হিংসা দূর করার ইসলামী পদ্ধতি।

Halal and Haram · Hanafi

Question No: 2468
Questioner: Shadek Hossain
Question Asked: 09 Jul 2026, 08:12 AM
Reviewed & Published: 09 Jul 2026, 08:21 AM
Views: 54
Tokens: 4,249
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আমার সব কিছুতেই খালি হিংসা হয়,,কেউ কোনো ভালো কিছু করলে, ভালো চাকরি করলে আমার হিংসা হয়,,আমার আর কিছু ভালো লাগে না,,,আমার খালি মনে হচ্ছে সবাই এগিয়ে গেছে,,আমি চাই না কারো উন্নতি,,আমি জানি এটা ঠিক নাহ,,কিন্তু কিছুতেই হিংসা ছাড়তে পারি না,,আমার অনেক কিছু আছে আলহামদুলিল্লাহ,, তার পরও আমার সন্তুষ্টি নাই,,খালি অন্যের বিষয় নিয়ে হিংসা হয়,,কি করবো আমি,,,কেউ উন্নতি করলে আমি আর তার সাথে যোগাযোগ রাখি না,,কারন তাহলে আমার ভালো লাগে না

Answer

উত্তর:

প্রিয় প্রশ্নকারী ভাই/বোন,
প্রথমেই আপনার মনের কষ্ট ও দ্বিধা-দ্বন্দ্ব আমরা বুঝতে পারছি। আপনি নিজেই স্বীকার করছেন যে এই হিংসা (হাসাদ) ঠিক নয়, কিন্তু তা থেকে বের হতে পারছেন না। এটি একটি আধ্যাত্মিক রোগ, যা অনেক মুমিনেরই হয়। তবে আশার কথা হলো, আপনি এটি চিহ্নিত করতে পেরেছেন এবং সমাধান চাইছেন। নিচে কুরআন ও হাদিসের আলোকে এবং হানাফি ফিকহের নির্দেশনা অনুযায়ী বিশদ উত্তর দেওয়া হলো।


১. হিংসা (হাসাদ) ইসলামে কত বড় গুনাহ?

ইসলামে হিংসা (হাসাদ)কে সবচেয়ে নিকৃষ্ট মানসিক রোগগুলোর একটি বলা হয়েছে। কারণ এটি ব্যক্তির নিজের ইমান, মানসিক শান্তি ও সামাজিক সম্পর্ক নষ্ট করে।

কুরআনে বর্ণিত:

"আল্লাহ যা নিজ অনুগ্রহে কাউকে দান করেন, তার প্রতি মানুষের লোভ-হিংসা পছন্দনীয় নয়। আমি ধারাবাহিকভাবে আদম সন্তানদের গ্রন্থ ও প্রজ্ঞা এবং বিরাট রাজত্ব দান করেছি..." (সূরা নিসা ৪:৫৪) - এখানে হিংসা করতে নিষেধ করা হয়েছে।

"তাদের মধ্যে যারা ঈমান এনেছে, তাদের জন্য অন্তরে কোনো হিংসা রাখিনি।" (সূরা হাশর ৫৯:১০) - অর্থাৎ মুমিনদের অন্তর হিংসামুক্ত থাকে।

হাদিসে বর্ণিত:

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: "তোমরা হিংসা থেকে বাঁচো। কেননা হিংসা আগুন যেমন কাঠকে গ্রাস করে, তেমনি হাসাদ (হিংসা) সৎকাজগুলোকে গ্রাস করে।" (আবু দাউদ, হাদিস ৪৯০৩; ইবনে মাজাহ, হাদিস ৪২১০)

আরও বলেছেন: "তোমরা পরস্পর হিংসা করো না, একে অপরের ওপর ধোঁকা দিও না, ক্রোধ করো না, দ্বন্দ্ব করো না, বরং আল্লাহর বান্দা ভাই ভাই হয়ে যাও।" (বুখারি, হাদিস ৬০৬৫; মুসলিম, হাদিস ২৫৬৪)


২. হিংসার কারণ ও আপনার বর্তমান অবস্থার বিশ্লেষণ

আপনি যা বর্ণনা করেছেন তা হলো:

  • অন্যদের ভালো কিছু দেখলে বা উন্নতি দেখলে আপনার হিংসা হয়।
  • আপনার নিজের কাছে অনেক কিছু থাকা সত্ত্বেও সন্তুষ্টি নেই।
  • অন্যদের এগিয়ে যাওয়া আপনি সহ্য করতে পারেন না এবং তাদের সাথে যোগাযোগও বন্ধ করে দিয়েছেন।

এটি মূলত নিজের প্রতি অসন্তুষ্টি ও আল্লাহর বণ্টনে অসন্তুষ্টি থেকেই জন্মায়। শয়তান মানুষকে এই কুমন্ত্রণা দেয় যে, তুমি যদি কারও ভালো দেখো, তবে তুমি তাদের থেকে পিছিয়ে পড়ছ। অথচ বাস্তবতা হলো, আল্লাহ প্রত্যেকের জন্য ভিন্ন ভিন্ন নিয়ামত নির্ধারণ করেছেন (সূরা আলে ইমরান ৩:১৪)।


