দ্বীনি ইলম ও পার্থিব পড়াশোনায় সময় বণ্টনের হুকুম: কোনো ব্যক্তি ৪০-৫০ মিনিট ইসলামী জ্ঞান ও ২-৩ ঘন্টা জেনারেল লাইনে ব্যয় করলে কি তা জায়েয?
Halal and Haram · Hanafi
Question
Answer
উত্তর:
বিসমিল্লাহির রহমানির রহীম
الحمد لله رب العالمين، والصلاة والسلام على سيد المرسلين، وعلى آله وأصحابه أجمعين
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ:
একজন ব্যক্তি সাধারণ শিক্ষা (পার্থিব/জেনারেল লাইন) পড়ছে। সে দ্বীনি ইলম অর্জনের জন্য ইসলামী বই পড়ে, আলেমদের ভিডিও দেখে, ইসলামী কোর্স করে। এখন সে দৈনিক ৪০-৫০ মিনিট দ্বীনি ইলমে এবং ২-৩ ঘন্টা পার্থিব পড়াশোনায় সময় দেয়। এ অবস্থায় কি তার জন্য সময় বণ্টন জায়েয?
উত্তর:
হ্যাঁ, এ অবস্থায় সময় বণ্টন জায়েয, তবে শর্ত হলো—সে যেন দ্বীনি ফরয ইলম (ফরযে আইন) আদায় করতে ব্যর্থ না হয়। অর্থাৎ প্রত্যেক মুসলমানের জন্য ঈমান, আকীদা, নামায, রোযা, হালাল-হারাম ইত্যাদির মৌলিক জ্ঞান অর্জন করা ফরযে আইন। যদি এ ফরয ইলম অর্জন ও আমল করার পরও ব্যক্তি তার বাকী সময় বৈধ পার্থিব শিক্ষায় ব্যয় করে, তবে তা দোষণীয় নয়, বরং প্রয়োজনমাফিক জায়েয। তবে আদর্শ হলো—দ্বীনি ইলমের প্রতি সময় বেশি দেওয়া এবং নিয়ত সংশোধন করা।
প্রমাণ ও ফিকহী বিশ্লেষণ:
১. ফরযে আইন ও ফরযে কিফায়ার স্বরূপ:
প্রত্যেক মুসলিমের জন্য ন্যূনতম দ্বীনি জ্ঞান (যেমন তাওহীদ, নামাযের মাসায়েল, পবিত্রতা, রোযা, হালাল-হারাম) অর্জন করা ফরযে আইন। এর বেশি দ্বীনি ইলম (যেমন তাফসীর, হাদীসের গভীর জ্ঞান) ফরযে কিফায়া, যা কিছু লোক করলেই অন্যদের ওপর থেকে দায়িত্ব সরে যায়।
ইমাম কাসানী (রহ.)-এর বদাইউস সানাই‘ ও ইমাম ইবনু আবিদীন (রহ.)-এর রদ্দুল মুহতার এ নীতি স্পষ্ট।
২. পার্থিব শিক্ষার বৈধতার শর্ত:
পার্থিব শিক্ষা যদি বৈধ পেশা ও জীবিকার জন্য হয় এবং তাতে দ্বীনি ফরয ইলমের ক্ষতি না হয়, তবে তা জায়েয। এমনকি নিয়ত শুদ্ধ হলে তা ইবাদতেও পরিণত হতে পারে।
মুফতী মুহাম্মদ শফী (রহ.)-এর ‘মা‘আরিফুল কুরআন’-এ (সূরা আল-কাসাস, ৭৭) এসেছে যে, দুনিয়া আখিরাতের পাথেয় সংগ্রহের মাধ্যম হওয়া উচিত, উদ্দেশ্য নয়।
৩. সময় বণ্টনের মূলনীতি:
প্রশ্নোক্ত ব্যক্তি ৪০-৫০ মিনিট দ্বীনি ইলমে এবং ২-৩ ঘন্টা পার্থিব পড়াশোনায় দিচ্ছে। যদি সে নিয়মিত এ ৪০-৫০ মিনিটের মধ্যে তার ফরযে আইন স্তরের দ্বীনি জ্ঞান অর্জন ও আমল করে নেয় (যেমন নামাযের মাসায়েল শেখা, তিলাওয়াত, যিকির ইত্যাদি), তবে বাকী সময় পার্থিব শিক্ষায় দেওয়া জায়েয। কিন্তু যদি সে ফরয ইলম অর্জনেই অপূর্ণ থাকে, তবে তাকে সময় বাড়াতে হবে।
