ক্যানোলা লাগানো অবস্থায় ওযু, নামাজ এবং চিকিৎসার উদ্দেশ্য মুসাফিরের বিধান সম্পর্কিত
Salah-Prayer · Hanafi
Question
১. ওযু অবস্থায় ক্যানোলা দিয়ে রক্ত বের হয়ে ক্যাানোলার মধ্য প্রবাহিত হলে কী ওযু ভেঙ্গে গিয়েছে ?
2.ডান হাতে ক্যানোলা লাগানো থাকায় এবং তা রুকু, সিজদাহ করার সময় ব্যথা ও রক্ত বের হওয়ার আশংকায় শুধু বাম হাত বুকে বাধা এবং ডান হাত স্থির রেখে নামাজ আদায় করা হলে সেই নামাজ পুনরায় আদায় করতে হবে কী?( আদায়কৃত নামাজের ওয়াক্ত ৩)
৩. ৭৭ কিলোমিটার দূরে অপারেশন এর উদ্দেশ্যে ১ দিন ও ১ রাত অবস্থানের নিয়তে গেলে কী মুসাফিরের ন্যায় নামাজ পড়তে হবে?
জাজাকাল্লাহু খইর।
Answer
উত্তর প্রদানে সহায়ক হানাফী গ্রন্থাবলি: ফাতাওয়া উসমানী, ইমদাদুল ফাতাওয়া, রদ্দুল মুহতার, বেহেশতী জেওর, ফাতাওয়া আলমগীরী, আল-হিদায়া প্রভৃতি।
প্রশ্ন ১: ওযু অবস্থায় ক্যানোলা দিয়ে রক্ত বের হয়ে প্রবাহিত হলে ওযু ভঙ্গ হবে কি?
উত্তর: হ্যাঁ, ওযু অবস্থায় ক্যানোলা (IV ক্যানুলা) দিয়ে যদি রক্ত বের হয়ে ক্যানোলার নালীর ভিতর দিয়ে প্রবাহিত হয়, তাহলে ওযু ভঙ্গ হয়ে যাবে। কারণ, হানাফী মতে ওযু ভঙ্গের অন্যতম কারণ হলো শরীরের কোনো স্থান থেকে নাপাক বস্তু (যেমন রক্ত, পুঁজ) বের হয়ে সেখান থেকে সরে পড়া বা প্রবাহিত হওয়া। ক্যানোলার মাধ্যমে রক্ত বের হওয়া এবং তা নালীর ভিতর দিয়ে প্রবাহিত হওয়া এই শর্ত পূরণ করে।
দলিল:
- রদ্দুল মুহতার (১/২৫৪): "রক্ত বা পুঁজ যদি জখম হতে বের হয়ে জখমের স্থান অতিক্রম করে (অর্থাৎ প্রবাহিত হয়) তাহলে ওযু ভঙ্গ হবে।"
- ফাতাওয়া উসমানী (১/১২৩): "শরীরের কোনো ক্ষতস্থান হতে রক্ত বা পুঁজ বের হয়ে যদি কিছু দূর প্রবাহিত হয়, তাহলে ওযু ভঙ্গ হয়। ক্যানোলা একটি কৃত্রিম পথ তৈরি করে, ফলে রক্ত প্রবাহিত হওয়া ওযু ভঙ্গকারী।"
তবে শুধু ক্যানোলার মুখে ফোঁটা দেখা গেলেও তা যদি প্রবাহিত না হয় (যেমন জমাট বাঁধা), তাহলে ওযু ভঙ্গ হবে না। সাধারণত ক্যানোলা দিয়ে রক্ত বের হলে তা প্রবাহিত অবস্থায় থাকে।
প্রশ্ন ২: ডান হাতে ক্যানোলা থাকায় ব্যথা ও রক্ত বের হওয়ার ভয়ে বাম হাত বুকে বেঁধে এবং ডান হাত স্থির রেখে নামাজ পড়লে কি নামাজ শুদ্ধ হবে? পুনরায় আদায় করতে হবে কি?
