গীবত থেকে বাঁচার উপায় ও আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষার ইসলামি নির্দেশনা।
Halal and Haram · Hanafi
Question
প্রশ্ন ০১- আত্নীয়তার হক আদায় করতে বলা হয়েছে আমাদের। এখন আমি আমার মহিলা আত্নীয়দের সাথে কথা বলতে গেলেই গীবত শুনতে হয়। না চাইতেও আমার গীবত হয়ে যায়। কেমন আছো? কি করছো? এইটুকু কথার পরেই গিবতে চলে যায়। নাও করতে পারি না আবার না করলেও শুনবে না এটাও জানি। মহিলা আত্নীয়দের মজলিসে বসলেই গীবত আর গীবত। আত্নীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করতে গেলেই গীবত শুনতে হয়ই হয়।এর মাঝে আমারও গীবত করা হয়ে যায়।এখন আমি আত্নীয়তার সম্পর্ক কি ভাবে রক্ষা করবো?
প্রশ্ন ০২- আবার আমি এমন পরিবেশে থাকি সেখানেও কয়েকবার গিবত হয়।আমি না চাইলেও আমার শুনতে হয়। আমি চাইলেও অন্য কোথাও যেতে পারি না সেখানেই থাকতে হয়।আমার বাসায়ই হয় গীবতটা।সেখান থেকে আমার অন্য কোথাও সরে যাওয়ার জায়গা থাকে না।
এক্ষেত্রে আমার করণীয় কি?
Answer
بسم الله الرحمن الرحيم
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
প্রশ্নের জন্য ধন্যবাদ। আপনার দুটি প্রশ্ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং বাস্তবিক। নিচে কুরআন-সুন্নাহ ও হানাফি ফিকহের নির্ভরযোগ্য কিতাবের আলোকে উত্তর প্রদান করা হলো।
প্রশ্ন ০১: আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করলেই গীবত শুনতে হয়, কী করব?
আত্মীয়তার সম্পর্ক (সিলাতুর রাহিম) ইসলামে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কুরআনে ইরশাদ হয়েছে:
“আর তুমি আত্মীয়স্বজনকে তাদের হক দান করো…” (সূরা বনী ইসরাঈল ১৭:২৬)
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
“যে ব্যক্তি তার রিজিক প্রশস্ত ও আয়ু দীর্ঘ করতে চায়, সে যেন আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করে।” (সহীহ বুখারী: ২০৬৭)
কিন্তু গীবত (অনুপস্থিতিতে কারো দোষ আলোচনা) কবিরা গুনাহ। আল্লাহ বলেন:
“আর তোমরা একে অপরের গীবত করো না। তোমাদের কেউ কি তার মৃত ভাইয়ের গোশত খেতে পছন্দ করবে? নিশ্চয়ই তা তোমরা ঘৃণা করো।” (সূরা হুজুরাত ৪৯:১২)
সুতরাং আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করতে গিয়ে যদি গীবত শুনতে হয় বা অংশগ্রহণ করতে হয়, তাহলে সেটা জায়েয নয়। তবে কিছু কৌশল অবলম্বন করা যায়:
১. নিজে অংশগ্রহণ না করা ও পরিবেশ পরিবর্তনের চেষ্টা করা
মজলিসে বসার আগেই বলে নিন: “দয়া করে কারো গীবত করবেন না, এটা গুনাহের কাজ। অন্য কোনো বিষয়ে আলোচনা করুন।” যদি তারা না শোনে, তাহলে চুপ করে থাকুন এবং অন্তরে অসন্তুষ্ট থাকুন। হাদিসে এসেছে:
“যে ব্যক্তি গীবত শুনল এবং তাতে অসন্তুষ্ট হলো না, সে গীবতকারীর অংশীদার।” (মিশকাত: ৪৮৩৫, সহীহ ইবনে হিব্বান)
আপনি যদি নিজে গীবত করতে বাধ্য হন (মানে আপনি বলতে শুরু করেন), তাহলে সাথে সাথেই তাওবা করুন এবং বিষয় পরিবর্তন করুন।
২. সরাসরি না গিয়ে সালাম-দোয়া ও ফোনে যোগাযোগ
যদি মজলিসে গীবত অনিবার্য হয়, তাহলে শারীরিকভাবে না গিয়ে ফোনে খোঁজ-খবর নিন। অথবা অল্প সময়ের জন্য গিয়ে সালাম-দোয়া করে চলে আসুন। তাফসিরে মা’আরিফুল কুরআনে বলা হয়েছে:
“আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষার মূল উদ্দেশ্য হলো সম্পর্ক বজায় রাখা, সবসময় তাদের সাথে বসে থাকা জরুরি নয়।”
৩. গীবতের স্থান ত্যাগ করার চেষ্টা
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
“যে ব্যক্তি গীবতের মজলিস থেকে দূরে থাকবে, আল্লাহ তাকে জাহান্নাম থেকে দূরে রাখবেন।” (সুনানে আবু দাউদ: ৪৮৭৭)
যদি সম্ভব হয়, অজুহাত দিয়ে উঠে আসুন। যেমন: “আমার জরুরি কাজ আছে”, “শিশু কাঁদছে” ইত্যাদি।
৪. অন্তর দৃঢ় রাখা
নাও বা নিষেধ করলেও যদি তারা গীবত করা বন্ধ না করে, তাহলে আপনি অন্তর থেকে ঘৃণা করুন এবং নিজেকে রক্ষা করুন। ইমাম নববী (রহ.) লিখেছেন:
“গীবত শুনলে তা অস্বীকার করা ওয়াজিব, যদি না পারে তাহলে উঠে যাওয়া, তাও না পারলে অন্তর দিয়ে ঘৃণা করা।” (শারহুন নববী আলা মুসলিম: ১৮/১৭০)
আপনার করণীয় সংক্ষেপে:
- প্রথমে নম্রভাবে জানিয়ে দিন যে গীবত পছন্দ করেন না।
- যদি না শোনে, চুপ থাকুন ও অন্তরে ঘৃণা করুন।
- নিজে কোনো গীবত বলবেন না, আর যদি বলে ফেলেন তবে তাওবা করুন।
- সম্ভব হলে মজলিস ছোট করুন বা ফোনে সম্পর্ক রাখুন।
প্রশ্ন ০২: নিজের বাসায় গীবত হয়, অন্য জায়গায় যেতে পারি না, কী করব?
