আত্মীয়ের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করা কখন জায়েজ?

Family Life · Hanafi

Question No: 2590
Questioner: Sabikunnahar Sumaiya
Question Asked: 12 Jul 2026, 03:02 PM
Reviewed & Published: 12 Jul 2026, 03:08 PM
Views: 67
Tokens: 8,709
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আর্জেন্ট এপ্রুভ।
লেখা বড় হওয়ার জন্য দুঃখিত।দয়া করে পুরোটা পড়ে উত্তর জানাবেন।

আমার কিছু নিকট আত্মীয়স্বজন(বাবা মা উভয় পক্ষের)রয়েছেন যারা কোনোভাবেই আমাদের ভালো চান না।ধারণা করা হয় বা অধিকাংশ ক্ষেত্রে কিছু প্রমাণ ও পাওয়া যায় যে তাদের(বাবার পক্ষ)কর্তৃক আমার পুরো পরিবার অনেক দীর্ঘ সময় ধরে যাদু দ্বারা ক্ষতিগ্রস্থ।যাতে করে আমরা কখনোই স্বাভাবিকভাবে জীবনযাপন করতে পারিনি আজ অব্ধিও।
বাবার বাড়ির লোকেরা বিভিন্ন কাজ দ্বারা বুঝিয়েও দিয়েছেন তারা আমাদের ভালোবাসেন না।তারা চান না তাদের সাথে আমাদের মেলামেশা থাকুক।সামাজিকতার খাতিরে শুধু লোক দেখানো সম্পর্কটুকুই বজায় রাখছেন বা তাদের ভাইকে খুশি রাখতে যতটুকু প্রয়োজন।

মায়ের পক্ষের আত্মীয়(শুধু এক দল)সরাসরি বলেছেন তারা আর সম্পর্ক রাখতে চান না।আর যেনো যোগাযোগ না করা হয়।যদিও সেটা এখন অস্বীকার যাচ্ছেন।
এ অব্ধি তারা হাজারভাবে আমাদের জঘন্যভাবে ঠকিয়েছেন।বারবার লাঞ্চিত করেছেন।অন্যায়ভাবে অপমান করেছেন।অপবাদ দিয়েছেন।আমরা সব ভুলে গিয়ে বারবার মিলে গেলেও তারা সেই একইভাবেই আমাদের ক্ষতি করতে থাকেন।আমার আব্বা আম্মা এই শেষ বয়সে এসেও মারাত্মকভাবে আহত তাদের এসব ব্যবহারে।সেই বিয়ে থেকে(৩২-৩৩বছর) ভুগে আসছেন, আমরাও ভুগছি।

এমতাবস্থায় আমরা যদি এখন থেকে তাদের সাথে দুরত্ব মেইনটেইন করি।যোগাযোগ না রাখি বা ফরমাল কানেকশান টুকু রাখি।তাদের দেয়া কোনো উপহার(যেগুলো মূলত তারা কি ভেবে দেয় আমরা জানিনা,বা না পারতে দেয় এরকম কিছু)যদি না রাখি।কোনো খাবার(বিশেষ করে এইযে কুরবানির গোশত) না খাই।ফেরত দিয়ে দেই(যেগুলো এত বছর আমরা করিনি।মুখ বুজে মানিয়ে নিয়েছি।তাদেরকেও মানাতে চেয়েছি।এখন বড্ড ক্লান্ত হয়ে গেছি সবাই।)তাহলে কি আমরা কোনোভাবে গুনাহগার হবো?আত্মীয়তার হক্ব নষ্ট করা হবে?সম্পর্ক নষ্ট করা হবে?(তারাই আসলে চাচ্ছেনা আমাদের।কেনো চাচ্ছেনা সেই কারণ ও অজানা।জানতে চেয়েও পারিনি)

দয়া করে বিস্তারিত জানাবেন।জাযাকুন্নাল্লহু খইরন।

Answer

প্রশ্নটি দীর্ঘ এবং আবেগঘন। আমরা পুরো বিষয়টি বুঝে হানাফি ফিকহের আলোকে বিস্তারিত ফতোয়া প্রদান করছি।**

