যাদুর গিট পাওয়া চাদর কিভাবে নষ্ট করবো?
Family Life · Ahle Hadith / Salafi
Question
১ বছর আগে বিষয়টি পরিলক্ষিত হয় । ১ বছরে স্বামী স্ত্রীর মধ্যে দূরত্ব বাড়া অনুভব করি । কি কি করনীয়?
Answer
উত্তর:
বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম।
আপনার প্রশ্নে বুঝা যাচ্ছে যে, বিছানার চাদরে গিট পাওয়া গেছে, যা যাদুর আলামত হতে পারে। ইতিমধ্যে গিট খোলা হয়েছে, কিন্তু চাদরটি রয়ে গেছে। পাশাপাশি, ১ বছর ধরে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে দূরত্ব বেড়েছে। ফিকাহ ও ইসলামী চিকিৎসার (রুকইয়াহ) আলোকে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো গুরুত্বসহকারে পালন করা জরুরি:
১. যাদুর আলামত (গিট) নষ্ট করার পদ্ধতি
কোরআন ও হাদীসে যাদুর বাস্তবতা স্বীকৃত। আল্লাহ বলেন:
"তারা শিক্ষা করত এমন বস্তু যা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ সৃষ্টি করে..." (সূরা বাকারা: ১০২)
এবং সূরা ফালাকে উল্লেখ করা হয়েছে: “গ্রন্থীর মধ্যে ফুঁৎকার দেয়া নারীদের অনিষ্ট থেকে” (সূরা ফালাক: ৪)।
যাদুর আলামত পাওয়া গেলে সে বস্তুটি সম্পূর্ণ ধ্বংস করা ওয়াজিব – যাতে যাদুর প্রভাব শেষ হয়।
শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ (রহিমাহুল্লাহ) বলেন:
"যাদু ধ্বংস করার পদ্ধতি হলো – তার গিট খুলে ফেলা, তার উপর কুরআন পড়া, তারপর তা পুড়িয়ে ফেলা বা পানিতে ফেলে দেওয়া।" (মাজমু‘ ফাতাওয়া ১৯/৬৪)
শাইখ ইবন বায (রহিমাহুল্লাহ) বলেন:
"যাদুর উপকরণ পুড়িয়ে ফেললে বা সমুদ্রের পানিতে ফেলে দিলে তা ধ্বংস হয়ে যায়। এক্ষেত্রে দহনই উত্তম।" (ফাতাওয়া ইসলামিয়্যাহ ৪/৫৫১)
আপনার ক্ষেত্রে করণীয়:
যদি চাদর পোড়ানো কষ্টকর হয়, তাহলে নিম্নের পদ্ধতি অবলম্বন করুন:
- চাদরটিকে ছোট ছোট টুকরো করে কেটে ফেলুন (যাতে কোনো গিট বা জাদুর চিহ্ন না থাকে)।
- এরপর একটি প্রবাহমান নদী বা পুকুরের পানিতে ফেলে দিন অথবা টয়লেটের পাইপে ফ্লাশ করে দিন (যদি সম্ভব হয়)।
- অন্যথায় মাটিতে গভীর গর্ত করে পুঁতে ফেলুন যাতে আর কেউ তা ব্যবহার করতে না পারে।
গুরুত্বপূর্ণ: ধ্বংস করার আগে চাদরের উপর সূরা ফালাক, সূরা নাস, আয়াতুল কুরসি ও সূরা ইখলাস পড়ুন এবং প্রতিটি আয়াত শেষে ফুঁ দিন। তারপর ধ্বংস সম্পন্ন করুন।
২. যাদু দূর করার জন্য রুকইয়াহ ও চিকিৎসা
যাদুর প্রভাব দূর করতে নিম্নের আমলগুলো নিয়মিত করুন:
- প্রতিদিন ফজর ও মাগরিবের পর সূরা ফালাক, সূরা নাস, সূরা ইখলাস এবং আয়াতুল কুরসি ৩ বার করে পড়ে সারা গায়ে ফুঁ দিন।
- ঘরের কোণায় ও স্বামী-স্ত্রীর শরীরে এই সূরাগুলো পড়ে ফুঁ দিন।
- সূরা বাকারা পুরো বা শেষ ৩ আয়াত রাতে পড়ুন (হাদীস: “যে ঘরে সূরা বাকারা পড়া হয়, শয়তান ও যাদু সেই ঘরে প্রবেশ করে না” – সহীহ মুসলিম)।
