গায়রে মাহরাম পরিবারের সদস্যদের সাথে রেস্তোরাঁয় যাওয়ারর বিধান।

Halal and Haram · Hanafi

Question No: 2451
Questioner: JJ
Question Asked: 08 Jul 2026, 07:29 PM
Reviewed & Published: 08 Jul 2026, 07:46 PM
Views: 55
Tokens: 4,587
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আমার পরিবারের সদস্যদের সাথে যেখানে গায়রে মাহরাম সদস্য ও আছে যেমন ভাই এর স্ত্রী, সেই স্ত্রীর আগের বিবাহের মেয়ে, এছাড়া মাহরাম সদস্য যেমন আমার মা, ভাই এর মেয়ে রা আছে।
এভাবে পারিবারিক ভাবে খাওয়ার জন্য রেস্তোরাঁয় যাওয়ার বিধান কি যাতে গুনাহ হবে না? বা আদৌ কি জায়েজ?

Answer

উত্তর প্রদান

প্রশ্ন: আমার পরিবারের সদস্যদের সাথে যেখানে গায়রে মাহরাম সদস্যও আছে যেমন: ভাইয়ের স্ত্রী, সেই স্ত্রীর পূর্ববর্তী বিবাহের মেয়ে (সৎ-কন্যা), অপরদিকে মাহরাম সদস্য যেমন আমার মা, ভাইয়ের মেয়েরা আছে। এভাবে পারিবারিকভাবে খাওয়ার জন্য রেস্তোরাঁয় যাওয়ার বিধান কী? যাতে গুনাহ না হয়? বা আদৌ কি জায়েজ?

উত্তর:
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম।
আপনার প্রশ্নে উল্লেখিত পরিস্থিতি অনুযায়ী একটি পরিবারগোষ্ঠী যদি রেস্তোরাঁয় একসঙ্গে বসে খেতে চায়, সেখানে মাহরাম ও গায়রে মাহরাম উভয় প্রকার সদস্য উপস্থিত থাকে, তাহলে ইসলামি শরিয়তে পুরুষ ও মহিলাদের মধ্যে পর্দার বিধান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই এমন একটি পরিবেশ যেখানে গায়রে মাহরাম নারী-পুরুষ মুখোমুখি বসে খাচ্ছে, সেখানে পর্দা লঙ্ঘিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। নিম্নে বিষয়টির বিস্তারিত ফিকহি ব্যাখ্যা দেওয়া হলো।


১. গায়রে মাহরাম কারা?

  • ভাইয়ের স্ত্রী (ভাবি/দেবরানী): এটি আপনার জন্য গায়রে মাহরামভাইয়ের স্ত্রীর সঙ্গে পর্দা করা ওয়াজিব।
  • সৎ-কন্যা (ভাবির পূর্ববর্তী বিবাহের মেয়ে): যদি সৎ-কন্যা আপনার মাহরাম না হয় (অর্থাৎ আপনি তার সাথে বিবাহ সূত্রে মাহরাম নন), তবে তিনিও গায়রে মাহরাম এবং তার সঙ্গে পর্দা ওয়াজিব।
  • মা এবং ভাইয়ের মেয়ে (ভাতিজি): এরা আপনার জন্য মাহরাম। মায়ের সঙ্গে পর্দা নেই, ভাতিজির সঙ্গেও পর্দা নেই (তবে ভাতিজির বিবাহযোগ্য বয়স হলে শরম ও লজ্জা রাখা ভালো)।

২. রেস্তোরাঁয় একসঙ্গে বসার বিধান

রেস্তোরাঁ একটি উন্মুক্ত স্থান যেখানে অপরিচিত লোকজনও উপস্থিত থাকে। সাধারণত পারিবারিক কেবিন বা আলাদা ঘর না থাকলে পুরুষ ও মহিলারা একই টেবিলে বসলে পর্দা ভঙ্গের আশঙ্কা থাকে। ইসলামি ফিকহের মূলনীতি হলো:

নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা হারাম।

এমনকি মাহরাম ও গায়রে মাহরাম উভয় উপস্থিত থাকলেও, যদি গায়রে মাহরাম ব্যক্তিরা (ভাইয়ের স্ত্রী, সৎ-কন্যা) আপনার সঙ্গে এক টেবিলে বসে খায়, তাহলে এটি পর্দা লঙ্ঘন হবে। কারণ আপনার সঙ্গের নারী (গায়রে মাহরাম) আপনার কাছ থেকে পর্দা করতে বাধ্য।

হাদিসে এসেছে:

"যে ব্যক্তি আল্লাহ ও শেষ দিনের প্রতি ঈমান রাখে, সে যেন কোনো মহিলার সাথে তার মাহরাম ছাড়া নির্জনে না মেলে।" (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫২৩৩; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২১৭২)

একটি সার্বজনীন স্থানে সবার সামনে বসা 'খলওয়াত' (নির্জনতা) পর্যায়ের না হলেও পর্দা ভঙ্গ ও ফিতনার আশঙ্কা থেকে বিরত থাকা জরুরি।

ফকিহগণ বলেছেন:

"যখন গায়রে মাহরাম নারী-পুরুষ একত্রিত হয়, তখন তাদের মধ্যে পর্দার বিধান কার্যকর হতে হবে। পর্দা ছাড়া দেখা-সাক্ষাৎ বা একসঙ্গে খাওয়া-দাওয়া জায়েয নয়।"
(রদ্দুল মুহতার, ১/৪০৬; ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ৫/৩২৮)


৩. যদি মাহরাম ও গায়রে মাহরাম সবাই একসঙ্গে থাকে তাহলে করণীয় কী?

