হানাফী মাযহাবে নারীর চেহারা-হাত আওরাত নয়, তবু দৃষ্টি নিচু রাখা কেন ফরজ?

Halal and Haram · Hanafi

Question No: 2514
Questioner: أمة الله
Question Asked: 10 Jul 2026, 11:53 AM
Reviewed & Published: 10 Jul 2026, 01:39 PM
Views: 64
Tokens: 4,790
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

১। যেহেতু হানাফী মাযহাবে নারীর মুখমণ্ডল ও হাত আওরাত নয় এবং এ ২টির দিকে তাকানো জায়েয বলা হয়েছে, তাহলে দৃষ্টি নিচু করে হাঁটার বাধ্যবাধকতা কেন থাকবে?
২। রাস্তাঘাটে - বাজারে যেখানে নারীরা থাকে অনেক কি চোখ কি নিচু করে রাখতে হবে নারীর সামনে আসলে সর্বদা? নাকি নারীর দিকে চোখ পড়ার অওর আকর্ষণ আসলে নামাতে হবে?

Answer

উত্তর

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম
الحمد لله رب العالمين، والصلاة والسلام على سيد المرسلين، وعلى آله وأصحابه أجمعين

প্রশ্ন ১: মুখমণ্ডল ও হাত আওরাত নয় বলে দৃষ্টি নিচু করার বাধ্যবাধকতা কেন থাকবে?

হানাফী মাযহাবে নারীর চেহারা ও হাত দুই কব্জি পর্যন্ত শরয়ী পর্দার আওতার বাইরে (অর্থাৎ আওরাত নয়) হওয়া সত্ত্বেও, তা দেখার অনুমতি শর্তসাপেক্ষ। কুরআন-হাদীসের স্পষ্ট নির্দেশনা হলো, পুরুষের জন্য অমহরম নারীর প্রতি দৃষ্টি নিচু রাখা ফরজ (সূরা আন-নূর, ৩০)। এই নির্দেশনার আলোকে হানাফী ফুকাহায়ে কেরাম বলেছেন:

১. নির্দিষ্ট শর্তে অনুমতি: নারীর চেহারা ও হাতের দিকে তাকানো তখনই জায়েজ, যখন কোনো প্রকার কামভাব (শাহওয়াত) ও ফিতনার আশঙ্কা না থাকে এবং তাকানো হয় প্রয়োজনবশত (যেমন: সাক্ষ্য, চিকিৎসা, বিবাহের প্রস্তাব ইত্যাদি)। (রাদ্দুল মুহতার, ১/৪০৬; ফাতাওয়া আলমগীরী, ৫/৩৫৮)

২. শাহওয়াতের সাথে তাকানো হারাম: যদি দৃষ্টিতে সামান্য পরিমাণও কামনা বা আকর্ষণ থাকে, তাহলে চেহারা ও হাতের দিকে তাকানো হারাম। ইবনে আবেদীন (রহ.) স্পষ্ট বলেছেন: "নারীকে অশ্লীল দৃষ্টিতে দেখা হারাম, আর শাহওয়াতবিহীন দেখা জায়েজ—এটি কঠিন, কারণ সাধারণত শাহওয়াত মিশ্রিত না হয়ে পারে না।" (রাদ্দুল মুহতার, ১/৪০৬)

৩. দৃষ্টি নিচু করার বাধ্যবাধকতা: পবিত্র কুরআনের আদেশ হলো "তোমরা দৃষ্টি নিচু করো" (সূরা আন-নূর: ৩০-৩১)। এটি একটি সাধারণ ও অপরিহার্য নির্দেশ। তাই রাস্তাঘাটে নারীর সামনে দিয়ে হাঁটার সময় দৃষ্টি নিচু রাখা ওয়াজিব। কারণ:

  • দৃষ্টি নিয়ন্ত্রণ করলে অন্তর পবিত্র হয় (ইমদাদুল ফাতাওয়া, ২/২৭৭)
  • ফিতনার আশঙ্কা দূর হয় (মাআরিফুল কুরআন, ৬/৩৯৭)
  • অধিকাংশ সময়েই অনিচ্ছাকৃতভাবে শাহওয়াত জাগ্রত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে
  • বারবার বা স্থির করে তাকানো নিষিদ্ধ (ফাতাওয়া উসমানী, ২/৪১৫)

মাওলানা আশরাফ আলী থানভী (রহ.) বলেছেন: "নিয়ন্ত্রিত দৃষ্টি অন্তরের পবিত্রতার মূল চাবিকাঠি। যদিও চেহারা ও হাত শরয়ী পর্দার অন্তর্ভুক্ত নয়, তবু দৃষ্টি সংযত রাখাই অধিকতর তাকওয়ার পথ।" (ইমদাদুল ফাতাওয়া, ২/২৭৬-২৭৭)

প্রশ্ন ২: রাস্তা-বাজারে কখন দৃষ্টি নামাতে হবে?

