ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি ঋণ শোধে ইউরোপের হোটেলে কাজ করতে গেলে ঈমান ও তাওয়াক্কুলের সমস্যা হবে কি?

Miscellaneous Fiqh · Hanafi

Question No: 2458
Questioner: Akhi
Question Asked: 08 Jul 2026, 09:28 PM
Reviewed & Published: 08 Jul 2026, 09:37 PM
Views: 41
Tokens: 5,355
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

কোন মানুষের অনেক দেনা।বলতে গেলে জায়গা ও নায় মানে বসতভিটা।তহ শেফের কাজ করে কয় টাকা পায়।এটা নিয়ে যদি বলে ”এই টাকা নিয়ে কিভাবে দেনা শোধ করবা আর কিভাবে সংসার চালাবা।ভাষা শিখ বিদেশ চলে যাওয়ার জন্য”। মানে ইউরোপে।ইউরোপের হোটেলে আবার সম্পূর্ণ টাকা হালাল নাও হতে পারে।তহ এতে কি ঈমানে সমস্যা হবে? এটা কি আল্লাহর উপর ভরসা না করার মত কিছু হবে? মনে কিন্তু এমন না থাকলে?

Answer

সুপ্রিয় প্রশ্নকারী ভাই / বোন,

আপনার প্রশ্নটি মূলত দুটি বিষয় নিয়ে: ১. একজন ঋণগ্রস্ত ব্যক্তির ঋণ পরিশোধ ও সংসার চালানোর জন্য ইউরোপে (হোটেলে) কাজ করতে যাওয়া। ২. এই কাজটি যদি সম্পূর্ণ হালাল না-ও হয়, তাহলে এতে কি ঈমানের সমস্যা হবে? আর এটা কি আল্লাহর উপর ভরসা (তাওয়াক্কুল) না করার নামান্তর?

আপনার মনে প্রশ্ন জাগা খুবই স্বাভাবিক, কারণ একজন মুমিন সবসময় তাঁর উপার্জনের পবিত্রতা ও আল্লাহর রিজিকের উপর ভরসার সম্পর্কে সচেতন থাকেন। আসুন আমরা কুরআন, হাদিস ও হানাফি ফিকহের আলোকে বিষয়টি বুঝার চেষ্টা করি।

উত্তর সংক্ষেপে

প্রথম অংশ: ঈমানের সমস্যা বা তাওয়াক্কুলের অভাব?

  • না, এতে ঈমানের কোনো সমস্যা হবে না, যদি আপনার নিয়ত খাঁটি থাকে এবং আপনি আল্লাহর উপর ভরসা রেখেই এই উদ্যোগ গ্রহণ করেন।
  • এটা আল্লাহর উপর ভরসা না করার নামান্তর নয়, বরং এটি একটি বৈধ উপায় অবলম্বন (কাসব) যা ইসলাম সমর্থন করে। আল্লাহ বলেন, মানুষ তার চেষ্টা অনুযায়ী ফল পায় (সূরা আন-নাজম: ৩৯)। রাসূলুল্লাহ (সা.)-ও হাতের শ্রমকে সর্বোত্তম উপার্জন বলেছেন এবং নিজেও কাজ করেছেন।

দ্বিতীয় অংশ: কাজ ও উপার্জনের হালাল-হারাম সম্পর্কে সতর্কতা:

  • হোটেলের কাজ শরীয়তের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ হারাম নয়, তবে অত্যন্ত সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। অনেক হোটেলে হারাম কাজ (যেমন মদ পরিবেশন, হারাম মাংস রান্না, সুদী লেনদেন ইত্যাদি) থাকে। যদি আপনি এমন কোনো কাজে জড়িত হন যা সরাসরি হারাম, তাহলে তা জায়েজ হবে না।
  • আপনার কর্তব্য হবে এমন একটি হোটেল বা বিভাগ নির্বাচন করা যেখানে আপনার কাজ সম্পূর্ণ হালাল হয় (যেমন: রুম সার্ভিস, সাধারণ রান্না, মেইনটেন্যান্স, নিরাপত্তা ইত্যাদি) এবং সরাসরি হারাম জিনিসের সাথে আপনার সংশ্লিষ্টতা না থাকে।
  • শুধুমাত্র "অনেক টাকা পাওয়া যাবে" বা "ঋণ শোধ করা যাবে" এই কারণে হারাম বা সন্দেহযুক্ত কাজ করা জায়েজ নয়। কিন্তু আপনি যদি সন্ধান করে একটি হালাল কাজের জায়গা খুঁজে নেন, তাহলে সেটা উত্তম।

