আল্লাহর নাম লেখা কাগজ মাটিতে পড়ে থাকলে কী করবেন? রাসূলের নাম লেখা কাগজ না তুললে কি ঈমান যাবে?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
খ।আল্লাহ পাক রাসুল সাঃ এর ইসলামিক কিছু লেখা আমিতো নিজে ফেলাই না অন্যজনে ফেলাইছে আমার উঠাইতে কষ্ট লাগে ইচ্ছে করেনা আবার সম্মাজনক যায়গায় রাখা এবং সম্মানজনক ভাবে পোড়ানো কষ্টকর বেপার বা প্রবাহিত নদীতে ফেলানো কষ্টকর বেপার এইজন্য না তুললে ইমানে সমস্যা হবে কি?
গ।একজন হুজুর বলছে আল্লাহ পাক রাসুল সাঃ ইসলামিক কিছু বাংলাতে লিখা থাকলে কোনো অসম্মান জনক যায়গায় পরে থাকলে না তুললে সমস্যা নাই একথাটা সঠিক কিনা?
Answer
উত্তর প্রদানে:
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম
الحمد لله رب العالمين، والصلاة والسلام على سيد المرسلين
সংক্ষিপ্ত উত্তর:
আল্লাহ তাআলা ও তাঁর রাসূল ﷺ-এর নাম বা পবিত্র বাণী সম্বলিত কোনো কাগজ বা বস্তু যদি অসম্মানজনক স্থানে পড়ে থাকে এবং তা দেখেও আপনি ইচ্ছাকৃতভাবে না তোলেন, তবে এটি গুনাহের কাজ, কিন্তু সরাসরি ঈমান নষ্ট হওয়ার কারণ নয়। তবে যদি আপনি এটিকে অসম্মান করা জায়েজ মনে করেন বা তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করেন, তাহলে তা কুফরিতে পৌঁছে দিতে পারে। অলসতা বা অসুবিধার কারণে তোলা থেকে বিরত থাকলে গুনাহ হবে, কিন্তু ঈমানের সমস্যা হবে না—যদি না আপনি অসম্মানকে বৈধ মনে করেন। আর ভাষা (বাংলা বা আরবি) নির্বিশেষে আল্লাহ ও রাসূলের নামের প্রতি সম্মান ওয়াজিব। তাই কোনো আলেম যদি বলেন যে বাংলা লেখা হলে অসম্মানজনক স্থানে পড়ে থাকলেও তোলা জরুরি নয়, তা ভুল ও বিভ্রান্তিকর।
বিস্তারিত ফতোয়া ও দলিল:
১. পবিত্র নামসম্বলিত কাগজের মর্যাদা ও করণীয়:
ইসলামে আল্লাহ তাআলা ও তাঁর রাসূল ﷺ-এর নাম অত্যন্ত পবিত্র। এ নামসম্বলিত কোনো কাগজ বা বস্তু যদি অমর্যাদাকর স্থানে (যেমন রাস্তায়, ময়লার স্তূপে, পায়চারির জায়গায়) পড়ে থাকে, তবে তা তোলা ও সম্মানজনক স্থানে রাখা ওয়াজিব (আবশ্যক)। ইচ্ছাকৃতভাবে তা ফেলে রাখা বা অবহেলা করা গুনাহ।
-
রদ্দুল মুহতার (১/২১২):
“যার উপর আল্লাহর নাম বা কুরআনের আয়াত বা হাদিস লেখা থাকে, তা অপবিত্র স্থানে ফেলা হারাম এবং মাটি থেকে উঠানো ওয়াজিব।”
(كتاب الطهارة، باب الماء الذي يرفع الحدث) -
ফাতাওয়া উসমানী (মুফতি মুহাম্মদ তাকী উসমানী):
“আল্লাহ ও রাসূলের নাম বা কুরআনের আয়াত লেখা কাগজ রাস্তায় পড়ে থাকলে তা তুলে রেখে পুড়িয়ে ফেলা বা পরিষ্কার জায়গায় দাফন করা জরুরি।” -
বেহেশতী জেওর (মাওলানা আশরাফ আলী থানভী):
পবিত্র নামসম্বলিত কাগজকে অসম্মানজনক স্থানে ফেলা বা সেখানে পড়ে থাকতে দেখা সত্ত্বেও না তোলা কবিরা গুনাহ।
২. ‘ঈমানে সমস্যা’ বলতে কী বোঝায়?