উত্তর: নামাজ শুদ্ধ হয়েছে, পুনরায় আদায় করতে হবে না। কারণ এটি একটি ওজর (অক্ষমতা) যার কারণে সুন্নত তরীকা (ডান হাত বাম হাতের উপর রেখে বুকের নিচে বাঁধা) পালন করা সম্ভব হয়নি। শরীয়তে অসুস্থ বা অপারেশন পরবর্তী অবস্থায় নামাজের সুন্নত/মুস্তাহাব কাজ সমূহ ছাড় দেওয়া হয়েছে।
ব্যাখ্যা:
- নামাজের মধ্যে হাত বাঁধা সুন্নত (কিছু মতে ওয়াজিব নয়)। ওজরের কারণে তা ছেড়ে দিলে নামাজের কোনো ক্ষতি হয় না।
- আপনি বাম হাত বুকে বেঁধেছেন এবং ডান হাত স্থির রেখেছেন; এটি আপনার অবস্থার জন্য সর্বোত্তম সমাধান। অতএব আপনার নামাজ সহীহ হয়েছে।
- যদি নামাজের ভেতর রক্ত না বের হয় (শুধু ভয় ছিল) তাহলে ওযু ভঙ্গ হয়নি, তাই নামাজও সহীহ।
দলিল:
- বেহেশতী জেওর (নামাজ অধ্যায়): "বিমার অবস্থায় নামাজ যেভাবে সম্ভব সেভাবে পড়া জায়েয। হাত বাঁধতে না পারলে না বাঁধলেও চলবে।"
- ফাতাওয়া উসমানী (২/২৩৫): "ওজরের কারণে সুন্নত কাজ ত্যাগ করলে নামাজ ফাসিদ হয় না।"
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (১/২৯০)-এ উল্লেখ আছে, "যদি কোনো ব্যক্তি রোগ বা ব্যথার কারণে রুকু-সিজদা ঠিকমত করতে না পারে, তবে সে ইশারা করেও নামাজ আদায় করতে পারে। আর হাত বাঁধার ব্যাপারেও একই নীতি প্রযোজ্য।"
সুতরাং, আপনার নামাজ পুনরায় পড়ার প্রয়োজন নেই। তবে সামর্থ্য থাকলে সুন্নত তরীকা অনুসরণ করা উত্তম।
প্রশ্ন ৩: ৭৭ কিলোমিটার দূরে অপারেশনের উদ্দেশ্যে ১ দিন ১ রাত অবস্থানের নিয়তে গেলে কী মুসাফিরের ন্যায় নামাজ পড়তে হবে?
উত্তর: হ্যাঁ, আপনি মুসাফির হিসেবে নামাজ কসর (সংক্ষিপ্ত) পড়বেন। কারণ:
- সফরের দূরত্ব: হানাফী মতে সফর শরয়ী দূরত্ব হলো ৪৮ মাইল বা প্রায় ৭৭ কিলোমিটার। আপনার গন্তব্য ৭৭ কিমি, যা সফরের দূরত্ব পূর্ণ করে।
- অবস্থানের নিয়ত: আপনি ১ দিন ১ রাত (২৪ ঘণ্টা) অবস্থানের নিয়ত করছেন। হানাফী মতে, ১৫ দিনের কম অবস্থানের নিয়তে সফর করলে মুসাফিরের হুকুম বহাল থাকে। ১৫ দিন বা তার বেশি অবস্থানের নিয়ত করলে মুকীম গণ্য হন। যেহেতু আপনার অবস্থান ১৫ দিনের কম, তাই আপনি মুসাফির।
- মুসাফিরের নামাজ: ফরজ নামাজে যোহর, আসর ও ইশা আদায় করবেন ২ রাকাত করে। ফজর ও মাগরিব পূর্ণ পড়বেন। সুন্নত ও নফল নামাজ যথারীতি পড়বেন। তবে জুমার দিন জুমা পড়লে তা পূর্ণ হবে, কিন্তু জুমার জন্য সফর করা নাজায়েয।
দলিল:
- ফাতাওয়া আলমগীরী (১/১৩৮): "সফর সেই দূরত্বকে বলা হয় যার দূরত্ব ৪৮ মাইল বা তিন দিন তিন রাতের পথ। এবং যে ব্যক্তি ১৫ দিনের কম অবস্থানের নিয়তে সফর করে সে মুসাফির।"
- আল-হিদায়া (১/৩৪৫): "যে ব্যক্তি ১৫ দিনের কম অবস্থানের ইচ্ছা করে, সে মুসাফির। তার জন্য কসর করা জরুরি।"
নোট: আপনি যদি অপারেশন শেষে ১৫ দিনের বেশি থাকতে চান, তাহলে নিয়ত পরিবর্তন করে মুকীম হয়ে যাবেন এবং পূর্ণ নামাজ পড়বেন।
সংক্ষিপ্ত জবাব (সারাংশ)
| প্রশ্ন | উত্তর | |--------|--------| | ১. ক্যানোলার মাধ্যমে রক্ত বের হয়ে প্রবাহিত হলে ওযু ভঙ্গ | হ্যাঁ, ওযু ভঙ্গ হবে। | | ২. ডান হাত স্থির, বাম হাত বুকে রেখে নামাজ আদায় | নামাজ সহীহ, পুনরায় পড়তে হবে না। | | ৩. ৭৭ কিমি দূরে ১ দিন/রাত অবস্থানে মুসাফিরের হুকুম | হ্যাঁ, মুসাফির হবেন এবং কসর পড়বেন। |
জাজাকাল্লাহু খাইরান। আল্লাহ তাআলা আপনার অপারেশন ও চিকিৎসায় শিফা দান করুন। আমীন।