গর্ভের সন্তানের জন্য রুকইয়াহ করা
Miscellaneous Fiqh · Ahle Hadith / Salafi
Question
Answer
উত্তর: বদনজর থেকে সুরক্ষা ও আল্লাহর ওপর নির্ভরতা
প্রথমেই জেনে রাখা জরুরি—গর্ভস্থ সন্তানের মৃত্যু আল্লাহর নির্ধারিত তাকদীর অনুযায়ী হয়েছে। বদনজর একটি বাস্তব বিষয়, কিন্তু প্রতিটি জিনিস আল্লাহর ইচ্ছায় ঘটে। আপনি দিনে-রাতে হেফাজতের আমল করছেন, এটি খুবই উত্তম। তবে কখনো কখনো আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাকে পরীক্ষা করেন, এবং এর মাধ্যমে গুনাহ মাফ করেন বা মর্যাদা বাড়ান। আপনার কোনো দোষ বা ভুল নেই—তাই নিজেকে দোষারোপ করবেন না।
নিম্নে কুরআন ও সহীহ হাদীসের আলোকে বিস্তারিত দিকনির্দেশনা দেওয়া হলো:
১. বদনজর থেকে সুরক্ষার পূর্ণাঙ্গ পদ্ধতি
ক. সকাল-সন্ধ্যার মাসনূন যিকির ও দু‘আ
আপনি আগে থেকেই এগুলো করছেন, তবে সঠিকভাবে ও বিশ্বাসের সাথে করতে থাকুন। নিম্নের যিকিরগুলো নিয়মিত পড়ুন:
- আয়াতুল কুরসী (সকাল-সন্ধ্যা ও ঘুমানোর আগে)
- সূরা আল-ইখলাস, আল-ফালাক, আন্নাস (প্রত্যেকটি ৩ বার সকাল-সন্ধ্যা এবং ঘুমানোর আগে)
- বিসমিল্লাহিল্লাযী লা ইয়াদুররু মা‘আসমিহী শাইউন ফিল আরদি ওয়ালা ফিসসামা’ (সকাল-সন্ধ্যা ৩ বার)
(হাদীস: আবু দাউদ, ইবনে মাজাহ; সহীহ আত-তিরমিযী) - লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারীকা লাহু, লাহুল মুলকু... (সকালে ১০০ বার)
- হাসবুনাল্লাহু ওয়া নি‘মাল ওয়াকীল (৭০ বার বা প্রয়োজনমত)
খ. নিজের ও সন্তানের ওপর দম করা
রাসূলুল্লাহ ﷺ বদনজর থেকে আশ্রয় চেয়ে নিজের ওপর দম করতেন এবং সাহাবীদের জন্যও তা শিক্ষা দিতেন। আপনি প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যা সন্তানের মাথা, বুক ও গায়ে হাত রেখে সূরা ফালাক, নাস, ইখলাস এবং আয়াতুল কুরসী পড়ে ফুঁ (দম) দিন।
হাদীস: জিবরীল (আ.) নবী ﷺ-এর ওপর দম করতেন: “বিসমিল্লাহি আরকীকা মিন কুল্লি শাই’ইন ইউযীকা...” (সহীহ মুসলিম)
গ. নিয়মিত রুকইয়াহ শর‘ইয়াহ করা
যেসব স্থানে বদনজরের আশঙ্কা বেশি, সেখানে দম ও রুকইয়াহ করা সুন্নত। আপনি একজন বিশ্বস্ত আলিম বা নিজেই রুকইয়াহ করতে পারেন। তবে সতর্ক থাকুন—অতিরিক্ত ভয় বা কুসংস্কারে জড়িয়ে পড়বেন না।
২. আপনার ভুল কী ছিল?
বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আপনার কোনো ভুল ছিল না। তবে নিচের বিষয়গুলো খেয়াল করুন:
-
বদনজরের ভয় পেয়ে অতিরিক্ত উদ্বিগ্ন হওয়া
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: “যদি কিছু তোমার উপকারে আসে, তবে আল্লাহর ওপর ভরসা করো; আর যদি কিছু তোমার ক্ষতি করে, তবে ধৈর্য ধরো।” (মুসলিম)
নিজেকে ও সন্তানকে বদনজরের ভয়ে ভীত রাখা উচিত নয়; বরং আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা রাখতে হবে। -
হেফাজতের আমল করলেও ভেতরে পূর্ণ ইযআন (বিশ্বাস) ও ইখলাস (একনিষ্ঠতা) থাকা জরুরি
কেবল মুখে পড়াই যথেষ্ট নয়; আল্লাহর কাছে সাহায্য চাওয়া এবং তাঁর ওপর নির্ভর করাই মূল বিষয়। আপনি যদি বদনজরের আসল ক্ষমতা মানেন, তবে মনে রাখবেন—বদনজর নিজে কোনো ক্ষতি করে না; বরং আল্লাহর ইচ্ছা ও হুকুমেই তা ঘটে। -
সন্তানের মৃত্যুকে বদনজর হিসেবে নির্দিষ্ট করে চিহ্নিত না করা
গর্ভপাতের অনেক কারণ থাকে (জিনগত ত্রুটি, শারীরিক সমস্যা ইত্যাদি)। সবকিছু আল্লাহর তাকদীর। নিজেকে দায়ী না করে তাকদীরের ওপর সন্তুষ্ট থাকুন।
৩. এখন কী করবেন?