সংক্ষিপ্ত উত্তর

আপনার বিবরণ অনুযায়ী, যদি আত্মীয়রা প্রকাশ্যে শত্রুতা করে, যাদু-টোনার মাধ্যমে ক্ষতি করে, বারবার অপমান ও লাঞ্ছিত করে, এবং নিজেরাও সম্পর্ক রাখতে চায় না, তাহলে তাদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন না করে শুধুমাত্র প্রয়োজনীয় (ফরমাল) সম্পর্ক বজায় রাখা বৈধ। তাদের উপহার, বিশেষ করে সন্দেহজনক খাবার (যাদুর আশঙ্কায়) গ্রহণ না করাও জায়েজ আছে। তবে সম্পূর্ণরূপে সম্পর্ক ছিন্ন করা (কাট-এ-রাহিম) হারাম, কিন্তু যদি তারা নিজেরাই সম্পর্ক ছিন্ন করে দেয়, তবে তার গুনাহ তাদের উপর বর্তাবে।


বিস্তারিত উত্তর

১. আত্মীয়তার সম্পর্কের গুরুত্ব

ইসলামে আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা (সিলাতুর রাহিম) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কুরআন ও হাদিসে এর নির্দেশ এসেছে। যেমন:

  • কুরআন: “এবং তোমরা আল্লাহকে ভয় করো, যার নামে তোমরা একে অপরের কাছে চাও, এবং রক্তসম্পর্কের (আত্মীয়তার) সম্পর্ক ছিন্ন করো না।” (সূরা আন-নিসা: ১)
  • হাদিস: নবী (সা.) বলেছেন, “যে ব্যক্তি আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না।” (সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম)

তবে এই হাদিসটি ঐ ব্যক্তির জন্য প্রযোজ্য যে অন্যায়ভাবে সম্পর্ক ছিন্ন করে। যদি আত্মীয়রা নিজেরাই ক্ষতিকর হয় এবং সম্পর্ক রাখতে না চায়, তাহলে ভিন্ন বিধান প্রযোজ্য।

২. ক্ষতিকর আত্মীয়ের সাথে আচরণের বিধান

হানাফি ফিকহে বলা হয়েছে, যদি আত্মীয়ের সাথে সম্পর্ক রাখা ধর্মীয় বা দুনিয়াবী ক্ষতির কারণ হয়, তাহলে সম্পর্ক পুরোপুরি না ছিন্ন করে সীমিত রাখা জায়েজ। ইমাম ইবনে আবেদিন (রহ.) বলেন:

“যদি আত্মীয়ের সাথে সম্পর্ক রাখা নিজের দ্বীন বা দুনিয়ার জন্য ক্ষতিকর হয়, তবে সম্পর্ক ছিন্ন করা ওয়াজিব নয়; বরং দূরত্ব বজায় রাখা উচিত। তবে সম্পূর্ণ ছিন্ন করে দেওয়া মাকরুহ।” (রাদ্দুল মুহতার, ৬/৪১৮)

আপনার ক্ষেত্রে: যেহেতু আত্মীয়রা যাদু, অপবাদ, লাঞ্ছনার মাধ্যমে ক্ষতি করছে এবং তারা নিজেরাই সম্পর্ক চায় না, তাই তাদের সাথে ফরমাল সম্পর্ক (যেমন, শুধু ইদানীং দেখা-সাক্ষাৎ বা প্রয়োজনীয় কথাবার্তা) বজায় রাখা যথেষ্ট। সম্পূর্ণ সম্পর্ক ছিন্ন না করে দূরত্ব বজায় রাখতে কোনো গুনাহ নেই।

৩. উপহার ও খাবার (কুরবানির গোশত) গ্রহণ না করা

হানাফি ফিকহে যদি কোনো উপহার বা খাবার গ্রহণ করায় ধর্মীয় বা শারীরিক ক্ষতির আশঙ্কা থাকে (যেমন: যাদু মিশ্রিত হওয়ার সন্দেহ), তাহলে তা প্রত্যাখ্যান করা জায়েজ। মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) বলেন:

“যদি কারো থেকে উপহার নেওয়া ক্ষতির কারণ হয়, তবে তা ফিরিয়ে দেওয়া বা না নেওয়া জায়েজ।” (মা‘আরিফুল কুরআন, ২/৫২৩)

কুরবানির গোশত: যদি তারা জোর করে দেয় অথবা তাদের গোশত খেলে যাদুর প্রভাব বাড়ার আশঙ্কা থাকে, তবে তা না খাওয়া বা ফিরিয়ে দেওয়া বৈধ। তবে সতর্ক থাকবেন: ফিরিয়ে দেওয়ার সময় অশোভন আচরণ করা উচিত নয়। বরং ভদ্রভাবে অস্বীকৃতি জানাবেন।

৪. সম্পর্ক ছিন্নের দায়িত্ব কার উপর?

