দাতা যদি মাদ্রাসার দরিদ্র ছাত্রের হাতে যাকাতের টাকা দিয়ে “মাদ্রাসায় পৌঁছে দেওয়ার” নির্দেশ দেয়, এবং ছাত্রটি খরচ করে ফেলে তাহলে যাকাত কি আদায় হবে?

Zakat and Charity · Hanafi

Question No: 2623
Questioner: HUJAIFA SAJID
Question Asked: 13 Jul 2026, 01:35 AM
Reviewed & Published: 13 Jul 2026, 02:42 AM
Views: 51
Tokens: 7,266
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আমাদের সমাজে বিভিন্ন মাদ্রাসা বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আছে, যেখানে দরিদ্র ছাত্রদের পড়াশোনা, থাকা-খাওয়া, ভর্তি, এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় খরচ যাকাতের অর্থ দিয়ে বহন করা হয়। সাধারণভাবে একজন দাতা ব্যক্তি যখন বলেন, “আমি মাদ্রাসায় এই পরিমাণ যাকাত দিলাম,” তখন তিনি বাস্তবে বুঝিয়ে থাকেন যে, এই টাকা মাদ্রাসার যাকাত ফান্ডে যাবে এবং পরে মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ তা দরিদ্র ও যাকাতের হকদার ছাত্রদের প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যয় করবে।

এখন প্রশ্ন হলো: কোনো ব্যক্তি যদি মাদ্রাসার একজন দরিদ্র ছাত্রের হাতে যাকাতের টাকা দিয়ে বলেন, “এটা তোমাদের মাদ্রাসায় দিয়ে দিও” বা “আমি তোমাদের মাদ্রাসার জন্য যাকাত দিলাম”—এভাবে স্বাভাবিক সামাজিক রীতিতে টাকা প্রদান করেন, তাহলে ঐ ছাত্রকে কি উকিল হিসেবে গণ্য করা হবে, যেন সে তা মাদ্রাসার যাকাত ফান্ডে পৌঁছে দেয়?

কিন্তু যদি ঐ ছাত্র, যে নিজেও ওই মাদ্রাসার দরিদ্র ছাত্র এবং যাকাতের হকদার, উক্ত টাকা ফান্ডে জমা না দিয়ে এই ভেবে নিজেই ব্যবহার করে ফেলে যে, যাকাতের অর্থ তো মাদ্রাসার দরিদ্র ছাত্রদের জন্যই, আর আমিও এই মাদ্রাসার দরিদ্র ছাত্রদের একজন—তাহলে কি তার এভাবে টাকা ব্যবহার করা শরঈভাবে বৈধ হবে?আর এভাবে কি দাতার যাকাত আদায় হয়েছে বলে গণ্য হবে?

অন্যভাবে বললে, দাতার উদ্দেশ্য যদি হয় মাদ্রাসার দরিদ্র ছাত্রদের জন্য যাকাত প্রদান, এবং ছাত্রটিকে তিনি সমাজে প্রচলিত রীতিতে শুধু পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যম হিসেবে দেন, তাহলে ঐ ছাত্র যদি তা ফান্ডে না দিয়ে নিজেই খরচ করে ফেলে, সে ক্ষেত্রে হানাফি ফিকহ অনুযায়ী যাকাতের হুকুম কী হবে?

Answer

উত্তর:
আপনার প্রশ্নটি হানাফি ফিকহের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাসআলা। সংক্ষেপে বলতে গেলে, উক্ত ছাত্রটি দাতার পক্ষ থেকে উকিল (প্রতিনিধি) হিসেবেই গণ্য হবে। দাতা তাকে যাকাতের টাকা দিয়ে স্পষ্টভাবে বলেছেন, “এটা তোমাদের মাদ্রাসায় দিয়ে দিও” বা “আমি তোমাদের মাদ্রাসার জন্য যাকাত দিলাম”—এর দ্বারা বোঝা যায়, ছাত্রটি শুধু পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যম। তাই সে নিজে সেই টাকা ব্যবহার করতে পারবে না। যদি সে তা নিজে খরচ করে ফেলে, এবং সে নিজেও দরিদ্র হয়, তাহলে দাতার যাকাত আদায় হয়ে যাবে। তবে এক্ষেত্রে ছাত্রর জন্য অনধিকার হস্তক্ষেপ হবে।

বিস্তারিত বিশ্লেষণ:

১. উকিল হিসেবে গণ্য হওয়া

হানাফি ফিকহ অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি যদি অপর ব্যক্তিকে বলে, “অমুক ফকিরকে এই টাকা দিয়ে দাও” বা “অমুক জায়গায় পৌঁছে দাও”, তাহলে সে ব্যক্তি উকিল হিসেবে গণ্য হয় এবং তার কর্তব্য হলো নির্দেশ অনুযায়ী টাকা পৌঁছে দেওয়া। নিজে ব্যবহার করার কোনো অধিকার তার নেই।
(রদ্দুল মুহতার, ২:২৬৭; ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১:১৮৯)

