হানাফি ফিকাহ অনুযায়ী গোপনে বিয়ে ও মোবাইলে তিন তালাকের বিধান।
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
পরবর্তিতে ২ বছর পর, ছেলে দেশের বাইরে গিয়ে বিয়ে করে ফেলে এবং তাকে মোবাইলে তিনবার তালাক দেয় একবারে। তালাক দেওয়ার সময় কোন স্বাক্ষী ছিল না। তালাকের সময় প্রায় ১ বছর হয়ে গেসে।
এই মুহুর্তে কি তার তালাক সম্পূর্ণ হয়েছে? নাকি স্বাক্ষীর সামনে তাকে আবার তালাক দেওয়া লাগবে। পরিবার বিয়ে দিতে চাচ্ছে। এমতাবস্থায় করনীয় কি?
Answer
উত্তর: গোপনে বিয়ে এবং মোবাইলে তালাকের বিধান
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ:
একটি মেয়ে তার প্রেমিকের সাথে মাত্র কয়েকজন সাক্ষীর সামনে মুখে মুখে কবুল বলে বিয়ে করে। কোনো কাজী, খুতবা বা অফিসিয়াল ডকুমেন্ট ছিল না। দুই বছর পর ছেলেটি দেশের বাইরে গিয়ে অপর এক মেয়েকে বিয়ে করে এবং আগের স্ত্রীকে মোবাইলে একসঙ্গে তিন তালাক দেয় (কোনো সাক্ষী ছাড়া)। তালাক দেওয়ার পর প্রায় এক বছর অতিবাহিত হয়েছে। বর্তমানে মেয়েটির পরিবার তাকে পরিবারিকভাবে বিয়ে দিতে চায়। জানতে চাওয়া হয়েছে:
(১) তালাকটি কি সম্পূর্ণ হয়েছে?
(২) পুনরায় সাক্ষীর সামনে তালাক দেওয়া প্রয়োজন কি?
(৩) এখন করণীয় কী?
১. গোপনে বিয়ের বিধান (হানাফি মতে)
ইসলামি শরিয়ত অনুযায়ী বিয়ে শুদ্ধ হওয়ার জন্য প্রস্তাব (ইজাব) ও গ্রহণ (কবুল) এবং দুই জন পুরুষ মুসলিম সাক্ষী (বা একজন পুরুষ ও দুই জন নারী) উপস্থিত থাকা আবশ্যক। কাজী, খুতবা বা অফিসিয়াল ডকুমেন্ট থাকা জরুরি নয়।
উল্লেখিত ক্ষেত্রে যদি বালেগ (প্রাপ্তবয়স্ক) ও সুস্থ মস্তিষ্কের দুই জন সাক্ষী উপস্থিত থেকে ইজাব-কবুল সম্পন্ন হয়, তাহলে বিয়েটি শরিয়তসম্মত ও বৈধ হয়েছে।
(সূত্র: রাদ্দুল মুহতার, ৩/১৮; ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/২৭৬; বেহেশতি জেওর, ১/৮২)
২. মোবাইলে তিন তালাকের বিধান (হানাফি মতে)
হানাফি মাজহাবের বিশুদ্ধ মত অনুযায়ী:
- মোবাইলে বা ফোনে তালাক দেওয়া শুদ্ধ হয় (যদি বলার বা শোনার বিষয়টি নিশ্চিত হয়)।
- একসঙ্গে তিন তালাক বললে (যেমন: "তুমি তালাক, তালাক, তালাক") তিন তালাকই পতিত হয় এবং তা তালাকে মুগাল্লাযা (অপুনর্বার্য তালাক) গণ্য হয়।
- তালাকের জন্য সাক্ষী থাকা জরুরি নয়। স্বামী যদি স্পষ্টভাবে তালাক উচ্চারণ করে, তাহলে তা কার্যকর হয়।
(সূত্র: রাদ্দুল মুহতার, ৩/২৪২; ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/৩৫৫; ফাতাওয়া উসমানি, ২/৪১৩)
উল্লেখিত ক্ষেত্রে:
- স্বামী মোবাইলে স্ত্রীকে একসঙ্গে তিন তালাক দিয়েছে।
- কোনো সাক্ষী ছিল না।
- তালাক দেওয়ার পর প্রায় এক বছর অতিবাহিত হয়েছে।
রায়:
তিন তালাক সম্পূর্ণরূপে পতিত হয়েছে। স্ত্রী তার জন্য হারাম হয়ে গেছে এবং ইদ্দত (তিন হায়েজ বা তিন মাস) শেষ হলে সে অন্য কারো সাথে বিয়ে করতে পারে। পুনরায় সাক্ষীর সামনে তালাক দেওয়ার প্রয়োজন নেই।
(সূত্র: ইমদাদুল ফাতাওয়া, ২/৩৯৭; আল-হিদায়া, ২/৩৫০; ফাতাওয়া দারুল উলুম দেওবন্দ, ৮/৫৭৭)
৩. বর্তমানে করণীয়
মেয়েটির জন্য:
- যেহেতু তিন তালাক পতিত হয়েছে এবং ইদ্দতকাল (প্রায় ১ বছর) অতিবাহিত হয়েছে, তাই সে স্বাধীন।
- তার পরিবার তাকে যে কোনো সুপাত্রের সাথে বিয়ে দিতে পারে। তবে প্রথম স্বামীর সাথে পুনরায় বিয়ে করা হারাম যতক্ষণ না সে (সে স্বামী) অন্য স্ত্রী গ্রহণ করে এবং তালাক দেওয়ার পর তার ইদ্দত শেষ হয় (হিল্লা) – হানাফি মতে এটিই গ্রহণযোগ্য।
- বিয়ের সময় সাক্ষী ও ইজাব-কবুলের শর্ত পূরণ করতে হবে এবং ইসলামি নিয়ম অনুসরণ করতে হবে।
সতর্কতা:
- মেয়েটি যদি প্রথম স্বামীর সাথে পুনরায় বিয়ে করতে চায়, তাহলে তা তালাকে মুগাল্লাযা হওয়ায় হিল্লা ছাড়া বৈধ নয়। তাই বর্তমান পরিস্থিতিতে পরিবারিকভাবে বিয়ে দেওয়াই উত্তম।
সংক্ষিপ্ত উত্তর
প্রশ্ন ১: তালাক সম্পূর্ণ হয়েছে কি?
উত্তর: হ্যাঁ, মোবাইলে তিন তালাক দেওয়ায় তালাক সম্পূর্ণ ও কার্যকর হয়েছে। সাক্ষীর প্রয়োজন নেই।
প্রশ্ন ২: পুনরায় সাক্ষীর সামনে তালাক দেওয়া লাগবে?
উত্তর: না, লাগবে না। প্রথম তালাকই যথেষ্ট।
প্রশ্ন ৩: এখন করণীয় কী?
উত্তর: মেয়েটি ইদ্দত শেষ হওয়ায় অন্য কারো সাথে বিয়ে করতে পারে। পরিবার চাইলে তাকে বিয়ে দিতে পারে। তবে প্রথম স্বামীর সাথে পুনরায় বিয়ে হিল্লা ব্যতীত হারাম।
গুরুত্বপূর্ণ নোট
- হানাফি মাজহাবের দলিলভিত্তিক রায় উপরে দেওয়া হয়েছে।
- বাস্তবিক জটিলতা এড়াতে কোনো স্থানীয় মুফতি বা ইসলামি স্কলারের সাথে পরামর্শ করা উত্তম।
- আল্লাহ তাআলা সবাইকে সঠিক পথে চলার তাওফিক দান করুন।