- ৭ বার সূরা ফাতিহা, আয়াতুল কুরসি ও মুআওউইযাতাইন পড়ে এক বালতি পানি ফুঁ দিয়ে তা দিয়ে গোসল বা ওযু করুন।
- স্বামী-স্ত্রী উভয়ে সর্বদা যিকির ও রুকইয়ায় লেগে থাকুন।
হাদীস: নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর উপর ইহুদিরা যাদু করেছিল; তিনি জিবরীলের মাধ্যমে জানতে পারেন ও কূপ থেকে যাদুর বস্তুগুলো বের করে আনেন, তাদের গিট খুলে ফেলেন ও তারপর তা ধ্বংস করেন। (সহীহ বুখারী: ৩২৬৮)
৩. স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে দূরত্ব কমানোর উপায়
যাদুর কারণে সৃষ্ট দূরত্ব কাটাতে:
- ক্ষমা চেয়ে নিন – যদি কোনো ভুল-ত্রুটি থেকে থাকে, তাহলে তা মেনে নিয়ে একে অপরকে ক্ষমা করুন।
- একত্রে বেশি সময় কাটান – সালাত ও যিকির একসঙ্গে করুন।
- পারস্পরিক ভালোবাসা ও সম্মান বৃদ্ধি করুন – ছোট ছোট উপহার, মিষ্টি কথা ও ইবাদতে সহযোগিতা করুন।
- স্থানীয় কোনো নির্ভরযোগ্য আলেমের নিকট সরাসরি রুকইয়াহ করান, যদি সম্ভব হয়।
- সাধ্যমতো সাদকাহ (দান) করুন – বিশেষ করে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের উন্নতির নিয়তে।
শাইখ সালিহ আল-ফাওযান (হাফিযাহুল্লাহ) বলেন:
"যাদু থেকে বাঁচার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো – আল্লাহর রুকইয়াহ ও হিফাযতের আমল। আর স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সম্পর্কের উন্নতি চাইলে উভয়ে তওবা ও ইস্তিগফার করবে এবং দুনিয়ার ঝামেলা ভুলে আল্লাহর দিকে ফিরবে।" (মাজাল্লাতু আদ-দাওয়াহ)
৪. ভবিষ্যৎ সুরক্ষা
যাদু থেকে বাঁচতে নিয়মিত নিম্নের আমলগুলো করুন:
- সকাল-সন্ধ্যার যিকির – বিশেষ করে আয়াতুল কুরসি ও মুআওউইযাতাইন।
- প্রতিদিন শেষ রাতে সূরা ফালাক, সূরা নাস, সূরা ইখলাস (প্রত্যেকটি ৩ বার) পড়ে নিজের ও পরিবারের উপর ফুঁ দেওয়া।
- ঘরের দরজা-জানালা বন্ধ করে সূরা বাকারা পড়া অথবা ফোন বা ইউটিউব দিয়ে পড়া চালিয়ে রাখা।
- মহিলাদের ক্ষেত্রে যাদু কারবারীদের কাছ থেকে দূরে থাকা; কোনো তাবিজ-কবচ না ব্যবহার করা।
উপসংহার
আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা রাখুন। চাদরের চিহ্ন ধ্বংস করুন, রুকইয়াহ করুন এবং যিকির-ইবাদতে লেগে থাকুন। নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন:
"যে ব্যক্তি সকালে ও সন্ধ্যায় ‘বিসমিল্লা হিল্লাজী লা ইয়া দুর্রু মা‘আস মিহী শাইউন ফিল আরদি ওয়ালা ফিস সামা’ইয়ি ওয়া হুয়াস সামী‘ঊল ‘আলীম’ পড়বে, তাকে কোনো কিছু ক্ষতি করতে পারবে না।" (আবু দাউদ, তিরমিযী – সহীহ)
আল্লাহ আপনার সম্পর্ক সুন্দর করুন এবং যাদুর অনিষ্ট থেকে হেফাজত করুন।
আল্লাহই তাওফীক দাতা।