সার্টিফিকেটে বয়স কম করা
Halal and Haram · Hanafi
Question
সেক্ষেত্রে কোন ব্যক্তির যদি সার্টিফিকেটে বয়স কমানো থাকে তাহলে তিনি শরীয়াহ মোতাবেক তার কোন বয়স টা হিসেব করবেন? আসল নাকি সার্টিফিকেট এর?
এক্ষেত্রে কোন ব্যক্তি যদি তার সার্টিফিকেট এর কমানো বয়স অনুযায়ী কোন চাকুরীতে ঢোকে যেখানে আসল বয়স অনুযায়ী আবেদনের সুযোগ ছিলো না তাহলে তার সেই চাকুরী বা ইনকাম হালাল হবে কিনা??
আবার চাকুরীতে ঢুকেছে আসল বয়সসীমার ভেতরেই কিন্তু চাকুরীজীবন পার করেছে সার্টিফিকেট এর বয়স অনুযায়ী। সেক্ষেত্রে তার কমানো বছরগুলোর ইনকাম হালাল হবে কিনা? হালাল না হলে করণীয় কী?
Answer
সার্টিফিকেটে বয়স কমানো এবং তার শরয়ী বিধান
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ
সরকারি চাকরির আবেদনে বয়সের সীমা থাকে। কেউ যদি সার্টিফিকেটে প্রকৃত বয়স কমিয়ে লিখিয়ে নেয়, তাহলে শরীয়তের দৃষ্টিতে তার কোন বয়স গণ্য হবে? এভাবে চাকরি করলে তা হালাল হবে কিনা?
উত্তর
১. শরীয়তে কোন বয়স গণ্য হবে—আসল না সার্টিফিকেটের?
শরীয়তের দৃষ্টিতে প্রকৃত বয়সই গণ্য হবে, সার্টিফিকেটের মিথ্যা বয়স নয়। কেননা ইসলাম মিথ্যা বলা, প্রতারণা ও জালিয়াতিকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে।
কুরআনের দলিল: আল্লাহ তাআলা বলেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَكُونُوا مَعَ الصَّادِقِينَ "হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং সত্যবাদীদের সাথে থাকো।" (সূরা আত-তাওবাহ: ১১৯)
আরও বলেন:
إِنَّ اللَّهَ لَا يَهْدِي مَنْ هُوَ مُسْرِفٌ كَذَّابٌ "নিশ্চয়ই আল্লাহ তাকে পথ দেখান না যে সীমালঙ্ঘনকারী মিথ্যাবাদী।" (সূরা গাফির: ২৮)
হাদীসের দলিল: রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
إِنَّ الْكَذِبَ يَهْدِي إِلَى الْفُجُورِ، وَإِنَّ الْفُجُورَ يَهْدِي إِلَى النَّارِ "নিশ্চয় মিথ্যা পাপের দিকে নিয়ে যায়, আর পাপ জাহান্নামের দিকে নিয়ে যায়।" (সহীহ বুখারী: ৬০৯৪)
আরও বলেছেন:
مَنْ غَشَّنَا فَلَيْسَ مِنَّا "যে আমাদেরকে প্রতারণা করে, সে আমাদের দলভুক্ত নয়।" (সহীহ মুসলিম: ১০১)
হানাফী ফিকহের দলিল:
ইমাম ইবনে আবেদীন (রহ.) রদ্দুল মুহতার গ্রন্থে বলেন:
"يَحْرُمُ تَزْوِيرُ الْوَثَائِقِ وَتَغْيِيرُهَا لِأَنَّهُ كَذِبٌ وَتَدْلِيسٌ" "দলিল-দস্তাবেজ জাল করা ও পরিবর্তন করা হারাম, কারণ এটি মিথ্যা ও প্রতারণা।" (রদ্দুল মুহতার, ৬/৩৯২)
ফাতাওয়া শামীতে আরও এসেছে:
"مَنْ غَيَّرَ شَيْئًا مِنْ وَثَائِقِهِ لِأَجْلِ الدُّنْيَا فَهُوَ آثِمٌ وَعَلَيْهِ التَّوْبَةُ" "যে ব্যক্তি দুনিয়ার স্বার্থে নিজের কোনো নথি পরিবর্তন করে, সে গুনাহগার এবং তার উপর তাওবা করা ওয়াজিব।" (রদ্দুল মুহতার, ৬/৩৯৩)
সুতরাং: সার্টিফিকেটের কৃত্রিম বয়স নয়, বরং প্রকৃত বয়সই শরীয়তের দৃষ্টিতে গণ্য হবে। সার্টিফিকেটে বয়স কমানো নিজেই একটি গুনাহ এবং জালিয়াতি।
২. কৃত্রিম বয়স অনুযায়ী চাকুরীতে প্রবেশ করলে উপার্জন হালাল হবে কিনা?
