দ্বীনের বিষয় উদাসীন, লেবাসধারি স্বামীর সাথে কেমন ব্যবহার করব?
Family Life · Hanafi
Question
আমার বিষয় আগেও অনেকবার প্রশ্ন করেছি। কিন্তু কিছুই ঠিক করতে পারছি না। দিনদিন সবর হারা হয়ে যাচ্ছি। নিজের মা বাবা দিনের বিষয় একদম উদাসীন, হারামে জড়িত এমনকি হারাম(সুদ) এবং অন্য বিষয় গুলোকে হারামই মনে করে না। জোর করে একটা লেবাসধারীর সাথে বিয়ে দিয়ে আমার জীবন টা নষ্ট করে দিয়েছে। এখন আমি আমার দুনিয়া, পরকাল সব হারাচ্ছি। ১ বছর এর একটা বাচ্চা নিয়ে সংসার জীবনের প্রতি ঘৃণা এসে গেছে। স্বামীকে ঘৃণা লাগে আমার। এরকম মানুষের সাথে সংসার করার চেয়ে মৃত্যু মনে হয় উত্তম। লোভী,অহংকারী, মুনাফিকি আচরণ, ঈমান নেই, হালাল হারাম এর তোয়াক্কা করে না, না স্ত্রীর হক জানে। পরিবার,শশুর বাড়ি কাউকেই বলে লাভ হয়নি উল্টো আমাকেই ঈমান ছেড়ে দিতে বলে। মা বাবা,শাশুরির কথা বলার মতো তো ভাষাই নেই। শাশুড়ি বলেন স্বামী মারতেই পারে,পরকীয়া করতেই পারে, বউ শুধু ভাত কাপড়ের জন্য সংসারে পরে থাকবে। মা বলেন তাঁদের জামাই ভালো কেননা তারা জোর করে বিয়ে দিচেন। আমি যেনো মানাই নেই,ছেলে মানুষ নাকি দীনদার হয় না,আমাকে জান্নাত পাওয়ার জন্য মা বাবা,স্বামী, শাশুড়ি সবার সব রকম হুকুম মেনে চলতে হবে।চাচা,মামা কোনো আত্মীয় স্বজন এই বিয়েতে রাজি ছিল না। আমার বাবা বলেন বিয়ের ২ বছর পর মেয়ে মানুষ নষ্ট হয়ে যায়, ছেলেদের মেয়ের অভাব নেই চাইলেই তাঁরা মেয়ে পেয়ে যায়,মেয়ে মানুষের বিয়ে জীবনে একবার হয় ইত্যাদি।
এইদিকে আমার স্বামীকে বাইরে থেকে দেখলে যে কেউ ফেরেশতা ভাববে। দাখিল মাদ্রাসা পড়েছে, দাড়ি রাখছে, ভদ্র ভাবে চলে কিন্তু ভিতর টা নাপাকে ভরপুর। পরকীয়ার কারণে আগে একবার ডিভোর্স হয়েছে। একাধিক মেয়ের সাথে হারাম সম্পর্ক ছিল। একজনের সাথে একাধিক বার শারিরীক সম্পর্কও হয়েছে প্রমাণ সহ জানতে পারি সব বিয়ের পর। ভালো হবে ভেবে সুযোগ দিয়েই যাচ্ছি কিন্তু নিজের পরিবর্তনের কোনো চেষ্টা নেই তাঁর। এখন আমি শক্ত কথা বলি। আমার ঘিন্না লাগে তাঁকে দেখলে। মা বাবার সাথেও সম্পর্ক ভালো না। তাঁরা বিয়ের সময় কোনো খোঁজ খবর নেয় নি,বিয়েতে রাজি না হওয়ায় আমার উপর মানসিক,শারীরিক সব রকম নির্যাতন করেছে। এমনকি তাবিজ পর্যন্ত করেছে। মা বাবা আমাকে মেরে ফেলার কথা বলে, তেজ্য করবে বলে, বদ দুআ তো অভ্যাস হয়ে গেছে। ওদের সব কিছু বিবেচনা করলে মনে হয় মেয়ে হয়ে জন্ম নিয়ে অভিশপ্ত হয়ে গেছি।এখনও তাঁরা জুলুম করেই যাচ্ছে। এসব ভাবলে মা বাবার উপর থেকে সম্মান উঠে যায়। ইচ্ছে করে সবার থেকে পালিয়ে যাই অন্তত নিজের ইমানটুকু যদি ধরে রাখতে পারি,বেছে থাকতে পারি।
১/ আমার মায়ের ভাষা প্রচুর নোংরা যেগুলো বলা হয়তো উচিত হবে না আর আমার কাছে ভাষা নেই বলার। আমার বাবার কথা গুলো কীভাবে নিবো? মেয়েকে এভাবে বলার মানে কি আসলে? আমার কাছে কথা গুলো নোংরা লেগেছে। ওই কথা বলার পর থেকে বাবার সাথে কথা বলিনি। আমার কেনো কেনো ঘিন্না লাগে।
২/ আমার স্বামীর কাছে নম্র ব্যবহার করলে উনি একদম গায়ে লাগে না। ঠান্ডা ভাবে একটা কথা বলে তো কখনো গুরুত্ব দেয় না। সংসারের আর্থিক হিসেব, বাচ্চা নিয়ে পরিকল্পনা বা অন্য কোনো বিষয়ে আমাকে গুরুত্ব দেয় না। এরকম উদাসীন মানুষের সাথে ভালো ভাবে চলে আমি ওরকম উদাসীন হয়ে যাচ্ছি। তাই ধৈর্য্য হারিয়ে যা পারি বলি। আমার কি এতে গুনাহ হবে? এরকম স্বামীর হক কি আধও আদায় করা সম্ভব?
