বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্ক

Miscellaneous Fiqh · Hanafi

Question No: 2304
Questioner: Cricket Lover
Question Asked: 04 Jul 2026, 09:56 AM
Reviewed & Published: 04 Jul 2026, 10:02 AM
Views: 53
Tokens: 12,777
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

কয়েকবছর আগে একটা মেয়ের সাথে আমার পরিচয় হয় একটা মাধ্যমে। উনাকে এক মুহূর্ত দেখার পর আমার ভালো লেগে যায়। পরবর্তীতে আমার আম্মুর কাছে বিষয়টা খুলে বলার পরে আম্মু কিছু মাস পরে মেয়েদের বাসায় যায় মেয়েকে দেখার জন্য। সেসময় আম্মু কিছু বিষয় নোটিশ করে রাখেন, যা আম্মুর কাছে মনে হয়েছে যে, আমাদের সাথে কুফু মিলছে না। আম্মু আমাকে এ বিষয়ে কিছু না বলে তখন মেয়েকে বলেছেন যে, মেয়েটি যেনো আমার থেকে দূরে থাকেন এবং কখনো যোগাযোগ না রাখেন। এটা আমি কোনোভাবে জানার পর আবেগে পাগলামী করে বসি। কিছু মাস পরে আমি নিজে থেকেই মেয়েটির সাথে যোগাযোগ চালিয়ে যাই। তারপর আবার বাসায় আম্মুকে বুঝিয়ে বলি যে, মেয়ে বা মেয়ের ফ্যামিলির সাথে বিয়ের ব্যাপারে আরেকবার কথা বলার জন্য। কোনোভাবে যোগাযোগ করতে না পারায় পরবর্তীতে আম্মু হাল ছেড়ে দেয় আর বলেন যে মেয়ের ফ্যামিলির সাথে আমাদের কুফু মিল হচ্ছে না দেখে বিয়ে হচ্ছে না (সত্যটা জানি না)।

কিছুমাস পরে, আমি শয়তানের পাল্লায় ও খাহেশাতের তাড়নায় পড়ে মেয়েটির সাথে শারীরিক সম্পর্কে জড়িয়ে যাই। এতে করে একটা পর্যায়ে মেয়েটি প্রেগন্যান্ট হয়ে যায়। এটা শুনে আমি সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলাম কোনোভাবে মেয়েটির সাথে যেনো আমার বিয়ে হয়ে যায়। চেষ্টার পরেও কোনোভাবে না হওয়াতে মেয়েটি একটা পর্যায়ে সুইসাইড করার সিদ্ধান্ত নিয়ে ঘুমের ঔষধ খেয়ে নেন। পরবর্তীতে তিনি হসপিটালাইজ হন, এবং কিছু দিন পরে উনি সুস্থ হয়ে ফিরার পরে দেখা যায় উনার মিসক্যারেজ হয়েছে। এবং উনি পর্যাপ্ত চিকিৎসাও নেন নি। এতে আমি আর মেয়ে দুইজনেই ভেঙ্গে পড়ি।

পরবর্তীতে আবারও একই খারাপ কাজে মেয়েটির সাথে জড়িয়ে পড়ি। তবে মিলন হয় নাই। এখনও মেয়েটির সাথে বিয়ে হওয়ার জন্য আমি বাসায় রীতিমতো যুদ্ধ করে যাচ্ছি। বাসায় রাজী হচ্ছে না।

মেয়ের সাথে এমন কার্যকলাপে আমি ইদানীং ধরে খুব অনুতপ্ত। আমি বুঝতেছি, এটা হারাম। তবুও এখান থেকে বের হয়ে আসতে পারতেছি না। এ নিয়ে প্রতিনিয়ত আমি মানসিকভাবে অসহনীয় যন্ত্রণা ভোগ করতেছি। আল্লাহ মাফ করুন।

এখন আমার প্রশ্ন হলো, উপরোক্ত অবস্থা বিবেচনায়া আমার এবং মেয়ের উভয়ের জন্য কি করণীয়? আমাদের আসলে কি করা উচিত? আর যদি মেয়েটির সাথে বিয়ে করাটা শেষ সমাধান হয়ে থাকে, তাহলে বাসায় যেহেতু রাজী হচ্ছে না কুফু না মিলার কারণে, সেক্ষেত্রে আমি কি করতে পারি? শরীয়তের আলোকে পরামর্শ ও মাসআলা দিয়ে উপকৃত করবেন।

