তুমাকে ছেড়ে চলে যাচ্ছি বললে কি তালাক হয়?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
এটা তালাকের উদ্দেশ্য ছাড়া মানে তালাক দিয়ে বিদেশে যাচ্ছে না বুঝালে কি তালাক হয়?
২.স্বামী যদি বলে ওই কাজ করলে আমি তুমাকে ছেড়ে দূরে চলে যাব।এটা তালাকের উদ্দেশ্য ছাড়া বললে কি তালাক হয়?
৩। কোন স্বামী যদি বলে তালাকের নিয়তে কোনদিন কিছু বলে নি,তহ স্ত্রীর ও যদি মনে হয় এমন কিছু বলেছে কিনা আর বললেও হয়ত তালাকের উদ্দেশ্য বা ওইভাবে বুঝায় নি।তাহলে কি আর জিজ্ঞেস না করে সংসার করতে পারে?যদি ওল্টা পাল্টা বলার মত সম্ভাবনা থাকে?
Answer
প্রশ্নের উত্তর
প্রশ্ন তিনটির উত্তর হানাফী ফিকহের আলোকে নিচে প্রদান করা হলো। প্রতিটি উত্তরের সাথে প্রাসঙ্গিক কিতাবের রেফারেন্স দেওয়া হয়েছে।
১. "আমি চলে যাচ্ছি বিদেশ, তোমাকে ছেড়ে" — তালাকের উদ্দেশ্য না থাকলে কি তালাক হবে?
উত্তর: না, তালাক হবে না।
কারণ, উপরিউক্ত বাক্যটি স্পষ্ট তালাকের শব্দ নয় (সরীহ্ নয়), বরং এটি কিনায়া (অস্পষ্ট/ইঙ্গিতবোধক) শব্দ। কিনায়া শব্দের মাধ্যমে তালাক কার্যকর হওয়ার জন্য স্বামীর স্পষ্ট তালাকের নিয়ত জরুরি। যদি স্বামী তালাকের নিয়ত না করে শুধু রাগের বশবর্তী হয়ে বা শারীরিকভাবে পৃথক হয়ে যাওয়ার অর্থে বলে, তাহলে তালাক পতিত হয় না।
হানাফী কিতাবের বক্তব্য:
- রদ্দুল মুহতার (৩/২৫৬): "কিনায়া শব্দে তালাক কার্যকর হতে হলে নিয়ত বা দলিল (প্রকৃত অবস্থা) প্রয়োজন। যদি না থাকে, তাহলে তালাক হয় না।"
- ফাতাওয়া হিন্দিয়া (১/৩৭২): "যদি স্বামী স্ত্রীকে বলে 'তুমি আমার থেকে আলাদা' বা 'আমি তোমাকে ছেড়ে চললাম' এবং তালাকের নিয়ত না করে, তাহলে তালাক পতিত হবে না।"
সারমর্ম: যেহেতু প্রশ্নে উল্লেখ আছে "তালাকের উদ্দেশ্য ছাড়া, মানে তালাক দিয়ে বিদেশে যাচ্ছে না বুঝালে", সেহেতু তালাক হয় না।
২. "ওই কাজ করলে আমি তোমাকে ছেড়ে দূরে চলে যাব" — তালাকের উদ্দেশ্য ছাড়া বললে কি তালাক হয়?
উত্তর: না, তালাক হয় না।
এটিও কিনায়া বাক্য। শর্তসাপেক্ষে বলা হলেও এখানে তালাকের সরাসরি উল্লেখ নেই। হানাফী ফিকহে শর্তের সাথে কিনায়া শব্দ ব্যবহার করলেও তালাকের নিয়ত না থাকলে তালাক কার্যকর হয় না। তবে যদি স্বামী স্পষ্ট তালাকের শব্দ (যেমন: "তালাক", "ছাড়া") ব্যবহার করত, তাহলে শর্ত পূর্ণ হলেই তালাক পতিত হতো, কিন্তু এখানে তা নেই।
রেফারেন্স:
- শরহু মাআনিল আছার (ইমাম তাহাবী, ৩/১২৮): "কিনায়া শব্দে তালাক কার্যকর হতে নিয়ত আবশ্যক।"
- ফাতাওয়া উসমানী (২/৪৪৬): "যদি স্বামী বলে 'তুমি অমুক কাজ করলে আমি তোমাকে ছেড়ে দেব' আর সে তালাকের নিয়ত না করে, তাহলে কাজ করলেও তালাক হবে না।"
সতর্কতা: যদি স্বামী এরূপ কথা বারবার বলে এবং স্ত্রীর মনে সন্দেহ জাগে, তবে একজন আলেমের কাছে বিষয়টি খুলে বলা ভালো, তবে শরয়ীভাবে তালাক পতিত হয়নি।
৩. স্বামী বলে তালাকের নিয়তে কিছু বলেনি, স্ত্রীরও মনে হয় হয়তো তালাকের কথা বলেনি কিংবা বললেও উদ্দেশ্য ছিল না — তাহলে কি আর জিজ্ঞেস না করে সংসার করতে পারে?
উত্তর: হ্যাঁ, তারা নিশ্চিন্তে সংসার চালিয়ে যেতে পারে এবং এ বিষয়ে আর বারবার জিজ্ঞেস করার প্রয়োজন নেই।
ইসলামের মূলনীতি হলো: মূল হলো তালাক না হওয়া (আসলুল আমাদ্দাতু ‘আদামুহা)। যতক্ষণ নিশ্চিতভাবে তালাক প্রমাণিত না হচ্ছে, ততক্ষণ বিবাহ বহাল থাকবে। স্বামী যদি বলেন নিয়ত ছিল না এবং স্ত্রীরও ধারণা হয় যে তালাকের নিয়ত ছিল না, তাহলে সন্দেহের ভিত্তিতে তালাক সাব্যস্ত করা যাবে না।
হানাফী কিতাবের বক্তব্য:
- উসুলুশ শাশী (পৃ. ১০৭): "সন্দেহের বেলায় মূল অবস্থা (আসল) গ্রহণ করা হবে। এখানে মূল হলো বিবাহ বহাল থাকা।"
- ফাতাওয়া হিন্দিয়া (১/৩৫২): "ইউয়াকিন (নিশ্চিত জ্ঞান) দ্বারা সন্দেহ দূরীভূত হয় না। যদি তালাকের ব্যাপারে সন্দেহ হয়, তাহলে বিবাহ অটুট থাকবে।"
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (২/২৩১, আশরাফ আলী থানবী): "স্ত্রী যদি নিজে নিশ্চিত না হয় যে তালাকের শব্দ উচ্চারিত হয়েছে, তাহলে তার জন্য সংসার করা জায়েয। এক্ষেত্রে বারবার জিজ্ঞেস করার দরকার নেই; বরং তা ওয়াসওয়াসা (মনে সন্দেহ সৃষ্টি) সৃষ্টি করতে পারে।"
সারমর্ম: উভয় পক্ষের নিশ্চিত ধারণা থাকলে (বা অন্তত সন্দেহ থাকলে) তালাক পতিত হয়নি মনে করে সংসার করা জায়েয। তবে যদি কোনো স্পষ্ট প্রমাণ বা নিশ্চিত জ্ঞান থাকে যে তালাকের শব্দ নিয়তে উচ্চারিত হয়েছে, তাহলে আলেমের শরণাপন্ন হওয়া জরুরি।