৩/ কড়া ভাবে জবাব না দিলে আমার উপর জুলুম বেশি হয়ে যাচ্ছে। আমার ঈমান থাকছে না। এই বিষয়ে কি করা উচিত?
৪/ মা বাবার সাথে আমি নামের সম্পর্ক ছাড়া কোনো সম্পর্ক রাখতে চাই না। স্বামীর কাছে থেকেও ক্লান্ত হয়ে যাচ্ছি। নিজের আর্থিক অবস্থান ঠিক করে আমি সবার থেকে মুক্তি চাচ্ছি। আমার ছেলেকে নিয়ে আমি আলাদা জীবন চাচ্ছি। এই চিন্তা কি করা কি ঠিক হচ্ছে আমার?
Answer
উত্তর
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রথমেই আমরা আপনার কষ্ট বুঝতে পারছি। আপনি অত্যন্ত কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে যাচ্ছেন। আপনার ধৈর্য ও ঈমান রক্ষার আপ্রাণ চেষ্টা সত্যিই প্রশংসনীয়। নিচে আপনার প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর কুরআন, হাদীস ও হানাফি ফিকহের কিতাবের আলোকে দেওয়া হলো।
প্রশ্ন ১: মা-বাবার নোংরা ভাষা ও আচরণ কীভাবে নেবেন?
ইসলামে মা-বাবার সম্মান ফরজ, কিন্তু তাদের অন্যায়, গালাগালি, শারীরিক নির্যাতন বা দ্বীন থেকে ফিরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা মানতে বাধ্য নন আপনি। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
لَا طَاعَةَ لِمَخْلُوقٍ فِي مَعْصِيَةِ الْخَالِقِ
“সৃষ্টিকর্তার নাফরমানিতে সৃষ্টির আনুগত্য নেই।” (মুসনাদে আহমাদ, হাদীস: ১০৯৫)
মা-বাবার অশ্লীল ভাষা, মেরে ফেলার হুমকি, বদদু‘আ—এসব তাদের পক্ষ থেকে মারাত্মক গুনাহ। আপনি তাদের সঙ্গে কথাবার্তা বন্ধ করলে বা দূরত্ব বজায় রাখলে গুনাহগার হবেন না, বরং নিজের ঈমান রক্ষার জন্য তা জায়েজ। তবে চেষ্টা করবেন সম্পর্ক পুরোপুরি ছিন্ন না করে সীমিত পর্যায়ে রাখতে—যেমন নামমাত্র খোঁজখবর নেওয়া।
ইবনে আবেদীন (রহ.) লিখেছেন:
“পিতা-মাতা যদি সন্তানকে কোনো হারাম কাজে বাধ্য করে, তাহলে সন্তানের জন্য তা মান্য করা জায়েজ নয়; বরং তাকে অস্বীকার করতে হবে এবং প্রয়োজনে তাদের থেকে দূরে সরে যেতে পারে।” (রদ্দুল মুহতার, ৬/৪১২)
আপনার বাবার কথাগুলো (‘বিয়ের ২ বছর পর মেয়ে নষ্ট হয়’, ‘মেয়ের জীবনে বিয়ে একবার’ ইত্যাদি) সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও জাহেলি কথা। এগুলো কোনো শর‘ঈ দলিল নয়, বরং কুরআন-হাদীসের পরিপন্থী। আপনার ঘৃণা স্বাভাবিক। আপনি চাইলে তাদের সাথে সহজ-সরল ব্যবহার করতে পারেন, কিন্তু যে অশ্লীলতা ও নির্যাতন চালিয়ে যাবে, তা সহ্য করতে বাধ্য নন।
প্রশ্ন ২: উদাসীন স্বামীর সাথে কীভাবে চলবেন? তার হক আদায় কি জরুরি?