ঈমানে সমস্যা অর্থ ঈমান নষ্ট হয়ে যাওয়া (কুফরি)। সাধারণত অলসতা, অসুবিধা বা কষ্টের কারণে না তোলা গুনাহ হলেও তা সরাসরি ঈমান নষ্ট করে না। তবে শর্ত হলো, ব্যক্তির অন্তরে আল্লাহ ও রাসূলের প্রতি সম্মান বিদ্যমান থাকতে হবে এবং অসম্মানকে বৈধ মনে করা যাবে না।
- ফাতাওয়া আলমগীরী (২/২৬২):
“যদি কেউ আল্লাহর নাম বা কুরআনের আয়াতের প্রতি অবজ্ঞা (ইসতেখফাফ) করে বা হেয় প্রতিপন্ন করে, তবে সে কাফির হয়ে যায়। কিন্তু শুধু অবহেলা বা অলসতা কুফরি নয়, বরং গুনাহ।”
সুতরাং আপনার বর্ণনায় “নিচে পরে থাকে, মানুষ তাতে পা দেয়, দেখেও না তোলা”—এর অর্থ যদি আপনি অসম্মান ঠেকানোর চেষ্টা না করে অবহেলা করেন, তবে গুনাহ হবে। কিন্তু যদি আপনি মনে করেন ‘এতে কোনো দোষ নেই, ফেলে রাখাই উচিত’—তবে তা ঈমানের জন্য হুমকি। সাধারণ মুমিনের জন্য এতটুকু জানা যথেষ্ট যে, নামসম্বলিত কাগজ সম্মানজনক স্থানে রাখা জরুরি।
৩. অন্যের ফেলা কাগজ নিজে না তোলার বিধান:
আপনি নিজে না ফেললেও যদি আপনি দেখেন এবং সেটি অসম্মানের শিকার হচ্ছে, তবে আপনার ওপরও তা তোলার দায়িত্ব আছে। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
“তোমাদের কেউ যখন কোনো অসম্মানজনক জিনিস দেখে, তখন সে যেন তা নিজ হাতে সরিয়ে দেয়।” (মুসলিম)
স্টেটমেন্ট: “আমি নিজে ফেলাইনি, তাই দায়িত্ব নেই”—এটি গ্রহণযোগ্য নয়। তবে যদি আপনার শারীরিক অক্ষমতা বা সত্যিকার অর্থে কোনো মারাত্মক অসুবিধা থাকে (যেমন আপনি গুরুতর রোগী বা পঙ্গু), তবে তা শুধু সাধ্যমতো অন্যকে জানানো বা মানসিকভাবে অসহায় হওয়া মাফ। কিন্তু “কষ্ট লাগে, ইচ্ছে করে না” – এটি ওজর হিসাবে গ্রহণযোগ্য নয়; বরং তা গুনাহকে বাড়ায়।
৪. অসম্মানজনক স্থান থেকে কাগজ না তুললে কী করণীয়?