বিস্তারিত বিশ্লেষণ

১. ঋণগ্রস্ত অবস্থায় বিদেশ যাওয়ার বৈধতা ও তাওয়াক্কুলের পরিচয়

ইসলামে ঋণ পরিশোধ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি দায়িত্ব। রাসূলুল্লাহ (সা.) ঋণ পরিশোধ না করেই মৃত্যুবরণকারী ব্যক্তির পাপের কথা বলেছেন। তাই ঋণগ্রস্ত ব্যক্তির জন্য ঋণ পরিশোধের সবচেয়ে উত্তম পন্থা খোঁজা জরুরি।

  • তাওয়াক্কুল কি? তাওয়াক্কুল মানে কেবল হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকা নয়, বরং উপায়-উপকরণ গ্রহণ করে তারপর আল্লাহর উপর ভরসা করা। অর্থাৎ প্রথমে চেষ্টা করা, তারপর বিশ্বাস করা যে সফলতা একমাত্র আল্লাহর কাছ থেকেই আসবে। আল্লাহ তা'আলা বলেন: "...অতঃপর তুমি দৃঢ় সংকল্প হলে আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল কর। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাওয়াক্কুলকারীদের পছন্দ করেন।" (সূরা আল-ইমরান: ১৫৯)

  • এখানে ব্যক্তিটি ঋণগ্রস্ত, দেশে সংসার ও ঋণ পরিশোধের কোনো বৈধ উপায় নেই, তাই তিনি বিদেশ যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন - এটি একটি উপায় অবলম্বন (ইখতিয়ার)। এটি তাওয়াক্কুলের পরিপন্থী নয়, বরং তাওয়াক্কুলেরই একটি অংশ।

  • ইমাম আবু হানিফা (রহ.) এর মতে, জীবিকা অর্জনের জন্য চেষ্টা করা ওয়াজিব। তাই ঋণগ্রস্ত অবস্থায় দেশে বসে না থেকে হালাল রিজিকের সন্ধানে বের হওয়া প্রশংসনীয়। (ফাতাওয়া হিন্দিয়া, খণ্ড ৫, পৃষ্ঠা ৩১৭)

২. হোটেলে কাজ ও হারাম উপার্জনের সতর্কতা

ইউরোপের হোটেলে কাজ করার বিষয়টি অত্যন্ত সতর্কতার দাবি রাখে। হানাফি ফিকহের কিতাবসমূহে (যেমন রদ্দুল মুহতার, ফাতাওয়া শামী) হারাম জিনিসের সাথে সংশ্লিষ্টতা নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

  • হারাম কাজ: মদ বা মদ ভর্তি করা, শূকরের মাংস রান্না করা বা পরিবেশন করা, সুদ লেনদেনের সাথে যুক্ত কাজ, বেহায়াপনা (যেমন নাইট ক্লাব) ইত্যাদি কাজে জড়িত হওয়া হারাম।

  • জায়েজ কাজ: রুম সার্ভিস (যেখানে মদ পরিবেশন জড়িত নয়), রান্নাঘরের সাধারণ কাজ (যেখানে হারাম ও হালাল মাংস আলাদা আলাদা সংরক্ষিত থাকে এবং আপনি হারামের সংস্পর্শে আসেন না), হোটেলের সাধারণ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, নিরাপত্তা ইত্যাদি কাজ জায়েজ হতে পারে। কিন্তু প্রতিটি হোটেলের নীতি ভিন্ন। তাই ভালোভাবে খোঁজ নিয়ে, কোনো হারাম কাজের সাথে সম্পৃক্ত না হয় এমন একটি জায়গা বেছে নেওয়া ফরজ।

  • মুফতী মুহাম্মাদ শফী (রহ.) তাঁর মাআরিফুল কোরআনে বলেন, “আল্লাহর ভয় যার অন্তরে আছে, তিনি সন্দিহান উপার্জন থেকে দূরে থাকবেন। যদি স্পষ্ট হারাম না থাকে তবুও সন্দেহমুক্ত উপার্জন উত্তম।” তাই একটি হোটেল নির্বাচনের পূর্বে সে বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া আপনার জন্য আবশ্যক।