হাকীমুল উম্মত হযরত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী (রহ.) ‘বেহেশতী জেওর’-এর প্রথম খণ্ডে ফরয ইলমের তালিকা দিয়েছেন এবং বলেছেন যে, এগুলোর জন্য প্রতিদিন কিছু সময় নির্ধারণ করা প্রত্যেক মুসলিমের কর্তব্য।
৪. ‘ইলমের ফযীলত ও গুরুত্ব:
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
“طلب العلم فريضة على كل مسلم”
(সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস নং ২২৪)
অর্থ: জ্ঞান অর্জন করা প্রত্যেক মুসলিমের ওপর ফরয।
এ হাদীসে ‘ইলম বলতে সর্বপ্রথম দ্বীনি ইলম বুঝানো হয়েছে। তবে পার্থিব ইলমও যদি দ্বীনের খেদমতে লাগে, তবে তা মুস্তাহাব।
৫. নিয়তের গুরুত্ব:
ইমাম আবু হানীফা (রহ.) ও তাঁর শিষ্যদের মতে, দুনিয়াবী কাজেও নিয়ত সংশোধন করলে সওয়াব হয়। যেমন—পড়ালেখা করে হালাল রিজিক উপার্জন করা যাতে পরিবার ও নিজেকে দ্বীনের ওপর রাখা যায়, তাহলেও তা নেকির কাজ।
‘শরহু মা‘আনিল আছার’-এ ইমাম তাহাবী (রহ.) নিয়তের গুরুত্ব বর্ণনা করেছেন।
৬. প্রবীণ ফিকাহবিদদের নির্দেশনা:
ফতোয়া উসমানী (মুফতী তাকী উসমানী) ও ইমদাদুল ফতোয়া (মাওলানা আশরাফ আলী থানভী)-তে এসেছে যে, দ্বীনি ফরয ইলম আদায়ের পর বৈধ দুনিয়াবী কাজে সময় দিলে গুনাহ নেই, বরং তা প্রয়োজনীয়।
৭. আধুনিক প্রেক্ষাপটে প্রাসঙ্গিকতা:
আজকের যুগে সাধারণ শিক্ষা ছাড়া হালাল জীবিকা অর্জন কঠিন, তাই তা প্রয়োজনীয়। তবে যেন দ্বীনি শিক্ষাকে নেহায়েত কম না করা হয় এবং তাতে ‘গুনাহ বা অবহেলা’র মনোভাব না থাকে।
সতর্কতা:
- যদি পার্থিব পড়াশোনার কারণে ফরয নামায, জুমু‘আ, জানাযা ইত্যাদি ছুটে যায়, তাহলে তা হারাম।
- যদি দ্বীনি ইলম একেবারেই কমে যায় এবং ফরযে আইন আদায়ে ত্রুটি হয়, তবে সময় বণ্টন পরিবর্তন করা ওয়াজিব।
উপসংহার:
প্রশ্নোক্ত ব্যক্তি অল্প সময়ে হলেও নিয়মিত দ্বীনি ইলম অর্জন করছে; একই সাথে বৈধ পার্থিব শিক্ষায় সময় দিচ্ছে—এতে দোষ নেই, বরং জায়েয। তবে উত্তম হলো দ্বীনি ইলমের সময় আরও বাড়ানো এবং পার্থিব শিক্ষার সময় সংকুচিত করা। আর সব কাজ যেন আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য হয়।
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে সঠিক বুঝ দান করুন। (আমীন)
সূত্র:
- রদ্দুল মুহতার, ১/১১ (কিতাবুত ত্বহারত)
- বেহেশতী জেওর, ১ম খণ্ড (ফরয ইলম অধ্যায়)
- মা‘আরিফুল কুরআন, ৬/৫২৭ (সূরা আল-কাসাসের তাফসীর)
- ফতোয়া উসমানী, ৩/২৫৯
- ইমদাদুল ফতোয়া, ৪/২৩০ (দারুল উলূম করাচি)
- সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস নং ২২৪
والله أعلم بالصواب