এটি আরও সংবেদনশীল পরিস্থিতি। বাসায় যদি স্বামী/স্ত্রী, সন্তান বা অন্য সদস্যরা গীবত করে, তাহলে আপনি দায়িত্বশীল হিসেবে তাদের বোঝানোর চেষ্টা করুন। কুরআনের আয়াত ও হাদিসের আলোকে বুঝান।
১. পরিবারকে সচেতন করা
পরিবারকে গীবতের ভয়াবহতা সম্পর্কে জানান। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
“গীবত করা জিনার চেয়েও গুরুতর পাপ।” (সহীহ আল-জামি: ২৮৭৫)
মহিলা আত্মীয়দের জন্যও প্রযোজ্য।
২. নিজে মানসিকভাবে সুরক্ষিত থাকা
যদি থামাতে না পারেন, তাহলে নিজের কান ও মনকে গীবত থেকে সরিয়ে রাখুন। অর্থাৎ আপনি উপস্থিত থাকলেও অন্তরে আল্লাহর জিকির করুন এবং নিজেকে ব্যস্ত রাখুন। যেমন কুরআন তিলাওয়াত বা দুরূদ শরিফ পড়া।
৩. সরাসরি নিষেধ করা
হাদিসে এসেছে:
“যে ব্যক্তি গীবত শোনে এবং নিষেধ করে না, সে গীবতকারীর মতো পাপী।” (সুনানে বায়হাকি)
তাই আপনি যদি পারেন, দৃঢ়ভাবে বলুন: “আমি এ ধরনের আলোচনা সহ্য করতে পারি না। দয়া করুন।”
৪. স্থান পরিবর্তনের সুযোগ না থাকলে কী করবেন?
যদি বাসা ছাড়া আর কোনো জায়গা না থাকে, তাহলে আপনি নিম্নোক্ত আমল করুন:
- যখন গীবত শুরু হবে, তখন “আস্তাগফিরুল্লাহ” পড়তে থাকুন।
- মনে মনে আল্লাহর কাছে সাহায্য চান।
- নিজের কাজে মনোযোগ দিন।
আল্লামা ইবনে আবেদীন শামী (রহ.) ফাতাওয়া শামীতে (রদ্দুল মুহতার) লিখেছেন:
“যে ব্যক্তি জোরপূর্বক গীবত শুনতে বাধ্য হয় এবং বিরোধিতা করতে অক্ষম, সে গুনাহগার হবে না, তবে তার কর্তব্য হলো অন্তর দিয়ে অসন্তুষ্ট থাকা।”
বিকল্প ব্যবস্থা
- সময়মতো ঘর থেকে বের হয়ে অন্য কক্ষে চলে যান।
- হেডফোন ব্যবহার করে কুরআন বা লেকচার শুনুন।
- যদি সম্ভব হয়, বাসার নিয়ম করে দিন যে গীবতের আলোচনা নিষিদ্ধ।
সারসংক্ষেপ ও গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা
| বিষয় | করণীয় |
|------|--------|
| আত্মীয়তা রক্ষা | সালাম-দোয়া ও প্রয়োজনে ফোন যোগাযোগ রাখা। মজলিসে গেলে গীবতের বিষয় পরিবর্তনের চেষ্টা করা। |
| গীবত শোনা | অন্তর দিয়ে অসন্তুষ্ট থাকা, উঠে যাওয়া বা নিষেধ করা। নিষেধ না পারলে চুপ থাকা। |
| নিজের বাসা | পরিবারকে সচেতন করা। নিজে মানসিকভাবে সুরক্ষিত থাকা। আমল করা ও দোয়া করা। |
| গীবত করা | কখনোই জায়েয নয়। ভুলে হলে সাথে তাওবা ও ক্ষমা প্রার্থনা। |
ইমাম আবু হানিফা (রহ.) বলেন:
“যে ব্যক্তি গীবত শুনে তাতে সম্মতি দেয়, সে গীবতকারীর অংশীদার হয়।”
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে গীবত থেকে বাঁচার তাওফিক দিন। আমিন।
وَاللَّهُ أَعْلَمُ بِالصَّوَابِ