ালা জানার জন্য এসব লিখছি কিছু হবে?
এখন আমি অনেক পেরেশানি তে আছি যে আমার কান্নার কথা বলার জন্য শর্ত ভঙ্গ হলো কিনা দয়া করে একটা উত্তর দেন। এই ঘটনার পর আবারো বলছি এই ঘটনার পর আমার স্বামীকে এরপর আমি শর্ত সম্পর্কে আবার জিজ্ঞেস করি সে বলে যে শর্ত দিয়ে সে এটা বুঝিয়েছেন যাতে তার তার সামনে ওই ব্যাক্তির কথা না বলি অতীত নিয়ে শুধুমাত্র তার কথাই নাকি বুঝিয়েছেন। কেননা আমি স্বামীর সামনে নাম নিয়েছিলাম বলে এর জন্যই স্বামী শুধুমাত্র শর্ত দিয়েছেন। স্বামীকে শর্ত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করার জন্য কি শর্ত ভঙ্গ হবে? কেননা জিজ্ঞেস করার সময় শর্তে উল্লেখিত ব্যক্তি নিয়ে কথা হয়
Answer
উত্তর দেওয়ার পূর্বে গুরুত্বপূর্ণ নোট:
প্রশ্নকারী বোন, আপনি ওয়াসওয়াসায় (মানসিক দুশ্চিন্তা) ভুগছেন। শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়্যাহ ও শাইখ আল-আলবানী রহ. বলেন, ওয়াসওয়াসা শয়তানের পক্ষ থেকে আসে এবং তা বর্জন করা ওয়াজিব। আপনি যেসব বিষয় নিয়ে উদ্বিগ্ন, সেগুলোর অধিকাংশই শয়তানের কুমন্ত্রণা। দয়া করে নিচের উত্তর মনোযোগ দিয়ে পড়ুন এবং আশ্বস্ত হন।
১. প্রথম প্রশ্ন: মায়ের সাথে কথোপকথনের কারণে কি শর্ত ভঙ্গ হয়েছে?
উত্তর: না, আপনার শর্ত ভঙ্গ হয়নি। নিম্নোক্ত কারণে:
ক. শর্তের সুস্পষ্ট বক্তব্য:
আপনার স্বামী শর্ত দিয়েছেন— “তুমি যদি তার নাম নাও, বা বলো যে তুমি তার সাথে খুশি ছিলে, বা তাকে মেসেজ দাও, বা তার সাথে দেখা করো… তাহলে তালাক।”
আপনার মায়ের সাথে আলোচনায় আপনি তার নাম নেননি, তার সাথে সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের কোনো ইচ্ছা প্রকাশ করেননি, বরং আপনি স্বামীর সাথে আপনার সমস্যার কথা বলছিলেন। মা যে নামটি উচ্চারণ করেছেন, তা আপনার ইচ্ছায় হয়নি; বরং আপনি সাথে সাথে তাকে থামিয়ে দিয়েছেন। কুরআন ও হাদীসে বাধ্য হয়ে বা ভুলে কিছু বললে তা ধরা হয় না:
رَبَّنَا لَا تُؤَاخِذْنَا إِنْ نَّسِينَا أَوْ أَخْطَأْنَا
“হে আমাদের রব! আমরা যদি ভুলে যাই বা ভুল করি, তবে আমাদের পাকড়াও করো না।” (সূরা বাকারা: ২৮৬)
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: “إِنَّ اللَّهَ تَجَاوَزَ عَنْ أُمَّتِي الْخَطَأَ وَالنِّسْيَانَ وَمَا اسْتُكْرِهُوا عَلَيْهِ”
“নিশ্চয়ই আল্লাহ আমার উম্মতের ভুল, বিস্মৃতি এবং যা করতে বাধ্য করা হয় তা ক্ষমা করে দিয়েছেন।” (ইবনু মাজাহ, সহীহ)
খ. আপনি সচেতনভাবে শর্ত রক্ষার চেষ্টা করেছেন:
আপনি মাকে সাথে সাথে ‘চুপ’ করতে বলেছেন এবং নাম না নিতে বলেছেন। এটি প্রমাণ করে আপনি শর্ত ভঙ্গের ইচ্ছা পোষণ করেননি বরং তা থেকে বিরত থেকেছেন। শর্ত ভঙ্গের জন্য ইচ্ছা ও জ্ঞান প্রয়োজন; আপনার তা নেই।
গ. মায়ের কথার জবাবে আপনি যা বলেছেন:
আপনি বলেছেন: “মা আগেও কান্না করছি কিন্তু এখন অনেক আগের চেয়ে কম করি।”
এখানে আপনি অতীতের কষ্টের মাত্রা বোঝাতে ‘কান্না’র কথা বলেছেন, সেই ব্যক্তির প্রতি ভালোবাসা বা যোগাযোগের ইচ্ছা নয়। এটি শর্তের আওতাভুক্ত নয়।
ঘ. শাইখ ইবনু উসাইমীন রহ. বলেন:
“শর্তযুক্ত তালাক তখনই কার্যকর হয় যখন শর্তটি ইচ্ছাকৃতভাবে পূর্ণ করা হয়। যদি কেউ ভুলে বা অনিচ্ছায় তা করে, তবে তালাক হয় না।” (আশ-শারহুল মুমতি‘)
সুসংবাদ:
আপনার কথোপকথনের মাধ্যমে শর্ত ভঙ্গ হয়নি। আপনি নিরাপদ।
২. দ্বিতীয় প্রশ্ন: শর্ত সম্পর্কে স্বামীকে জিজ্ঞাসা করায় কি শর্ত ভঙ্গ হবে?