এখানে দাতা ছাত্রটিকে বলেন, “এটা তোমাদের মাদ্রাসায় দিয়ে দিও” বা “মাদ্রাসার জন্য যাকাত দিলাম”—সুতরাং ছাত্রটি মাদ্রাসার যাকাত ফান্ডে পৌঁছে দেওয়ার জন্য উকিল।

২. নিজে ব্যবহার করলে যাকাত আদায় হবে যদি ছাত্রটি নিজে যাকাত গ্রহণের উপযুক্ত হয়।

যদি উকিল (এখানে ছাত্র) নির্দেশ অমান্য করে নিজেই টাকা ব্যবহার করে ফেলে, তাহলে দাতার উদ্দেশ্য পূরণ হয়ছে বলে যাকাত আদায় হয়ে যাবে। কারণ যাকাতের টাকা অবশ্যই দাতার নিয়ত ও নির্ধারিত হকদার পর্যন্ত পৌঁছাতে হবে। এখানে দাতার নিয়ত ছিল মাদ্রাসার দরিদ্র ছাত্রদের জন্য, এবং ঐ ছাত্রটিও হকদার তথা দরিদ্র। তবে দাতার উদ্দেশ্যর খেলাফ হওয়ার কারণে ছাত্রটি গোনাহগার হবে।
(ফাতাওয়া উসমানি, ২:৪২৭; ইমদাদুল ফাতাওয়া, ২:১১৫)

৩. ছাত্রটি নিজেও হকদার—এটা কী পরিবর্তন করে?

ছাত্রটি নিজেও মাদ্রাসার দরিদ্র ছাত্র এবং যাকাতের হকদার—এটা সত্য। কিন্তু দাতা তাকে ব্যক্তিগতভাবে হকদার হিসেবে চিহ্নিত করে দেননি; বরং তাকে পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যম বানিয়েছেন। তাই সে নিজে হকদার হলেও দাতার নির্দেশ অমান্য করে টাকা নিজের জন্য ব্যবহার করতে পারে না। যদি সে ব্যবহার করে, তাহলে দাতার যাকাত আদায় হলেও সে গোনাহগার হবে। তবে যদি দাতা পরে জানতে পেরে সন্তুষ্টচিত্তে তা তার জন্য দান বলে গণ্য করে, তাহলে নতুন করে নিয়ত করে যাকাত আদায় করতে হবে না—কিন্তু এ পর্যন্ত তা বৈধ নয়।
(আল-হিদায়া, ১:২০৪; শরহু মাআনিল আসার, ২:১২৩)

৪. করণীয়

  • যদি ছাত্রটি ইতিমধ্যে টাকা ব্যবহার করে ফেলে, তাহলে সে পরিমাণ টাকা ফেরত দেওয়া ছাত্রটির উপর ওয়াজিব। দাতাকে অথবা মাদ্রাসার যাকাত ফান্ডে জমা দিতে হবে।
  • দাতা যদি চান, তাহলে পুনরায় সেই টাকা (বা সমপরিমাণ) উক্ত ছাত্রকে ব্যক্তিগতভাবে যাকাত হিসেবে দিয়ে দিতে পারেন—এতে যাকাত আদায় হবে।
  • উত্তম পদ্ধতি হলো: দাতা সরাসরি মাদ্রাসার যাকাত ফান্ডে টাকা জমা দেবেন অথবা সরাসরি একজন যোগ্য দরিদ্র ছাত্রকে হাতে দিয়ে বলবেন, “এটা আমি তোমাকে যাকাত দিলাম।” তখন ছাত্রটি তা নিজে ব্যবহার করতে পারবে।

সংক্ষিপ্ত উত্তর:
প্রদত্ত পরিস্থিতিতে ছাত্রটি উকিল। নিজে ব্যবহার করলে দাতার যাকাত আদায় হবে। তবে দাতার উদ্দেশ্য পরিপন্থী হওয়ার কারণে তাকে টাকা ফেরত দিতে হবে বা মাদ্রাসার ফান্ডে জমা দিতে হবে।

সূত্র:

  • রদ্দুল মুহতার (২:২৬৭)
  • ফাতাওয়া হিন্দিয়া (১:১৮৯)
  • ফাতাওয়া উসমানি (২:৪২৭)
  • ইমদাদুল ফাতাওয়া (২:১১৫)
  • আল-হিদায়া (১:২০৪)

This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.