নারীবাদী নারী স্বাধীনতা সহ বিবিধ প্রশ্ন।
Family Life · Hanafi
Question
Answer
উত্তর:
প্রশ্নকারী বোনের মানসিকতা ও দ্বীনদারি স্পষ্ট যে তিনি দ্বীনের পথে চলার চেষ্টা করছেন, পর্দা করছেন, নামাজ পড়ছেন এবং আল্লাহকে ভয় করছেন। অথচ সমাজে নারীদের প্রতি কিছু অন্যায় দেখে তিনি সেটা পছন্দ করছেন না এবং নারীদের ইসলামপ্রদত্ত হক সম্পর্কে কথা বলছেন – এটি তাকে ‘নারীবাদী’ বা ‘নারীবাদী মানসিকতার’ পরিচয় দানে কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। বরং ইসলাম নারীদের অধিকার ও মর্যাদা দেওয়ার জন্যই এসেছে। তাই আপনার স্বামী আপনাকে নারীবাদী বলাটা সম্পূর্ণ ভুল ও অজ্ঞতাপ্রসূত।
ইসলামে নারীর অধিকার ও আপনার অবস্থান
ইসলাম নারীদেরকে অনেক অধিকার দিয়েছে, যা পশ্চিমা নারীবাদীদের চেয়ে অনেক বেশি ও সুসংহত। নারীর প্রতি ইনসাফ ও ন্যায়বিচার ইসলামের অপরিহার্য শিক্ষা। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
“তোমাদের মধ্যে সে-ই সর্বোত্তম যে তার স্ত্রীর নিকট সর্বোত্তম।”
(তিরমিযী, হাদীস: ৩৮৯৫)
আরেক হাদীসে এসেছে:
“নারীদের সাথে সদ্ব্যবহার করো।”
(বুখারী, হাদীস: ৩৩৩১)
আল্লাহ তাআলা বলেন:
“তোমরা তাদের সাথে সৎভাবে বসবাস করো।”
(সূরা নিসা: ১৯)
আপনার উল্লেখিত বিষয়গুলো (যৌথ পরিবারে স্ত্রীর খাওয়ার অধিকার, পুত্র-কন্যার প্রতি সমান আচরণ) ইসলামের দৃষ্টিতে অন্যায়। ইসলামে পুত্র ও কন্যার মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
“যে ব্যক্তি দুটি মেয়ে সন্তান লালন-পালন করে, কিয়ামতের দিন আমি ও সে এভাবে থাকবো” – তিনি তাঁর দুই আঙ্গুল একত্র করে দেখালেন।
(মুসলিম, হাদীস: ২৬৩১)
অর্থাৎ কন্যা সন্তান লালন-পালনের জন্য জান্নাতের সুসংবাদ। পুত্র সন্তানের চেয়ে মেয়ে সন্তানের প্রতি কোনো বৈষম্য ইসলামে নেই।
স্ত্রীর হক ও যৌথ পরিবার
হানাফী ফিকহ অনুযায়ী স্ত্রীর জন্য খাবার, পোশাক, বাসস্থান ইত্যাদি স্বামীর ওপর ফরজ (ওয়াজিব)। একে “নাফাকা” বলে। ইবনু আবিদীন (রাহ) রদ্দুল মুহতারে বলেন:
“স্ত্রীর নাফাকা (ভরণপোষণ) স্বামীর ওপর ফরজ।”
(রদ্দুল মুহতার, ৩/৫৭০)
যৌথ পরিবারে বাস করলেও স্ত্রীর নিজস্ব খাবার ও অন্যান্য প্রয়োজনের ব্যাপারে অবহেলা করা উচিত নয়। স্বামীর জন্য উচিত স্ত্রীকে পৃথকভাবে খাবার দেওয়া বা তার প্রয়োজন পূরণ করা। যদি কেউ বলে যে স্ত্রীর জন্য কিছু আনলে বাড়ির সবার জন্য আনতে হবে, তাহলে তা যৌক্তিক নয়, কারণ স্ত্রীর ওপর স্বামীর দায়িত্ব সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র। হাদীসে এসেছে:
“স্ত্রীর খাবার, পোশাক ও বাসস্থানের ব্যবস্থা করা স্বামীর কর্তব্য।”
(আবু দাউদ, হাদীস: ২১৪২)
সুতরাং এই বিষয়ে আপনার অবস্থান সম্পূর্ণ ইসলামসম্মত ও ওয়াজিব।
