“নিজের অজান্তে গান গাইলে কি গুনাহ হবে?”
Halal and Haram · Hanafi
Question
Answer
উত্তর
بسم الله الرحمن الرحيم
الحمد لله رب العالمين، والصلاة والسلام على سيد المرسلين
প্রশ্নের সংক্ষিপ্ত বিবরণ:
প্রশ্নকারী জানতে চেয়েছেন—হঠাৎ কোনো গান মনে পড়লে নিজের অজান্তেই যদি কেউ গুনগুন করে গায়, এবং অন্য কেউ তা না শুনে, তাহলে কি তার গুনাহ হবে?
হানাফি ফিকহের আলোকে উত্তর:
ইসলামে গান-বাজনার বিধান নির্ভর করে তার বিষয়বস্তু, উদ্দেশ্য এবং পদ্ধতি–এর উপর। সাধারণভাবে, যে গানে অশ্লীল কথা, বেহায়াপনা, মদ-জুয়ার উসকানি বা আল্লাহ ও রাসূলের প্রতি অশ্রদ্ধা থাকে, তা স্পষ্টতই হারাম। আর যে গানে এসব না থাকলেও তা যদি বাদ্যযন্ত্রের সাথে গাওয়া হয়, তবে অধিকাংশ হানাফি ফুকাহার মতে তা নাজায়েয। তবে শুধু কণ্ঠে (বাদ্যযন্ত্র ছাড়া) ভালো ও অর্থবহ গান—যা গুনাহের কাজে উদ্বুদ্ধ না করে—সেটি কিছু উলামার মতে জায়েয, তবে অনর্থক সময় নষ্ট না করার জন্য উৎসাহিত করা হয়নি।
এখন বর্তমান প্রশ্নের মূল বিচার্য বিষয়:
নিজের অজান্তে, অন্যদের না শোনানো অবস্থায় গুনগুন করা—এখানে তিনটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ:
১. নিয়ত ও ইচ্ছা (নিয়্যাহ):
হানাফি ফিকহে গুনাহের জন্য সাধারণত ইচ্ছা ও সচেতনতা শর্ত। যদি কেউ সম্পূর্ণ অজান্তে বা ঘুমের মধ্যে বা ভুলবশত কোনো গুনাহের কাজ করে ফেলে, তবে তা ক্ষমার যোগ্য।
কুরআনে এসেছে: رَبَّنَا لَا تُؤَاخِذْنَا إِن نَّسِينَا أَوْ أَخْطَأْنَا
“হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা ভুলে গেলে বা ভুল করলে আপনি আমাদের পাকড়াও করবেন না।” (সূরা বাকারা: ২৮৬)
হাদিসে এসেছে, إِنَّ اللَّهَ تَجَاوَزَ لِي عَنْ أُمَّتِي الْخَطَأَ وَالنِّسْيَانَ وَمَا اسْتُكْرِهُوا عَلَيْهِ
“আল্লাহ আমার উম্মতের ভুল, বিস্মৃতি এবং যা করতে বাধ্য করা হয় তা মাফ করে দিয়েছেন।” (ইবনে মাজাহ, সহিহ)
তাই যদি কেউ হঠাৎ করে, নিজের ইচ্ছা ছাড়া গান মনে পড়ে যায় এবং তা গুনগুন করে ফেলে, তবে তা ইচ্ছাকৃত গুনাহের পর্যায়ে পড়বে না, ইনশাআল্লাহ।
২. অন্যদের না শোনানো:
প্রশ্নে বলা হয়েছে, অন্য কেউ শুনছে না। এটি গুনাহ হালকা করার একটি কারণ, কারণ গানের অপকারিতা তখনই বেশি হয় যখন তা অন্যদের কানে যায় এবং তাদের মন্দ কাজে প্রভাবিত করে। নিজের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে দোষ কম। তবে যদি গানটি হারাম (যেমন অশ্লীল গান বা বাদ্যযন্ত্রযুক্ত) হয়, তবে তা শুধু গুনগুন করলেও অন্তরে তার প্রভাব পড়তে পারে, তাই একে পুরোপুরি নির্দোষ বলা যাবে না।
৩. গানটির ধরন:
- যদি গানটি হারাম (যেমন অশ্লীল, বাদ্যযন্ত্রযুক্ত) হয়, তাহলে নিজের অজান্তে গাইলেও তা থেকে বেঁচে থাকা উচিত। কারণ শয়তান মানুষকে ধীরে ধীরে এসবের প্রতি আকৃষ্ট করে। ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) বলেন: “গান-বাজনা হারাম, চাই তা প্রকাশ্যে হোক বা গোপনে। তবে ইচ্ছার অনুপস্থিতিতে গুনাহ মাফ হবে।” (রদ্দুল মুহতার, ৬/৩৫৩)
- যদি গানটি জায়েয (যেমন কোনো অর্থবহ ইসলামি নাশিদ) হয়, তবে তা গুনগুন করলে কোনো গুনাহ নেই, বরং ভালো কাজের স্মরণ হলে সওয়াবও হতে পারে।
সারকথা:
- নিজের অজান্তে, হঠাৎ করে যদি কোনো গান মনে পড়ে এবং আপনি গুনগুন করে ফেলেন, তাহলে তা ইচ্ছাকৃত গুনাহ হিসেবে গণ্য হবে না। আল্লাহ ভুল ও বিস্মৃতি ক্ষমা করেন।
- তবে সচেতনভাবে গান গাওয়া থেকে বিরত থাকা কর্তব্য। বিশেষ করে যদি গানটি অশ্লীল বা বাদ্যযন্ত্রযুক্ত হয়, তাহলে তা গুনাহ।
- উত্তম পন্থা: সঙ্গে সঙ্গে তওবা করে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া এবং নিজেকে গান-বাজনা থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করা। বেশি বেশি কুরআন তিলাওয়াত ও জিকিরে মনোযোগী হওয়া।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে গুনাহ থেকে বাঁচিয়ে রাখুন এবং তাঁর স্মরণে মশগুল করুন। আমিন।