ক. তওবা ও ইস্তিগফার
আপনার কোনো ইচ্ছাকৃত গুনাহ আছে কি না, পরীক্ষা করুন। যদি না থাকে, তবে শুধু আল্লাহর কাছে ক্ষমা চান এবং তাকদীরে রেজামন্দি প্রকাশ করুন।
খ. সন্তানের সুরক্ষায় বেশি বেশি দো‘আ করুন
রাসূলুল্লাহ ﷺ হাসান ও হুসাইন (রা.)-এর জন্য দো‘আ করতেন:
“উ‘ইযুকুমা বিকালিমাতিল্লাহিত্তাম্মাতি মিন কুল্লি শাইতানিন ওয়া হাম্মাতিন ওয়া মিন কুল্লি ‘আইনিন লাম্মাহ্।” (বুখারী)
গ. ধৈর্য ও শোকর
আল্লাহ বলেন: “নিশ্চয়ই ধৈর্যশীলদেরকে তাদের প্রতিদান অপরিমিতভাবে দেয়া হবে।” (সূরা আয-যুমার: ১০)
১৭ সপ্তাহের সন্তান জান্নাতে যাবে (ইনশাআল্লাহ), কারণ গর্ভপাত হওয়া সন্তান মুসলিম পিতামাতার জন্য জান্নাতে পাখি হবে (হাদীস: মুসলিম)।
ঘ. অন্যকে বদনজর না দেওয়ার চেষ্টা
অন্যের প্রতি হিংসা বা ঈর্ষা থেকে বিরত থাকুন। নিজের ও সন্তানের প্রশংসা করলে “মাশা আল্লাহ” (আল্লাহ যা চেয়েছেন তা-ই হয়েছে) বলুন, এবং “বারাকাল্লাহু ফীক” বলে দো‘আ করুন।
৪. অতিরিক্ত সতর্কতা (আলিমদের মতামত)
- শায়খ ইবনে বায (রহ.) ও শায়খ আলবানী (রহ.) বলেছেন: বদনজর থেকে বাঁচতে মুমিনের জন্য সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার হলো সকাল-সন্ধ্যার যিকির ও দো‘আ এবং আল্লাহর ওপর পূর্ণ তাওয়াক্কুল।
- শায়খ ইবনে উসাইমীন (রহ.) বলেছেন: বদনজরের ভয় পেয়ে মানুষকে অন্ধভাবে তাবীজ-তামীমা পরা বা কুসংস্কার করা হারাম; বরং কুরআন ও হাদীসের বর্ণিত দো‘আ ও রুকইয়াহই যথেষ্ট।
উপসংহার
আপনার কোনো ভুল ছিল না, বরং এটি আল্লাহর তাকদীর। আপনি সঠিক আমল করেই চলছেন। এখন বেশি বেশি করে:
- সকাল-সন্ধ্যার যিকির ও দম অব্যাহত রাখুন
- সন্তানের ওপর নিয়মিত রুকইয়াহ করুন
- আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা রাখুন
- চিন্তা ও ভয় কমিয়ে ধৈর্য ও রেজামন্দি অর্জনের চেষ্টা করুন
রেফারেন্স:
- সূরা আল-ফালাক, আন্নাস
- সহীহ বুখারী, মুসলিম (বদনজর ও রুকইয়াহ অধ্যায়)
- ইবনুল কাইয়্যিম, “যাদুল মা‘আদ” (বদনজর অধ্যায়)
- শায়খ ইবনে বায, “মাজমূ‘ ফাতাওয়া”
- শায়খ আলবানী, “সিলসিলাতুল আহাদীসিস সহীহা”
আল্লাহ আপনাকে ধৈর্য দিন এবং আপনার সন্তানকে হেফাজত করুন। আমীন। আল্লাহই সর্বশক্তিমান ও সর্বজ্ঞানী।