উত্তর: না, ভঙ্গ হবে না। কারণ:
- আপনি শুধুমাত্র শর্তটির ব্যাখ্যা জানতে চেয়েছেন, সেই ব্যক্তির প্রশংসা বা যোগাযোগের উদ্দেশ্য নয়।
- স্বামী নিজেই বলেছেন, তার উদ্দেশ্য ছিল শুধু তার সামনে ওই ব্যক্তির কথা না বলা। এখন আপনি তার কাছ থেকে স্পষ্টীকরণ চেয়েছেন—এতে কোনো শর্ত ভঙ্গ হয়নি।
- শাইখ সালিহ আল-ফাওযান হাফিযাহুল্লাহ বলেন: “শর্ত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা এবং তা বুঝার চেষ্টা করা শর্ত ভঙ্গের অন্তর্ভুক্ত নয়, বরং তা জ্ঞান অর্জনের অংশ।”
অতএব, এ নিয়েও দুশ্চিন্তার কিছু নেই।
৩. তৃতীয় প্রশ্ন: ওয়াসওয়াসার কারণে কি কোনো সমস্যা হবে?
উত্তর: না, বরং ওয়াসওয়াসা মোকাবেলা করা আপনার কর্তব্য। শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়্যাহ ও ইবনুল কাইয়্যিম রহ. বলেন:
- ওয়াসওয়াসাকে গুরুত্ব দেওয়া শয়তানের ফাঁদ।
- রাসূল ﷺ বলেছেন: “إِنَّ اللَّهَ تَجَاوَزَ لِأُمَّتِي مَا حَدَّثَتْ بِهِ أَنْفُسَهَا مَا لَمْ تَتَكَلَّمْ أَوْ تَعْمَلْ”
“নিশ্চয়ই আল্লাহ আমার উম্মতের মনে যা খেয়াল আসে তা ক্ষমা করবেন, যতক্ষণ না তারা তা বলে বা কাজ করে।” (বুখারী ও মুসলিম)
আপনার মনে যে সন্দেশ এসেছে যে ‘হয়তো শর্ত ভঙ্গ হয়েছে’—এটি শয়তানের ওয়াসওয়াসা। আপনি তা প্রত্যাখ্যান করুন এবং ইস্তিগফার পড়ুন।
সংক্ষিপ্ত ফতোয়া:
- আপনার শর্ত ভঙ্গ হয়নি। আপনি ও আপনার মায়ের কথোপকথন শর্তের আওতাভুক্ত নয়।
- শর্ত সম্পর্কে স্বামীকে জিজ্ঞাসা করায় কিছু হয়নি।
- আপনার দুশ্চিন্তা ওয়াসওয়াসা; এটি বর্জন করুন এবং আল্লাহর উপর ভরসা রাখুন।
- স্বামীর সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক রাখুন এবং শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে দূরে থাকুন।
সুপারিশ:
- আপনার স্বামীকে বিষয়টি বুঝিয়ে দিন যে আপনি তার শর্ত মানতে চান এবং অনিচ্ছাকৃত কোনো কথা হলে তা ক্ষমা করতে বলুন।
- ওয়াসওয়াসা কমানোর জন্য নিয়মিত জিকির করুন, বিশেষ করে সূরা নাস ও ফালাক পড়ুন।
- প্রয়োজনে একজন আলিমের সাথে সরাসরি যোগাযোগ করুন।
আল্লাহই সর্বজ্ঞ।