৩. "দেশে না থেকে বিদেশ যাওয়া" ও "ভাবি কিভাবে দেনা শোধ করবা" এই কথার অর্থ

প্রশ্নে উল্লেখিত "ভাবি কিভাবে দেনা শোধ করবা আর কিভাবে সংসার চালাবা"- এই কথাটি যদি বাস্তব অবস্থার প্রতিফলন হয় (অর্থাৎ দেশে কোনো বৈধ ও যথাসময়ের আয়ের পথ নেই), তাহলে এটি হতাশা বা তাওয়াক্কুলের অভাব নয়, এটি বাস্তবতা। আল্লাহর উপর ভরসা করতে গিয়ে পরিবার ও পাওনাদারদের অধিকার নষ্ট করা জায়েজ নয়।

স্মরণ রাখবেন: হযরত উমর (রা.) বলেছেন, “তোমরা এমনভাবে রিজিক অন্বেষণ কর যাতে তোমার রিজিক আসমানে আকাশ থেকে না পড়ে।” (বুখারী, বাবুল কাসব) অর্থাৎ, রিজিকের জন্য চেষ্টা করা ঈমানের অংশ।

উপসংহার ও পরামর্শ

১. ঈমান ও তাওয়াক্কুল: বিদেশ যাওয়ার সিদ্ধান্ত ঈমানের সমস্যা সৃষ্টি করবে না, যদি আপনি আল্লাহর উপর ভরসা রাখেন এবং হালাল উপার্জনের জন্য বদ্ধপরিকর থাকেন। আপনার মনে যদি এই বিশ্বাস থাকে যে, 'আল্লাহই রিজিকদাতা, তিনি এই পথে হালাল রিজিক দেবেন ইনশাআল্লাহ,' তাহলে এটি তাওয়াক্কুল নয়, বরং সঠিক তাওয়াক্কুলই হবে।

২. হারাম থেকে বেঁচে থাকার চেষ্টা: ইউরোপের হোটেলে কাজ সম্পূর্ণ হালাল না হওয়ার ঝুঁকি আছে। তাই আপনাকে অবশ্যই এমন একটি হোটেল এবং চাকরি খুঁজে বের করতে হবে যেখানে আপনি হারাম কাজে (মদ, শূকর, ইত্যাদি) জড়িত হবেন না। সম্ভব হলে কোনো মুসলিম মালিকানাধীন হোটেল বা অন্যান্য হালাল পেশা (যেমন ট্যাক্সি ড্রাইভিং, নিজের ভাষায় অনুবাদের কাজ, ইত্যাদি) খোঁজার চেষ্টা করা ভালো।

৩. ইসলামী নির্দেশিকা (ভাষা শিখে যাওয়া): ভাষা শেখা এবং সে অনুযায়ী বিদেশ যাওয়া একটি বুদ্ধিমানের কাজ। এটি অপেক্ষাকৃত কম সমস্যার পথ। আপনি যদি ভাষা শিখে কোনো একটি জায়েজ পেশায় যুক্ত হতে পারেন, সেটাই উত্তম।

চূড়ান্ত কথা: আপনার সিদ্ধান্ত যদি 'হালাল রিজিক' এবং 'ঋণ পরিশোধ'-এর দৃঢ় ইচ্ছার ভিত্তিতে হয়, তাহলে এটি ঈমানের দুর্বলতা নয়। বরং ঋণগ্রস্ত অবস্থায় নিজের ও পরিবারের দায়িত্ব নেওয়া ইমানি দায়িত্ব। তবে হারাম কাজের সাথে সম্পৃক্ততা এড়িয়ে চলুন এবং আল্লাহর উপর পূর্ণ ভরসা রাখুন। সফলতা আল্লাহর কাছ থেকে আসবে।

আল্লাহ তা'আলা আপনার ঋণ পরিশোধের জন্য, হালাল রিজিকের জন্য এবং ঈমানের সাথে জীবন যাপনের জন্য পথ দেখিয়ে দিন। (আমিন)

রেফারেন্স:

  • সূরা আন-নাজম: ৩৯
  • সূরা আল-ইমরান: ১৫৯
  • রদ্দুল মুহতার (কিতাবুল কাসব ওয়াল বাই')
  • ফাতাওয়া হিন্দিয়া (পঞ্চম খণ্ড, ঋণ ও উপার্জন সম্পর্কিত অধ্যায়)
  • মাআরিফুল কুরআন (মুফতী মুহাম্মদ শফী)
  • ইমদাদুল ফাতাওয়া (মাওলানা আশরাফ আলী থানভী)
  • বাহিশতি জেওর (আশরাফ আলী থানভী)

This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.