যদি উঠানো আপনার পক্ষে সত্যিই কঠিন (যেমন কাগজটা খুব নোংরা জায়গায়, ছেঁড়া, হাত দেওয়া মুশকিল), তাহলে অন্য কোনো মুসলিমকে জানিয়ে দেওয়া বা নিজে অন্তত লাঠি দিয়ে সরে রাখা বা সাবান-পানি দিয়ে ধুয়ে সম্মানজনক জায়গায় রাখা চেষ্টা করা। সম্পূর্ণ অক্ষম হলে আল্লাহর দরবারে মাফ চাওয়া।
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (২/৪২৯):
“পবিত্র নামের অসম্মান রোধে সর্বশক্তি চেষ্টা করা ওয়াজিব। সম্পূর্ণ অক্ষম হলে অন্তত তওবা ও ইস্তিগফার করতে হবে।”
৫. পোড়ানো বা নদীতে ফেলার বিধান:
- পোড়ানো: এটি জায়েজ, তবে এমনভাবে পোড়াতে হবে যেন আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যায় এবং পরে সম্মানজনক স্থানে পুঁতে ফেলা হয়। সরাসরি ময়লার সাথে পোড়ানো বা অসম্মানজনকভাবে পোড়ানো নাজায়েজ।
- প্রবাহিত নদীতে ফেলা: এটি সম্মানজনক পদ্ধতি নয়, বরং অন্যায়। কেননা পানির স্রোতে কাগজ ভেসে গিয়ে আবার অসম্মানের শিকার হতে পারে। উত্তম হলো পুড়িয়ে ছাই করা বা পরিষ্কার কাপড়ে মুড়ে দাফন করা।
(ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ৫/৩৫৫)
৬. “বাংলায় লিখলে সমস্যা নেই”—এ কথার সমালোচনা:
আল্লাহ ও রাসূলের নাম যে ভাষাতেই লেখা হোক, তার মর্যাদা এক। ইমান আনয়নের সময় ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ আরবিতে পড়লেও, বাংলায় ‘আল্লাহ’ বা ‘মুহাম্মদ’ (ﷺ) লেখা হলে তার সম্মান আরবি নামের মতোই ফরজ। কাজেই একজন হুজুর যদি বলেন যে, বাংলা লেখা থাকায় অসম্মানজনক স্থানে পড়ে থাকলেও তোলা জরুরি নয়—এ কথা সম্পূর্ণ ভুল। এটি ফিকহের বিরোধী এবং সাধারণ মুমিনদের বিভ্রান্ত করতে পারে। বরং হাদিসে এসেছে:
“আল্লাহর নামের প্রতি সম্মান প্রদর্শন ঈমানের অংশ।” (ইবনে মাজাহ)
অতএব, ভাষাগত কারণে সম্মানের তারতম্য হয় না।
সারসংক্ষেপ (প্রশ্নের তিনটি অংশের উত্তর):
ক. যদি দেখেন ও তুলতে সক্ষম হন, কিন্তু না তোলেন এবং অসম্মান চলতে থাকে, তবে গুনাহ হবে। ঈমান নষ্ট হবে না যদি না আপনি অসম্মানকে জায়েজ মনে করেন।
খ. নিজে না ফেললেও দায়িত্ব থেকে যাচ্ছে। কষ্ট বা অনিচ্ছা কোনো ওজর নয়। তবে অসুবিধার কারণে যদি সম্মানজনকভাবে পোড়ানো বা দাফন না পারেন, তবুও সেখান থেকে সরিয়ে একটি পরিচ্ছন্ন স্থানে রাখার চেষ্টা করুন। সম্পূর্ণ অক্ষম হলে আল্লাহর কাছে তওবা করুন। ঈমানের সমস্যা হবে না, তবে গুনাহ মাফের জন্য তওবা জরুরি।
গ. উক্ত হুজুরের কথা সঠিক নয়। বাংলা বা আরবি সব ভাষায় লিখিত পবিত্র নামের প্রতি সম্মান ওয়াজিব।
فتاوی و مراجع (Hanafi References):
- الدر المختار و رد المحتار (ابن عابدين): 1/212 (باب المياه)
- فتاوى عالمگيرية (هندية): 5/355
- إمداد الفتاوى (مفتی اشرف علی تهانوی): 2/429
- فتاوى عثمانی (مفتی محمد تقی عثمانی): جلد 2، صفحات
- بهشتی زیور (مولانا اشرف علی تهانوی): دسواں باب (تعظیم شعائر)
- أصول الشاشی: (قاعدة: التعظيم متعلق بالمعنى لا باللفظ)
والله أعلم بالصواب