হজ্জ ফরজ হওয়ার সামর্থ্য বলতে কি?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
২।জায়েজ কিছু করার পর হজ্জ করা মত টাকা না থাকলে কি হজ্জ ফরজ হবে?
৩।সৌদি বাদে অন্য দেশে প্রবাসে থাকলে হজ্জের মৌসুমে ছুটি না পেলে হজ্জ ফরজ হবে কি?
Answer
উত্তর
প্রশ্নটি তিনটি অংশে বিভক্ত। নিচে প্রতিটি অংশের উত্তর হানাফি ফিকহের নির্ভরযোগ্য কিতাব ও উলামায়ে কিরামের ফতোয়ার আলোকে পেশ করা হলো।
প্রথম প্রশ্ন:
নিজে, স্ত্রী, ছেলে-মেয়েদের ভালো ভরপোষণ (পোশাক, পড়ালেখা, খাবার, মাংস, চিকিৎসা) না দিয়ে কি ফরজ হজের টাকা যোগাতে হবে?
উত্তর: হজ ফরজ হওয়ার জন্য শর্ত হলো—নিজের ও পোষ্যদের মৌলিক ও প্রয়োজনীয় খরচের (যেমন: খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা) অতিরিক্ত নিসাব পরিমাণ সম্পদ থাকা। যদি কারো কাছে হজের টাকা থাকে কিন্তু সে তার স্ত্রী-সন্তানদের প্রয়োজনীয় ভরপোষণ দেয়নি, তাহলে তার ওপর হজ ফরজ হবে না; বরং আগে পোষ্যদের হক আদায় করতে হবে। কেননা পোষ্যদের ভরণপোষণ দেওয়া ফরজ, আর হজ ফরজ হওয়ার জন্য তা থেকে অতিরিক্ত সম্পদ শর্ত।
হানাফি কিতাবের উল্লেখ:
- রদ্দুল মুহতার (৩/৪৭২): “হজ ফরজ হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় আসবাব ও পোষ্যদের খরচের অতিরিক্ত নিসাব পরিমাণ সম্পদ থাকা শর্ত।”
- ফাতাওয়া উসমানী (২/৪৮৬): “পোষ্যদের ভরণপোষণ না দিয়ে হজে যাওয়া জায়েজ নয়; বরং হজ ফরজ হওয়ার জন্য পোষ্যদের খরচ নিশ্চিত হওয়া জরুরি।”
- বাহিশতি জেওর (হজ অধ্যায়): “যে ব্যক্তির স্ত্রী-সন্তানের খোরপোশের ব্যবস্থা না থাকে, তার ওপর হজ ফরজ নয়।”
সিদ্ধান্ত: হজের টাকা দিয়ে আগে স্ত্রী-সন্তানের প্রয়োজনীয় ভরপোষণ পূর্ণ করতে হবে। তারপর অতিরিক্ত থাকলে তবেই হজ ফরজ হবে।
দ্বিতীয় প্রশ্ন:
জায়েজ কিছু করার পর হজ করার মতো টাকা না থাকলে কি হজ ফরজ হবে?
উত্তর: যদি কোনো ব্যক্তি হজের সামর্থ্য হওয়ার পর সেই টাকা জায়েজ (অনুমোদিত) কাজে খরচ করে ফেলে এবং এরপর তার কাছে হজের টাকা না থাকে, তাহলেও তার উপর হজ ফরজ হবে। হজের সময় থাকতে ইচ্ছাকৃতভাবে সম্পদ নষ্ট করে ফেলেন বা খরচ করে ফেলেন, এজন্য তিনি গোনাহগার হবেন।
সিদ্ধান্ত: বর্তমানে হজের টাকা না থাকলেও হজ ফরজ। যদি পরবর্তীতে চেষ্টা করার পরও হজ করা সম্ভব না হয়, তাহলে তাওবাহ ইস্তেগফার করতে হবে। হয়তো আল্লাহ মাফ করেও দিতে পারেন।
তৃতীয় প্রশ্ন:
সৌদি বাদে অন্য দেশে প্রবাসে থাকলে হজের মৌসুমে ছুটি না পেলে হজ ফরজ হবে কি?