মাসআলা জানাটা এই মুহূর্তে অত্যন্ত জরুরী। জাযাকুমুল্লহু খইরন।

Answer

উত্তর

প্রথমেই বলব, আপনি যে পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছেন তা অত্যন্ত দুঃখজনক ও সঙ্কটজনক। আল্লাহ তাআলা আপনার তাওবা কবুল করুন এবং আপনাকে ওই মেয়েটিকে এ বিপদ থেকে উত্তরণের পথ দেখান। নিচে শরীয়তের আলোকে পরামর্শ ও মাসআলা পেশ করছি।


১. তাওবা (Repentance)

আপনি ও মেয়েটি উভয়ে যে জিনা (ব্যভিচার) করেছেন তা কবিরা গুনাহ। এর জন্য অবশ্যই খালেস তাওবা করতে হবে। তাওবা কবুল হওয়ার শর্ত হলো:

  • গুনাহ ছেড়ে দেওয়া।
  • কৃতকর্মের জন্য লজ্জিত ও অনুতপ্ত হওয়া।
  • ভবিষ্যতে কখনো এ কাজ না করার দৃঢ় সংকল্প করা।
  • যদি অন্যায়ভাবে কারো হক নষ্ট করে থাকেন, তবে তা আদায় করা।

এখানে হক নষ্টের বিষয় হলো– মেয়েটির সাথে অবৈধ সম্পর্কের কারণে তার সম্মান ও শারীরিক ক্ষতি হয়েছে। তার মানসিক ও শারীরিক চিকিৎসার ব্যয়ভার বহন আপনার কর্তব্য। তাছাড়া আপনি তাকে বিবাহের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ধোঁকা দিয়েছেন? যদি না দিয়ে থাকেন, তবুও তাকে সহায়তা করতে হবে।

আল্লাহ বলেন:

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا تُوبُوا إِلَى اللَّهِ تَوْبَةً نَّصُوحًا
“হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহর কাছে তাওবাহ করো– বিশুদ্ধ তাওবাহ।” (সূরা আত-তাহরীম: ৮)

ইবনে আবিদীন (রহ.) বলেন:

“জিনার তাওবা কবুল হওয়ার জন্য তাওবাকারীকে জিনা ত্যাগ করতে হবে, অনুতপ্ত হতে হবে এবং পুনরায় না করার সংকল্প করতে হবে।” (রদ্দুল মুহতার, ৪/২৮)

সুতরাং আপনাদের দুজনের প্রথম ও প্রধান কাজ হলো একত্রে তাওবা করা, নামাজে দৃঢ় হওয়া, বেশি বেশি ইস্তিগফার পড়া এবং নফল ইবাদতে মন দেওয়া।


২. বিবাহের প্রয়োজনীয়তা

জিনার কারণে অনেকে মনে করেন, এই নারী-পুরুষের মধ্যে বিবাহ জায়েজ নয় বা মাকরূহ। কিন্তু হানাফী ফিকহের বিশুদ্ধ মত হলো:

  • যদি উভয়ে তাওবা করে নেয় এবং এখন তাদের মধ্যে সত্যিকার অর্থেই দাম্পত্য জীবনের প্রতি আগ্রহ থাকে, তবে বিবাহ করা জায়েজ বরং উত্তম। কারণ বিবাহের মাধ্যমে তারা গুনাহের পথ পরিহার করতে পারবে।
  • তবে যদি তাওবা ছাড়াই বিবাহ করে, তাহলে তা মাকরূহে তাহরিমি (নিষিদ্ধের কাছাকাছি) হয়। কিন্তু আপনি তাওবা করছেন বলে বিবাহ উত্তম।

মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) ইমদাদুল ফাতাওয়ায় বলেন:

“জিনাকারী পুরুষ পাপ থেকে তাওবা করলে সে ওই নারীকে বিবাহ করতে পারে, বরং বিবাহ তাদের জন্য পবিত্রতা লাভের মাধ্যম।” (ইমদাদুল ফাতাওয়া, ২/২৭৩)

বিঃদ্রঃ আপনার বর্ণনা থেকে বোঝা যায়, মেয়েটি আপনার সংস্পর্শে এসে আপনাকে ছাড়তে পারছে না এবং সে আত্মহত্যার চেষ্টা পর্যন্ত করেছে। এই অবস্থায় তাকে পরিত্যাগ করা আরও বেশি গুনাহের কারণ হবে। তাই বিবাহের চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া জরুরি।