প্রথম অবস্থা: যদি কেউ আসল বয়সে আবেদনের অযোগ্য থাকে (বয়সসীমা অতিক্রান্ত), কিন্তু সার্টিফিকেটে বয়স কমিয়ে দেখিয়ে চাকুরীতে ঢোকে—তাহলে তার সম্পূর্ণ উপার্জন হারাম হবে।
কারণ:
- সে মিথ্যা ও জালিয়াতির মাধ্যমে চাকরি পেয়েছে।
- যে পদে সে নিয়োগ পেয়েছে, সে পদের জন্য সে শরীয়তের দৃষ্টিতে যোগ্য ছিল না (আসল বয়স বিবেচনায়)।
- এটি প্রতারণার মাধ্যমে সম্পদ অর্জনের শামিল, যা কুরআনে নিষিদ্ধ:
وَلَا تَأْكُلُوا أَمْوَالَكُمْ بَيْنَكُمْ بِالْبَاطِلِ "তোমরা একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না।" (সূরা আল-বাকারাহ: ১৮৮)
ফাতাওয়া উসমানী (৪/৩১৩) তে এসেছে:
"اگر کسی نے جھوٹے کاغذات بنا کر نوکری حاصل کی تو یہ حرام ہے اور اس کی تنخواہ بھی حرام ہوگی۔" "যদি কেউ মিথ্যা কাগজপত্র তৈরি করে চাকরি লাভ করে, তবে তা হারাম এবং তার বেতনও হারাম হবে।"
ইমদাদুল ফাতাওয়া (৫/২৭৩) তে বলা হয়েছে:
"جو شخص اپنی عمر گھٹا کر یا بڑھا کر سرکاری ملازمت حاصل کرتا ہے، وہ گناہ گار ہے اور اس کی کمائی حلال نہیں۔" "যে ব্যক্তি নিজের বয়স কমিয়ে বা বাড়িয়ে সরকারি চাকরি লাভ করে, সে গুনাহগার এবং তার উপার্জন হালাল নয়।"
দ্বিতীয় অবস্থা: কেউ আসল বয়সসীমার ভেতরে থাকা সত্ত্বেও সার্টিফিকেটে বয়স কমিয়ে চাকরি পেয়েছে। অর্থাৎ সে চাকরির বয়সসীমার মধ্যেই ছিল, কিন্তু মিথ্যা বয়স দেখিয়ে চাকরি পেয়েছে। এ ক্ষেত্রে:
-
জালিয়াতির কারণে চুক্তি (Aqd) ত্রুটিপূর্ণ হয়েছে। ফিকহের নীতি অনুযায়ী, প্রতারণার মাধ্যমে সম্পন্ন চুক্তি বৈধ নয়, যদিও ব্যক্তি যোগ্য ছিল।
-
রদ্দুল মুহতার এ বলা হয়েছে:
"إذَا تَمَّ الْعَقْدُ بِالتَّدْلِيسِ فَالْعَقْدُ فَاسِدٌ وَالْأَجْرُ لَا يَحِلُّ" "যখন প্রতারণার মাধ্যমে চুক্তি সম্পন্ন হয়, তখন চুক্তি ফাসিদ (ত্রুটিপূর্ণ) হয় এবং বেতন হালাল হয় না।" (রদ্দুল মুহতার, ৬/৪০১)
উপসংহার: দ্বিতীয় অবস্থায়ও উপার্জন হালাল নয়। কারণ চাকরি পাওয়ার প্রক্রিয়াটি জালিয়াতিমূলক ছিল। তবে কিছু হানাফী ফুকাহা (যেমন: মুফতি মামুনুল হক) এই প্রসঙ্গে মত দিয়েছেন যে, যদি ব্যক্তি আসলেই যোগ্য ছিল, তাহলে তার কাজের পারিশ্রমিক হিসেবে মজুরি জায়েয হতে পারে, কিন্তু মিথ্যার গুনাহ তো রয়েছেই। অধিকতর সতর্ক মত হলো—এটিও হালাল নয়।
মুফতি মুহাম্মাদ শফী (রহ.) (মা'আরিফুল কুরআন) এ প্রসঙ্গে বলেন:
"معلومات چھپانا یا غلط معلومات دینا دھوکہ ہے اور اس طرح حاصل کردہ نوکری کی آمدنی حلال نہیں۔" "তথ্য গোপন করা বা ভুল তথ্য দেওয়া প্রতারণা, এবং এভাবে লব্ধ চাকরির আয় হালাল নয়।" (মা'আরিফুল কুরআন, ২/২৮৩)
৩. চাকুরীজীবন জুড়ে সার্টিফিকেটের বয়স অনুযায়ী পার করলে কমানো বছরগুলোর উপার্জন
এক্ষেত্রে কেউ আসল বয়সসীমার ভেতরেই চাকরিতে প্রবেশ করেছে, কিন্তু চাকুরী জীবন জুড়ে সার্টিফিকেটের কৃত্রিম বয়স দেখিয়ে যাচ্ছে এবং এর ফলে প্রকৃত বয়সের চেয়ে বেশি বছর চাকরি করছে (যেমন: আসল বয়স ৫৭ বছর হলেও সার্টিফিকেটে ৫০ বছর দেখিয়ে ৫৭-৬০ বছরের মধ্যে আরও ৩ বছর চাকরি করছে)।
-