উত্তর: হজ ফরজ হওয়ার জন্য শারীরিক ও আর্থিক সামর্থ্যের সাথে নিরাপদ পথ ও সময়মতো পৌঁছার সামর্থ্যও শর্ত। প্রবাসে থাকা ব্যক্তি যদি চাকরি বা পেশাগত কারণে হজের মৌসুমে ছুটি না পায় এবং ছুটি নেওয়া সম্ভব না হয় (যেমন: কর্তৃপক্ষ অনুমতি না দেয় অথবা ছুটি নিলে চাকরি চলে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে), তাহলে তার ওপর হজ ফরজ হবে না। তবে যদি ছুটি নেওয়ার কোনো বাস্তব বাধা না থাকে (যেমন: ছুতি মঞ্জুর হয় কিন্তু সে নেয় না বা অলসতা করে), তাহলে হজ ফরজ হবে এবং তা পালন করা ওয়াজিব হবে।
হানাফি ফিকহে বলা হয়েছে: “হজের পথে কোনো বাধা (যেমন: রোগ, শত্রুভয়, বা রোডক্লোজার) থাকলে হজ ফরজ হয় না।” (রদ্দুল মুহতার ৩/৪৭০)
অনুরূপভাবে, চাকরি ও ছুটির বিষয়টি বাস্তব বাধা হিসেবে গণ্য হতে পারে যদি:
- আইনগতভাবে ছুটি পাওয়া অসম্ভব হয়।
- ছুটি নিলে জীবিকার গুরুতর ক্ষতি হয়।
- কর্তৃপক্ষ ছুতি দিতে রাজি না হয়।
ফাতাওয়া উসমানী (২/৪৯২): “যে ব্যক্তির হজে যাওয়ার সামর্থ্য আছে কিন্তু চাকরি বা অন্য কারণে ছুটি না পাওয়ায় যেতে পারে না, তার ওপর হজ ফরজ নয়; তবে সামর্থ্য থাকলে পরে যখন সুযোগ হবে তখন আদায় করে নেবে।”
ইমদাদুল ফাতাওয়া (২/৪৭১): “প্রবাসী ব্যক্তি যদি ছুটির জন্য সক্ষম না হয়, তাহলে সে মুস্তাতি‘ (সামর্থ্যবান) নয়, তাই তার ওপর হজ ফরজ নয়।”
সিদ্ধান্ত: হজের মৌসুমে ছুটি না পাওয়া যদি বাস্তব এবং অনিবার্য হয়, তবে হজ ফরজ হবে না। কিন্তু যদি ছুটি পাওয়া সম্ভব হয় কিন্তু সে অলসতা করে, তাহলে হজ তার ওপর ফরজ থাকবে এবং গুনাহ হবে।
সারসংক্ষেপ (Summary in Bengali)
| প্রশ্ন | উত্তর | দলিল | |--------|-------|------| | ১. পোষ্যদের ভরপোষণ বাদ দিয়ে হজে টাকা লাগানো? | না; আগে পোষ্যদের হক আদায় করতে হবে, তবেই হজ ফরজ হবে। | রদ্দুল মুহতার, ফাতাওয়া উসমানী | | ২. জায়েজ খরচ করে হজের টাকা শেষ হলে কি হজ ফরজ? | হজ ফরজ। | ৩. ছুটি না পেলে হজ ফরজ? | প্রকৃত বাধা থাকলে ফরজ নয়; সামর্থ্য থাকলে পরবর্তীতে আদায় করবে। | ফাতাওয়া উসমানী, ইমদাদুল ফাতাওয়া |
মোটকথা: হজ ফরজ হওয়ার জন্য বর্তমান ও বাস্তব সামর্থ্য (আর্থিক, শারীরিক, নিরাপত্তা ও সময়) জরুরি। উপরের তিন ক্ষেত্রেই কোনো বাস্তব বাধা থাকলে হজ ফরজ হবে না, তবে ইচ্ছাকৃতভাবে উপেক্ষা করলে গুনাহ হবে।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সহিহ আকিদা ও আমলের তাওফিক দিন। (আমিন)