৩. হিংসা দূর করার ইসলামী পদ্ধতি

ক) অন্যের ভালো দেখে দোয়া করুন: অন্যের উন্নতি দেখলে যদি আপনার মনে হিংসা আসে, তাহলে সাথে সাথে আপনি তাদের জন্য দোয়া করে ফেলুন। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: "তোমাদের কেউ যখন তার ভাইয়ের মধ্যে কোনো ভালো জিনিস দেখে, তখন সে যেন তার জন্য বরকতের দোয়া করে।" (তিরমিযি, হাদিস ২১৫৪)

খ) আল্লাহর বণ্টনে সন্তুষ্ট থাকা: আপনি নিজেই বলেছেন, আপনার কাছে অনেক কিছু আছে (আলহামদুলিল্লাহ)। তাই প্রতিদিন অন্তত ৫-১০ মিনিট সময় নিয়ে নিজের কী কী নিয়ামত আছে তা লিখুন বা স্মরণ করুন। হাদিসে এসেছে: "তোমাদের কেউ যখন তার পরিবার ও সম্পদের দিকে তাকায়, তখন সে যেন তার চেয়ে নিম্নস্তরের দিকে তাকায়, উচ্চস্তরের দিকে না। এটাই বেশি উত্তম যে, তোমরা আল্লাহর নিয়ামতকে তুচ্ছ না করো।" (বুখারি, হাদিস ৬৪৯০)

গ) তাওবা ও ইস্তিগফার: হিংসা একটি পাপ। যখনই মনে হিংসা আসবে, সাথে সাথে "আউযু বিল্লাহি মিনাশ শায়ত্বানির রাজিম" পড়ুন এবং "আস্তাগফিরুল্লাহ" বলুন। এতে শয়তানের কুমন্ত্রণা দূর হবে।

ঘ) ভাই সহায়তা ও দোয়া চাওয়া: নিজেকে শুধু শাস্তি না দিয়ে, কোনো আলেম বা পীরে কামেলের কাছে যান। তারা আপনাকে মানসিক চিকিৎসা ও জিকিরের পদ্ধতি বলতে পারেন।

ঙ) অন্যের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন না করা: আপনি বলেছেন, অন্যের উন্নতি দেখলে তার সাথে যোগাযোগ বন্ধ করে দেন। এটি ঠিক নয়। বরং আপনি তাদের সাথে দেখা-সাক্ষাৎ বজায় রাখুন, কিন্তু মনে মনে দোয়া করুন: "হে আল্লাহ! আমার ও ভাইয়ের মধ্যে ভালোবাসা বৃদ্ধি করো।" এতে করে পারস্পরিক সম্পর্ক মজবুত হবে এবং হিংসা কমবে।


৪. হানাফি ফিকহের উল্লেখযোগ্য দিকনির্দেশনা

হানাফি ফিকহে হিংসা থেকে বাঁচতে নিম্নলিখিত আমলগুলো বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ:

  • ইমাম আবু হানিফা (রহঃ) বলেন: "হিংসাই হলো প্রথম পাপ যা আকাশে ফেরেশতাদের মধ্যে হয়েছিল (কুতুবি) আর জমিনে কাবিল হাবিলের ঘটনায়।" তাই এটি অত্যন্ত ভয়ানক।
  • ইবনে আবেদিন (রহঃ) রাদ্দুল মুহতার গ্রন্থে বলেন: "হিংসা এমন একটি ক্রিয়া যা হৃদয়কে পুড়িয়ে দেয় এবং ইবাদতের ফল বিনষ্ট করে।" (রাদ্দুল মুহতার, ২/৪১৬)

উপসংহার:
প্রিয় ভাই/বোন, আপনি যে সমস্যায় ভুগছেন, তা মানবিক ও শয়তানের প্ররোচনা। তবে আপনি যদি আল্লাহর ওপর ভরসা করেন এবং উপরোদ্ধৃত পদ্ধতি অনুসরণ করেন, তাহলে ধীরে ধীরে এই রোগ কেটে যাবে। নিজেকে বোঝান: "আল্লাহ আমার জন্য যা রেখেছেন, তা-ই আমার জন্য উত্তম।" প্রতিদিন সূরা ফাতিহা ও আয়াতুল কুরসি বেশি করে পড়ুন, তাহলে শয়তানের কুমন্ত্রণা দূর হবে।

আপনার জন্য দোয়া:
উল্লা-হুম্মা লা তাকিলনি ইলা নাফসি ত্বরফাতা আইনিন আবাদান
(হে আল্লাহ! আমাকে চোখের পলকের জন্যও আমার নিজের ওপর ছেড়ে দিয়ো না।)


আল্লাহ তাআলা আপনার হৃদয়কে সন্তুষ্টি ও শান্তিতে ভরিয়ে দিন।
আমিন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.