হানাফী মাযহাবের প্রামাণ্য মত হলো:

উত্তর: রাস্তাঘাটে, বাজারে বা যেকোনো প্রকাশ্য স্থানে অমহরম নারীর সান্নিধ্যে এলে সর্বদা দৃষ্টি নিচু রাখাই উত্তম ও নিরাপদ পদ্ধতি। নিচে বিস্তারিত বলা হলো:

  • মূলনীতি: যখনই অমহরম নারী দৃষ্টিগোচর হবে, তখনই অনিচ্ছাকৃত বা সামান্য দৃষ্টি পড়লেও শাহওয়াত জাগ্রত হওয়া মাত্রই আর তাকানো বন্ধ করে দৃষ্টি সরিয়ে নিতে হবে। কিন্তু যেহেতু শাহওয়াত জাগ্রত হওয়ার মুহূর্তটি অনুমান করা কঠিন, তাই সাধারণ নির্দেশনা হলো—বিনা প্রয়োজনে নারীর দিকে তাকানো যাবে না (রাদ্দুল মুহতার, ১/৪০৫)।

মাওলানা মুহাম্মদ শফী (রহ.) মাআরিফুল কুরআনে (৬/৩৯৭) উল্লেখ করেছেন: "সাধারণ অবস্থায় প্রতিটি অমহরম নারীর দিকে তাকানোই নিষিদ্ধ। দৃষ্টি পড়লেও তা অনিচ্ছাকৃত ও ক্ষণস্থায়ী হওয়া চাই, আর যদি ইচ্ছাকৃত হয় বা শাহওয়াত জাগ্রত হয়, তাহলে তৎক্ষণাৎ সরিয়ে নিতে হবে।"

  • ফাতাওয়া উসমানীতে (২/৪১৫) এসেছে: প্রথম দৃষ্টি অনিচ্ছাকৃত হলে মাফ, কিন্তু দ্বিতীয়বার ইচ্ছাকৃত তাকানো হারাম। রাস্তায় চলার সময় সাধারণত দৃষ্টি নিচু করে রাখাই কর্তব্য।

  • সারকথা:

    • যদি নারীর দৃষ্টি এড়িয়ে চলা সম্ভব হয়, তবে সবসময়ই দৃষ্টি নিন্ম রাখা (নিজের পায়ের দিকে বা সামনের রাস্তায়) উত্তম।
    • যদি অনিচ্ছাকৃতভাবে চোখ পড়ে যায়, তবে প্রথম glance মাফ, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে সরিয়ে নিতে হবে (ফাতাওয়া আলমগীরী, ৫/৩৫৮)।
    • যদি আকর্ষণ বা শাহওয়াত জাগে, তবে তাৎক্ষণিকভাবে দৃষ্টি সরিয়ে নেওয়া ফরজ।

জবাবের সারাংশ

১. মুখমণ্ডল ও হাত আওরাত নয় বলেই দৃষ্টি নিচু করার বাধ্যবাধকতা শিথিল হয় না, বরং কুরআনের স্পষ্ট নির্দেশনার কারণে দৃষ্টি সংযত রাখা ওয়াজিব। শাহওয়াত ও ফিতনার আশঙ্কা থাকলে চেহারা ও হাতের দিকে তাকানোও হারাম।

২. পাবলিক প্লেসে সর্বদা দৃষ্টি নিচু রাখাই নিরাপদ পদ্ধতি। আকর্ষণ জাগলেই কেবল নয়, বরং ফিতনার আশঙ্কা না থাকলেও বারবার বা স্থির করে তাকানো থেকে বিরত থাকতে হবে।

উৎস-নির্দেশিকা: কুরআন (সূরা আন-নূর: ৩০-৩১), রাদ্দুল মুহতার (১/৪০৫-৪০৬), ফাতাওয়া আলমগীরী (৫/৩৫৮), ইমদাদুল ফাতাওয়া (২/২৭৬-২৭৭), মাআরিফুল কুরআন (৬/৩৯৭), ফাতাওয়া উসমানী (২/৪১৫), বাহিশতী জেওর (৭/২৫)।

আল্লাহ তাআলা সবাইকে দৃষ্টি হেফাজতের তাওফীক দিন। (আমিন)

উত্তর: দৃষ্টি নিচু করা সর্বদাই কর্তব্য। শাহওয়াত জাগলেই কেবল নয়, বরং সাধারণ ফিতনার আশঙ্কা থেকে মুক্ত থাকার জন্যও এই বিধান।

রেফারেন্স: রাদ্দুল মুহতার (১/৪০৫-৪০৬), ফাতাওয়া আলমগীরী (৫/৩৫৮), ইমদাদুল ফাতাওয়া (২/২৭৬-২৭৭), মাআরিফুল কুরআন (৬/৩৯৭), ফাতাওয়া উসমানী (২/৪১৫), বাহিশতী জেওর (৭/২৫)।



This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.