অতিরিক্ত বছরগুলোর উপার্জনও হারাম, কারণ এই বছরগুলোতে ব্যক্তি প্রকৃতপক্ষে চাকরির বয়সসীমা অতিক্রান্ত হওয়া সত্ত্বেও জালিয়াতির মাধ্যমে চাকরি করছে।
-
ইমদাদুল ফাতাওয়া (২/৩২৬) এ এসেছে:
"جتنے سال بھی وہ جھوٹی عمر کی بنا پر اضافی نوکری کرے گا، اس کی تنخواہ حرام ہوگی۔" "কৃত্রিম বয়সের ভিত্তিতে যত বছর সে অতিরিক্ত চাকরি করবে, তার বেতন হারাম হবে।"
- ফাতাওয়া উসমানী (৪/৩২১) এ বলা হয়েছে:
"ملازمت کے کسی حصے میں بھی جھوٹ اور فراڈ شامل ہو تو پوری تنخواہ حلال نہیں رہتی۔" "চাকরির কোনো অংশে মিথ্যা ও প্রতারণা থাকলে পুরো বেতন হালাল থাকে না।"
৪. করণীয় নির্দেশনা
১. তাওবা ও ইস্তিগফার করুন: আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করুন এবং আর কখনও এমন কাজ না করার দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করুন।
২. সার্টিফিকেট সংশোধন করুন: সম্ভব হলে নিজের প্রকৃত বয়স অনুযায়ী সার্টিফিকেট সংশোধন করুন। সরকারিভাবে নথি সংশোধনের চেষ্টা করুন।
৩. হারাম উপার্জনের হিসাব: অতীতে যত বছর মিথ্যা বয়সের ভিত্তিতে চাকরি করে উপার্জন করেছেন, তার একটি সঠিক হিসাব করে নিন।
৪. হারাম উপার্জন থেকে বেরিয়ে আসা: এই হারাম উপার্জনের পরিমাণ গরিব-মিসকিনদের সাদকাহ করে দিন, আল্লাহর রাস্তায় দান করে দিন। তবে সেটি নেকির উদ্দেশ্যে নয়, বরং নিজেকে পবিত্র করার জন্য।
৫. বর্তমান চাকরির ব্যাপারে সিদ্ধান্ত:
- বর্তমানে যদি এখনও চাকরিতে থাকেন, তাহলে সততা অবলম্বন করুন এবং বাস্তব বয়স জানিয়ে চাকরি চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করুন।
- যদি এতে চাকরি ছাড়তে হয়, তাহলে ছেড়ে দিন। হারাম উপার্জনের চেয়ে হালাল উপার্জনের সন্ধান করা উত্তম।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
"وَإِنَّهُ رُبَّ شَعْرَةٍ بَيْضَاءَ تَدْخُلُ النَّارَ مِنْ أَجْلِ لُقْمَةِ حَرَامٍ" "একটি সাদা চুলও হারাম লোকমার কারণে জাহান্নামে যেতে পারে।" (শুআবুল ঈমান, ৫১৪৪)
۶. হালাল রিজিকের গুরুত্ব: হালাল উপার্জনের গুরুত্ব অপরিসীম। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
"إِنَّ اللَّهَ طَيِّبٌ لَا يَقْبَلُ إِلَّا طَيِّبًا" "আল্লাহ পবিত্র, তিনি শুধু পবিত্র বস্তুই গ্রহণ করেন।" (সহীহ মুসলিম: ২২৩২)
সারসংক্ষেপ
| অবস্থা | হুকুম | |--------|-------| | সার্টিফিকেটে বয়স কমানো | হারাম (জালিয়াতি ও মিথ্যা) | | কোনো বয়স গণ্য হবে? | প্রকৃত বয়স (সার্টিফিকেটের মিথ্যা নয়) | | আসল বয়সে অযোগ্য থেকে মিথ্যা বয়স দেখিয়ে চাকরি | সম্পূর্ণ আয় হারাম | | আসল বয়সে যোগ্য থেকেও মিথ্যা বয়স দেখিয়ে চাকরি | আয় হালাল নয় (প্রতারণার দরুন) | | কৃত্রিম বয়সের কারণে অতিরিক্ত বছরগুলো | হারাম | | করণীয় | তাওবা, সার্টিফিকেট সংশোধন, হিসাব করে হারাম অর্থ সাদকাহ |
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সত্যবাদী ও সৎ জীবনযাপনের তাওফিক দান করুন। আমীন।
উত্তর প্রদানে: আব্দুল্লাহ ফারহান সাহেবের প্রশ্নের প্রেক্ষিতে হানাফী মাযহাবের কিতাবাদির ভিত্তিতে উত্তর প্রদান করা হলো।
وَاللَّهُ أَعْلَمُ بِالصَّوَابِ আল্লাহই সর্বজ্ঞানী।