স্বামীর হক আদায় করা স্ত্রীর ওপর ফরজ। কিন্তু এই হকের মধ্যে অন্যায় আদেশ মেনে নেওয়া বা তার উদাসীনতা সহ্য করা অন্তর্ভুক্ত নয়। আপনার স্বামী যদি দ্বীনদার না হন, হারামে জড়িত থাকেন, এবং স্ত্রীর প্রতি দায়িত্ব পালনে উদাসীন হন, তাহলে আপনি তার প্রতি কাঠিন্য প্রদর্শন করতে পারেন যদি তাতে সংশোধনের আশা থাকে।
কুরআনে বলা হয়েছে:
وَاللَّاتِي تَخَافُونَ نُشُوزَهُنَّ فَعِظُوهُنَّ وَاهْجُرُوهُنَّ فِي الْمَضَاجِعِ وَاضْرِبُوهُنَّ
(আর যাদের অবাধ্যতার আশঙ্কা কর, তাদের উপদেশ দাও, শয্যায় তাদের ছেড়ে দাও এবং (শেষে) প্রহার কর।) [সূরা নিসা: ৩৪]
এই আয়াতে স্ত্রীর প্রতি স্বামীর কর্তব্য কঠোরভাবে পালনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু আপনার ক্ষেত্রে উল্টো—আপনার স্বামী নিজেই অবাধ্য ও উদাসীন। তাই আপনি কঠোর কথা বলতে পারেন, তবে গালিগালাজ বা অশ্লীল ভাষা ব্যবহার না করা উচিত। আপনার ধৈর্য হারিয়ে রাগে যা-তা বলা গুনাহ হতে পারে যদি তা হারাম পর্যায়ের হয়। তবে যদি আপনি শুধু সত্য কথা জোর দিয়ে বলেন বা তার ভুল ধরিয়ে দেন, তবে গুনাহ নয়।
উল্লেখ্য, স্বামী যদি নামায-রোযা না রাখে, সুদ-ব্যভিচারে লিপ্ত থাকে, তবে তার আনুগত্য করা স্ত্রীর জন্য ওয়াজিব নয়। বরং আপনি তাকে দ্বীনের দিকে আহ্বান করবেন; না শুনলে আপনি শরীয়তের বিচার চাইতে পারেন (যেমন: খুলা’ বা তালাক)।
স্বামীর হক আদায়: আপনি যতটুকু সম্ভব—যেমন তার খাবার তৈরি, ঘর-দোর গোছানো, সন্তানের দেখাশোনা—সেটুকু করবেন। কিন্তু তার হারাম কাজে সহযোগিতা করবেন না। যদি তিনি আর্থিকভাবে ভরণপোষণ না দেন, তাহলে তার ওপর আপনার অধিকার রয়েছে। আপনি কঠোরভাবে দাবি করতে পারেন।
প্রশ্ন ৩: কঠোর জবাব দেওয়া ও ঈমান রক্ষা
আপনার ওপর জুলুম বেড়ে যাচ্ছে—এটি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। ইসলাম অত্যাচার সহ্য করতে উৎসাহ দেয় না, বরং প্রতিরোধের অনুমতি দেয়। যেমন হাদীসে এসেছে:
انْصُرْ أَخَاكَ ظَالِمًا أَوْ مَظْلُومًا
“তুমি তোমার ভাইকে সাহায্য করো সে যালেম হোক বা মাজলুম হোক।” (বুখারী, হাদীস: ২৪৪৪)
অর্থাৎ যালেমকে তার জুলুম থেকে প্রতিরোধ করাও সাহায্য। আপনি যদি কঠোর ভাষায় প্রতিবাদ করেন, তবে তা জায়েজ। তবে লক্ষ্য রাখবেন—আপনার উদ্দেশ্য যেন প্রতিশোধ না হয়, বরং নিজের ওপর জুলুম বন্ধ করা এবং দ্বীন রক্ষা করা।
আপনার ঈমান নষ্ট হয়ে যাচ্ছে—এটি খুবই ভয়ংকর অবস্থা। ঈমান রক্ষার জন্য প্রয়োজনে বিচ্ছেদ জায়েজ। হাদীসে কুদসীতে এসেছে:
أَنَا عِنْدَ ظَنِّ عَبْدِي بِي
“আমি আমার বান্দার ধারণা অনুযায়ী তার সাথে ব্যবহার করি।” (বুখারী: ৭৪০৫)