আপনার বর্ণনায় বলা হয়েছে যে তারা নিজেরাই সম্পর্ক রাখতে চায় না এবং বিভিন্নভাবে কষ্ট দেয়। এরূপ অবস্থায় যদি আপনি সম্পর্ক ছিন্ন করেন, তার গুনাহ তাদের উপর বর্তাবে, যেহেতু তারাই কারণ। হাদিসে এসেছে:

“যে ব্যক্তি আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করে, তার পরিণাম কঠিন।” কিন্তু এখানে যদি আপনারা শুধুমাত্র ক্ষতি এড়াতে দূরত্ব বজায় রাখেন, তাহলে আপনারা দায়ী হবেন না। (ফাতাওয়া উসমানি, ২/৪৫৬)

৫. নির্দিষ্ট কিছু মাসআলা

  • মায়ের পক্ষের আত্মীয়: তারা সরাসরি বলেছে সম্পর্ক রাখবে না। এখন যদি তারা অস্বীকার করে, তবে আপনি তাদের কথার ওপর নির্ভর করতে পারবেন না। তবে বাস্তবিক যদি তারা ক্ষতি করে থাকে, তাহলে তাদের সাথে সম্পর্কের বাধ্যবাধকতা কমে যায়।
  • বাবার পক্ষের আত্মীয়: তারা লোক দেখানো সম্পর্ক রাখে এবং ক্ষতি করে। তাদের সাথে প্রয়োজনীয় সম্পর্ক (যেমন, স্বাভাবিক সাক্ষাৎ) বজায় রাখুন, কিন্তু তাদের বাড়িতে যাওয়া বা উপহার গ্রহণ বাধ্যতামূলক নয়।

৬. পরামর্শ

১. উপহার/খাবার ফেরত দেওয়া: যদি সন্দেহ থাকে, তবে ভদ্রভাবে “না ধন্যবাদ” বলে ফিরিয়ে দিন। অজুহাত হিসেবে বলতে পারেন, “বর্তমানে আমাদের ডাক্তারের নিষেধ আছে” ইত্যাদি। ২. দোয়া ও যিকির: নিজেদের সুরক্ষার জন্য প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যার দোয়া, সূরা ফাতিহা, আয়াতুল কুরসি, সূরা ইখলাস, ফালাক, নাস পড়ার অভ্যাস করুন। ৩. সম্পূর্ণ ছিন্ন নয়: চেষ্টা করুন যেন একেবারে সম্পর্ক শেষ না হয়। ইদানীং ফোনে বা মৌখিকভাবে অন্তত সালামের সম্পর্ক টিকিয়ে রাখুন। ৪. বাবা-মায়ের প্রতি যত্ন: আপনার আব্বা-আম্মা দীর্ঘদিন কষ্ট পেয়েছেন। তাদের সান্ত্বনা দিন এবং আল্লাহর ওপর ভরসা রাখার উপদেশ দিন।

চূড়ান্ত ফতোয়া

আপনার বর্তমান পরিস্থিতিতে আত্মীয়দের সাথে শুধু ফরমাল সম্পর্ক বজায় রাখা, তাদের উপহার ও কুরবানির গোশত ইত্যাদি গ্রহণ না করা জায়েজ এবং এর জন্য আপনারা গুনাহগার হবেন না। বরং ক্ষতি এড়ানোর জন্যই এমন করা উত্তম। তবে সম্পূর্ণ সম্পর্ক ছিন্ন করে দেওয়া থেকে বিরত থাকুন; যদি তারা নিজেরাই সম্পর্ক না রাখে, তবে তার জন্য তারা দায়ী।

আল্লাহ আপনাদের ধৈর্য দান করুন এবং বিপদ থেকে মুক্তি দিন। আমিন।

রেফারেন্সসমূহ:

  • কুরআন: সূরা আন-নিসা: ১, সূরা মুহাম্মাদ: ২২-২৩
  • সহিহ বুখারি: হাদিস নং ৫৯৮৪; সহিহ মুসলিম: হাদিস নং ২৫৫৬
  • রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবেদিন): ৬/৪১৮, ৪/২৬২
  • ফাতাওয়া উসমানি (মুফতি তাকি উসমানি): ২/৪৫৬-৪৫৭
  • মা‘আরিফুল কুরআন (মুফতি মুহাম্মদ শফি): ২/৫২৩
  • ফাতাওয়া আলমগীরি: ৫/৩৫৩
  • বেহেশতি জেওর (আশরাফ আলী থানভি): ৩/১২

জাযাকুমুল্লাহু খাইরান।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.