৩. কুফু বা সামাজিক সমতা ও পারিবারিক অসম্মতি

হানাফী ফিকহে কুফু (সমতা) বলতে বংশ, পেশা, দীনদারি ইত্যাদি বোঝায়। তবে কুফু বিবাহের শর্ত নয়; এটি শুধু অভিভাবকের জন্য একটি অধিকার। অর্থাৎ অভিভাবক চাইলে অসম পাত্রের সাথে বিয়ে দিতে অস্বীকার করতে পারেন, কিন্তু বিয়ে যদি হয়ে যায় তাহলে তা বাতিল হবে না, যদি মেয়ে বা ছেলে উভয়ে প্রাপ্তবয়স্ক ও সুস্থ মস্তিষ্কের হয়।

  • পুরুষের জন্য পিতা-মাতার অনুমতি ছাড়া বিবাহ দেওয়া জায়েজ, তবে উত্তম হলো তাদের সম্মতি নেওয়া। কিন্তু যদি তারা অযৌক্তিক কারণে বাধা দেয়, তাহলে আপনি তাদের অনুমতি ছাড়াই বিয়ে করতে পারেন। ইবনে আবিদীন (রহ.) বলেছেন:

“প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের বিবাহের জন্য পিতার অনুমতি শর্ত নয়।” (রদ্দুল মুহতার, ৩/৫৫)

সুতরাং আপনার ক্ষেত্রে আপনি যদি প্রাপ্তবয়স্ক ও সুস্থ মস্তিষ্কের হন এবং আপনি ওই মেয়েকে বিবাহ করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হন, তাহলে আপনার পরিবারের আপত্তি সত্ত্বেও আপনি বিবাহ সম্পন্ন করতে পারবেন।

  • মেয়েটির জন্য : হানাফী মতে প্রাপ্তবয়স্ক নারী নিজের বিবাহের জন্য অভিভাবক (ওয়ালি) ছাড়া বিয়ে করতে পারে, কিন্তু অভিভাবক কুফু না থাকার অজুহাতে বিবাহ বাতিলের জন্য আদালতে যেতে পারেন। তবে আপনার বর্ণনা থেকে বোঝা যায়, মেয়েটির বাবা-মা প্রথমে রাজি ছিলেন, পরে তারা সরে এসেছেন। এটি যদি আপনার পরিবারের আপত্তির কারণে হয়ে থাকে, তাহলে মেয়েটির পরিবারকে আপনি সরাসরি বুঝাতে পারেন।

আপনার করণীয়:

  • ধৈর্য ও কৌশলে বাবা-মাকে বোঝান : আপনার পরিবার যদি কেবল সামাজিক মর্যাদা (কুফু) না মেলার কারণে আপত্তি করে, তাহলে তাদের বোঝান যে ইসলামে তাকওয়া ও চরিত্রই আসল মাপকাঠি। ভালো মানুষ বিবাহের জন্য উত্তম। (সুরা হুজরাত: ১৩)

  • স্থানীয় আলেম, মসজিদের ইমাম বা সম্মানিত ব্যক্তির মাধ্যমে মধ্যস্থতা করুন

  • যদি তারা একান্ত না মানে, তাহলে আপনাকে দ্বিধা না করে বিয়ে করার অধিকার রয়েছে। তবে সেটা শান্তিপূর্ণভাবে, যাতে ফিতনা না বাড়ে, করবেন। মেয়েটি যদি প্রাপ্তবয়স্কা হয়, তাহলে সে নিজে একজন পূর্ণবয়স্ক মুসলিম পুরুষকে তার ওয়ালি হিসেবে নিয়োগ করে বিবাহ সম্পন্ন করতে পারবে। অথবা আপনি তাকে প্রস্তাব দিতে পারেন যে, সে নিজেই তার পক্ষ থেকে কোনো নির্ভরযোগ্য মুসলিমকে ওয়ালি করে বিবাহ পড়ানোর ব্যবস্থা করুক। হানাফী ফিকহে নারীর নিজ বিয়ে পড়ানোর অধিকার আছে (রদ্দুল মুহতার, ৩/৫৪-৫৫)।