আপনি চেষ্টা করুন সবর ও নামাযের মাধ্যমে আল্লাহর সাহায্য চাইতে। তওবা-ইস্তিগফার বেশি করে পড়ুন। মনে রাখবেন, মৃত্যু কখনোই সমাধান নয়; বরং মৃত্যুকে কামনা করা জায়েজ নয় (সহীহ মুসলিম, হাদীস: ৭১৮০)।
প্রশ্ন ৪: আলাদা জীবন চাওয়া—সন্তান নিয়ে পৃথক থাকা
ইসলাম নারীকে স্বামীর সাথে অসহ্য নির্যাতনের সময় পৃথক হওয়ার অনুমতি দেয়। আপনি খুলা’ (স্ত্রীর পক্ষ থেকে বিবাহ বিচ্ছেদ) নিতে পারেন যদি স্বামী রাজি হয়। কিংবা শরীয়তের কোর্টে ডিভোর্সের আবেদন করতে পারেন। স্বামী যদি ফাসেক ও যিনাকারী হয়, তাহলে ফকীহগণ বলেন—স্ত্রীর জন্য তাকে ছেড়ে আসা জায়েজ।
ইমাম কাসানী (রহ.) লিখেছেন:
“যদি স্বামী দ্বীনদার না হয় এবং স্ত্রীর সাথে ভালো ব্যবহার না করে, তাহলে স্ত্রীর জন্য তার কাছ থেকে খুলা’ নেওয়া জায়েজ।” (বাদায়েউস সানায়ে, ৩/১৪৮)
আপনার ছেলের বয়স ১ বছর। শিশু সন্তানের হেফাজতের অধিকার মায়ের কাছে থাকে (ততদিন পর্যন্ত যতদিন ছেলে ৭ বছর ও মেয়ে ৯ বছর না হয়)। আপনি চাইলে সন্তানকে নিয়ে আলাদা থাকতে পারবেন। তবে এজন্য আপনাকে স্বামীর থেকে খুলা’ নিতে হবে অথবা তালাক পেতে হবে। বর্তমানে আপনি আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হলে সেই পথে এগোনো যেতে পারে। তবে বাবা-মা থেকে পুরোপুরি সম্পর্কচ্ছেদ না করে অন্তত নামমাত্র সম্পর্ক রাখবেন, যাতে আপনি আত্মীয়তার হক ভঙ্গের গুনাহ থেকে বাঁচেন।
সংক্ষিপ্ত সুপারিশ
- সর্বোচ্চ ধৈর্য ও নামাযের মাধ্যমে আল্লাহর সাহায্য চান।
- স্বামীকে দ্বীনের দাওয়াত দিতে থাকুন; আশা ছাড়বেন না।
- যদি স্বামী সম্পূর্ণ অপরিবর্তনীয় ও যিনাকারী হয়, তাহলে খুলা’ বা তালাক নেওয়ার বৈধ উপায় খুঁজুন।
- মা-বাবার সাথে সীমিত সম্পর্ক রাখুন—তাদের প্রতি দো‘আ করবেন, কিন্তু তাদের জুলুম সহ্য করবেন না।
- আত্মহত্যা বা মৃত্যু কামনা থেকে বিরত থাকুন। এটি কবিরা গুনাহ এবং চিরস্থায়ী জাহান্নামের কারণ।
- একজন আলেম বা ইসলামি পরামর্শকের শরণাপন্ন হোন যিনি আপনাকে প্র্যাকটিক্যাল সাহায্য করতে পারেন।
আল্লাহ আপনার ধৈর্য ও ঈমান রক্ষার চেষ্টাকে কবুল করুন এবং আপনার জন্য উত্তম পথ বের করে দিন। আমীন।
উল্লেখ্য কিতাবাদি:
- রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবেদীন) – ৬/৪১২, ৩/১৪৮
- বাদায়েউস সানায়ে (কাসানী) – ৩/১৪৮
- ফাতাওয়া উসমানী (মুফতি তাকী উসমানী) – খুলা’ সম্পর্কিত অংশ
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (আশরাফ আলী থানবী) – স্বামী-স্ত্রীর অধিকার
- বিহিশ্তী জেওর (থানবী) – বিবাহ ও স্ত্রীর অধিকার
- মাআরিফুল কুরআন – সূরা নিসার তাফসীর
- সহীহ বুখারী ও মুসলিম – হাদীসসমূহ