নারীবাদ বনাম ইসলাম
পশ্চিমা নারীবাদ (Feminism) মূলত ধর্ম ও পারিবারিক মূল্যবোধ থেকে বিচ্ছিন্ন। তবে আপনি ইসলামের যে নারী অধিকারের কথা বলছেন, তা পশ্চিমা নারীবাদ নয়, বরং ইসলাম দেওয়া নারীর হকের প্রতি সত্যায়ন। তাই আপনার স্বামীর ধারণা ভুল যে আপনি নারী স্বাধীনতা চান। আপনি তাকে বুঝিয়ে বলতে পারেন যে ইসলাম নারীদের যেসব অধিকার দিয়েছে (ইলম অর্জন, সম্পদের মালিকানা, ইচ্ছাধীন বিবাহ, তালাকের অধিকার ইত্যাদি), সেগুলোর প্রতি আপনি আস্থাশীল এবং সেগুলোর বাস্তবায়ন চান। আর এগুলো কোনো নারীবাদ নয়, বরং কুরআন-সুন্নাহর নির্দেশ।
করণীয়
১. স্বামীর সাথে আলোচনা করুন – ধৈর্য ও সহানুভূতির সাথে বিষয়টি বোঝান। আপনার উদ্দেশ্য ইসলামের পথে নারীর হক প্রতিষ্ঠা করা, কোনো নব্য মতবাদ বা ফ্যাসাদ নয়।
২. মধ্যস্থতা গ্রহণ – পরিবারের কোনো দ্বীনদার ও বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তি বা এলাকার কোনো আলেমের মাধ্যমে বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা করুন। স্বামী যাতে বুঝতে পারেন যে আপনার কথাগুলো কুরআন-সুন্নাহর আলোকে সঠিক।
৩. আল্লাহর কাছে দোয়া করুন – হিদায়াতের জন্য আল্লাহর কাছে বেশি বেশি দোয়া করুন। হাদীসে এসেছে:
“নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা বান্দার দোয়া কবুল করেন।”
(তিরমিযী, হাদীস: ৩৫৫৯)
৪. নিজের দ্বীনের ওপর অবিচল থাকুন – আপনার আমল ও দ্বীনের পথে চলা বজায় রাখুন। এটি স্বামীর সামনে প্রমাণ হবে যে আপনি দ্বীনের পথেই আছেন।
৫. সূক্ষ্ম কৌশল অবলম্বন – যদি দেখেন সরাসরি সমালোচনায় স্বামী উত্তেজিত হন, তবে একান্তে ধীরে-সুস্থে পবিত্র কুরআন-হাদীসের দলিল দিয়ে বিষয়টি উপস্থাপন করুন।
উপসংহার
আপনার স্বামী আপনাকে ‘নারীবাদী’ বলাটা সম্পূর্ণ অমূলক ও ভুল। বরং নারীদের ইসলামপ্রদত্ত হকের পক্ষে কথা বলা প্রতিটি মুসলিম নারীর কর্তব্য। পুত্র-কন্যার বৈষম্য বা যৌথ পরিবারে স্ত্রীর হক নষ্ট করা ইসলামে নিষিদ্ধ। সুতরাং আপনি ভুল কিছু বলছেন না, বরং ইসলামের নির্দেশনার সঙ্গেই আছেন। আপনি স্বামীকে নরম ভাষায়, কুরআন-হাদীসের দলিল ও ইসলামী আলেমদের উদ্ধৃতি দিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করবেন।
আল্লাহ আপনাকে এই পথে অবিচল রাখুন এবং আপনার স্বামীকে বুঝার তাওফীক দিন।
আল্লাহই সর্বজ্ঞ ও সর্বশক্তিমান।
প্রাসঙ্গিক হানাফী কিতাব:
- রদ্দুল মুহতার (ইবনু আবিদীন) – খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ৫৭০
- ফাতাওয়া হিন্দিয়া (আলমগীরী) – খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৫৪২
- বাহিশতী জেওর (আশরাফ আলী থানবী) – বিবাহ ও স্ত্রীর অধিকার অধ্যায়
- শরহু মাআনিল আছার (ইমাম তাহাবী) – নারীর অধিকার সম্পর্কিত বর্ণনা