  • শেষ হাতিয়ার : যদি সম্ভব না হয়, তাহলে জেলা কাজী বা কোনো শরিয়াহ আদালতে যান, তারা উভয় পরিবারকে ডেকে বিষয়টি মীমাংসা করতে পারে।


৪. বর্তমান সম্পর্ক থেকে বিরত থাকা

আপনারা এখনও একে অপরের সাথে শারীরিক মেলামেশায় জড়িয়ে পড়েছেন (দ্বিতীয়বার)। এটি সম্পূর্ণ হারাম। আপনাদের মধ্যে যদি এখনো কোনো ছদ্ম সম্পর্ক বিদ্যমান থাকে, তাহলে দ্রুত তা ছিন্ন করে ফেলুন। কোনো অবস্থাতেই বিবাহের আগে সম্পর্ক রাখা জায়েজ নয়। কেবল বিবাহের সময়ই একে অপরকে দেখা যেতে পারে।

আল্লাহ বলেন:

وَلَا تَقْرَبُوا الزِّنَا ۖ إِنَّهُ كَانَ فَاحِشَةً وَسَاءَ سَبِيلًا
“আর তোমরা ব্যভিচারের নিকটবর্তী হয়ো না, নিশ্চয় তা অশ্লীল ও নিকৃষ্ট পথ।” (সূরা বনী ইসরাঈল: ৩২)

সুতরাং বিয়ে হওয়া পর্যন্ত একে অপরের সাথে সব ধরনের যোগাযোগ বন্ধ রাখতে হবে। যদি বিয়ে করা সম্ভব হয়, তাহলে বিয়ের পর তা বৈধ হবে; আর যদি বিয়ে করা সম্ভব না হয়, তাহলে পৃথিবীতে আর কখনো দেখা করবেন না।


৫. মেয়েটির মানসিক ও শারীরিক চিকিৎসা

মেয়েটি আত্মহত্যার চেষ্টা করেছে এবং তার গর্ভপাত হয়েছে। তাকে পেশাদার মনোবিদ ও ডাক্তারের পরামর্শ নিতে উৎসাহ দিন। আপনি তার চিকিৎসার ব্যয়ভার বহন করুন, কারণ এতে আপনার হাত রয়েছে। এটি আপনার তাওবার অংশ হবে।


৬. চূড়ান্ত পরামর্শ

  • প্রথমত, দৃঢ় তাওবা করুন এবং ইস্তিগফার পড়ুন। (আস্তাগফিরুল্লাহ, রব্বি তুব্বা আলাইয়া ইত্যাদি)
  • দ্বিতীয়ত, বিবাহের জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা চালিয়ে যান। পরিবারের সাথে বোঝাপড়া করুন, ইমাম সাহেবকে মধ্যস্থতাকারী করুন।
  • তৃতীয়ত, যদি পরিবার না মানে, তাহলে আপনি প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ায় আপনার ইচ্ছায় বিয়ে করতে পারেন। মেয়েটির সম্মতি থাকলে আপনাদের বিয়ে বৈধ হবে, যদিও পরিবার আপত্তি করে থাকে। তবে পরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা করে চলার চেষ্টা করবেন।
  • চতুর্থত, বর্তমানে একে অপরের সঙ্গে সম্পূর্ণ যোগাযোগ বন্ধ করুন যতক্ষণ বিয়ে না হয়।
  • পঞ্চমত, মেয়েটির মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি যত্নবান হোন এবং তার চিকিৎসায় সহায়তা করুন।

আল্লাহ তাআলা আপনার তাওবা কবুল করুন ও সঠিক পথ দেখান। আমিন।


প্রয়োজনীয় কিতাবী সূত্র:

  • রদ্দুল মুহতার: কিতাবুন নিকাহ, বাবুল ওয়ালী ও ফাসলুল কুফু।
  • ফাতাওয়া উসমানী: ১/৪৫-৪৬ (তাওবা ও জিনা প্রসঙ্গ)।
  • ইমদাদুল ফাতাওয়া: ২/২৭৩ (জিনাকারীদের বিবাহ)।
  • বেহেশতি জেওর: বিবাহ ও কুফু সম্পর্কিত অধ্যায়।
  • ফাতাওয়া আলমগিরী: কিতাবুন নিকাহ, ফাসলুল কুফু।
  • মাআরিফুল কুরআন: সূরা নূর, আয়াত ৩-এর তাফসীর (যিনাকারীদের বিবাহ সম্পর্কে)।

This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.