  • বিকল্প ব্যবস্থা: বাসায় বা কোনো ব্যক্তিগত জায়গায় আলাদা করে খাবার আয়োজন করুন, যেখানে পুরুষ ও মহিলারা আলাদাভাবে বসবে।
  • রেস্তোরাঁয় গেলে: আলাদা কেবিন বা ঘর ভাড়া করুন যেখানে মাহরাম ও গায়রে মাহরাম সদস্যদের মধ্যে পর্দা বজায় রাখা সম্ভব। যেমন: একটি কেবিনে পুরুষরা, অপর কেবিনে মহিলারা বসবে। সেক্ষেত্রে গায়রে মাহরাম সদস্যের সঙ্গেও পর্দা রক্ষা হবে।
  • শর্ত:
    • মহিলারা সাজসজ্জা না করে, বোরকা বা হিজাবসহ থাকবে।
    • কথাবার্তায় অপ্রয়োজনীয় মেলামেশা না করা।
    • একই টেবিলে গায়রে মাহরাম পুরুষ ও মহিলা না বসা।

তবে সাধারণত পরিবারগত আয়োজনে রেস্তোরাঁতে গেলে সবাই একসঙ্গে বসে পড়ে—এটি এড়িয়ে চলাই উত্তম।


৪. ফিকহি দলিল ও রেফারেন্স

  • আল-হিদায়া (কিতাবুন নিকাহ):
    "গায়রে মাহরাম নারীর দিকে তাকানো বা তার সঙ্গে মেলামেশা করা হারাম।"
    (আল-হিদায়া, ২/২৮৯)

  • রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন):
    "পর্দার বিধান অমান্য করে একত্রে বসা ফিতনার কারণ। জায়েয নয়।"
    (রদ্দুল মুহতার, ১/৪০৬)

  • ফাতাওয়া উসমানি (মুফতি তাকি উসমানি):
    "কোনো মাহরাম পুরুষের সাথে গায়রে মাহরাম নারী একত্রে খেতে পারে না, যদি না পর্দার ব্যবস্থা থাকে।"
    (ফাতাওয়া উসমানি, ২/২৯৮)

  • ইমদাদুল ফাতাওয়া (আশরাফ আলী থানবী):
    "গায়রে মাহরাম নারীর সঙ্গে এক টেবিলে বসে খাওয়া নাজায়েয। পরিবারের আয়োজনেও ব্যতিক্রম নয়।"
    (ইমদাদুল ফাতাওয়া, ৪/১৯৩)


৫. সারসংক্ষেপ ও পরামর্শ

| উপাদান | বিধান | |------------|-----------| | ভাইয়ের স্ত্রী (ভাবি) | গায়রে মাহরাম → তার সাথে পর্দা ওয়াজিব, একসঙ্গে খাওয়া নাজায়েয | | সৎ-কন্যা (ভাবির পূর্বের মেয়ে) | গায়রে মাহরাম → পর্দা ফরজ | | মা ও ভাইয়ের মেয়ে | মাহরাম → পর্দা নেই, তবে শরম বজায় রাখা ভালো | | রেস্তোরাঁয় এক টেবিলে সবাই | যদি গায়রে মাহরাম পুরুষ ও নারী একত্রে থাকে, তবে নাজায়েয | | ব্যতিক্রম | পর্দার শর্তে (আলাদা কেবিন) অনুমতি | | সর্বোত্তম | বাসায় আলাদা বসার ব্যবস্থা |

সুন্নাহসম্মত উপায়:
পরিবারের মাহরাম ও গায়রে মাহরাম উভয় সদস্য থাকলে, আপনি (পুরুষ) মাহরাম নারী (মা, বোন, ভাতিজি) এবং আপনার ছোট সন্তানদের নিয়ে এক টেবিলে খেতে পারেন। অন্যদিকে ভাইয়ের স্ত্রী, সৎ-কন্যা (গায়রে মাহরাম) তাদের জন্য আলাদা ব্যবস্থা করুন। তারাও যদি আপনার মা-বোনের সাথে থাকে, তবে সেটা পর্দার অন্তরায় নয়, কারণ মহিলারা নিজেদের মধ্যে থাকবে।

আপনার জন্য নির্দেশনা:

  • গুনাহ থেকে বাঁচতে রেস্তোরাঁয় গায়রে মাহরাম নারীর সাথে একত্রে খাওয়া থেকে বিরত থাকুন।
  • পারিবারিক বন্ধন বজায় রাখতে চাইলে বাসায় আলাদা বসার ব্যবস্থা করুন।
  • জরুরি প্রয়োজনে রেস্তোরাঁয় গেলে পর্দার সম্পূর্ণ ব্যবস্থা (আলাদা কেবিন, হিজাব) থাকতে হবে।

মোটকথা:
আপনার বর্ণিত পরিবেশে (যেখানে ভাইয়ের স্ত্রী ও তার সৎ-মেয়ে রয়েছে) তাদের সাথে এক টেবিলে খাওয়া জায়েয নয়, কারণ এটি পর্দার বিধানের পরিপন্থী। তাই চেষ্টা করুন পর্দার পূর্ণ ব্যবস্থা রেখে আলাদা আয়োজন করতে, অথবা সবার জন্য আলাদা স্থান ঠিক করতে।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে দ্বীন বুঝার ও আমল করার তাওফিক দান করুন। (আমিন)

তথ্যসূত্র:

  1. কুরআন মাজিদ (সূরা নূর, ৩০-৩১; সূরা আহযাব, ৫৩)
  2. সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫২৩৩
  3. রদ্দুল মুহতার, ১/৪০৬
  4. ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ৫/৩২৮
  5. ফাতাওয়া উসমানি, ২/২৯৮
  6. ইমদাদুল ফাতাওয়া, ৪/১৯৩
  7. বাহিশতী জেওর (আশরাফ আলী থানবী), পর্দার অধ্যায়

This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.