এক তালাকের পর ইদ্দতকালে স্বামীর সাথে যোগাযোগ সম্পর্কে মাসআলা
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
ইদ্দতের ৩ মাস পর্যন্ত বা এর পরেও?
আর এক তালাকের আগে উনার আগের স্ত্রী (হয়তো জোর করে আল্লাহু আ'লাম)কথা নিয়েছেন যে উনার আগের স্ত্রী যদি কোনো দিন না চায়, আর কোনো দিন আমাকে গ্রহন করবে না যদি করে tahole আমি onar Jonno haram হয়ে যাবো matir upore daraye Allahre shakkhi rekhe bolse
Pore 1 talak dise
এমতাবস্থায় করনিয়ও কি?
আর কি আমাদের এক হওয়া সম্ভব না?
আর কি ফিরিয়ে নেওয়া সম্ভব না?
Answer
উত্তর
প্রশ্নটি বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে যে, একজন স্বামী তার স্ত্রীকে এক তালাক দিয়েছেন এবং তার পূর্বে তিনি মাটিতে দাঁড়িয়ে আল্লাহকে সাক্ষী রেখে একটি শর্তসাপেক্ষ বক্তব্য দিয়েছিলেন, যাতে তিনি বলেন: "যদি আমার আগের স্ত্রী কোনো দিন না চায়, আর কোনো দিন আমাকে গ্রহণ না করে, তাহলে তুমি (বর্তমান স্ত্রী) আমার জন্য হারাম হয়ে যাবে।" এরপর তিনি এক তালাক দেন। নিম্নে হানাফি ফিকহের আলোকে বিস্তারিত উত্তর দেওয়া হলো।
১. এক তালাকের পর ইদ্দতকালীন যোগাযোগ
ইসলামী শরিয়তে এক তালাক সাধারণত তালাকে রজ‘ঈ (প্রত্যাবর্তনযোগ্য) গণ্য হয়, যতক্ষণ না স্বামী স্পষ্টভাবে তালাককে বায়েন (অপ্রত্যাবর্তনযোগ্য) ঘোষণা করে। তালাকে রজ‘ঈ-এর ক্ষেত্রে ইদ্দতকাল (তিন মাসিক বা তিন মাস) স্বামী-স্ত্রী পরস্পরের সাথে কথা বলতে, খোঁজখবর নিতে এবং প্রয়োজনে দেখা-সাক্ষাৎ করতে পারে, তবে গোপনীয়তা ও নির্জনতা (খালওয়াত) পরিহার করা উচিত। কারণ ইদ্দতকালে স্বামী স্ত্রীকে ফিরিয়ে নেওয়ার অধিকার রাখে (সূরা বাকারা ২:২২৮)।
সুতরাং: প্রশ্নকারিণী তার স্বামীর খোঁজখবর নিতে পারেন, কথা বলতে পারেন, তবে তা ইদ্দতের শালীনতা বজায় রেখে এবং পুনরায় মিলনের আশায় করতে পারেন। ইদ্দত শেষ হওয়ার পরও তিনি খোঁজ নিতে পারেন, কিন্তু তখন তালাক বায়েন হয়ে যাবে এবং পুনরায় বিয়ে করতে নতুন নিকাহ প্রয়োজন হবে।
ইদ্দতের পর যোগাযোগ বৈধ নয়,গায়রে মাহরাম হয়ে যাবে। বিশেষ প্রয়োজনে কথা বলতে হলে মাহরামের মাধ্যমে কথা বলবে। কথা বলার মতো কেউ না থাকলে সেক্ষেত্রে পূর্ণ পর্দা বজায় রেখে শরয়ী গন্ডির মধ্যে থেকে জরুরী কথা বলতে পারবে।
২. স্বামীর শর্তসাপেক্ষ বক্তব্য (হারাম করা ও আল্লাহর নামে কসম)
স্বামী যদি বলে: "আল্লাহকে সাক্ষী রেখে বলছি, যদি আমার আগের স্ত্রী না চায়, তাহলে তুমি আমার জন্য হারাম হয়ে যাবে" — এটি ফিকহের ভাষায় ইয়ামিন (কসম) বা শর্তসাপেক্ষ তালাক হতে পারে। হানাফি মাজহাবের বিশিষ্ট ইমাম আবু হানিফা ও আবু ইউসুফ (রহ.)-এর মতে, "হারাম" শব্দটি যদি তালাকের নিয়তে না বলা হয়, তবে তা কসম হিসেবে গণ্য হবে, তালাক হবে না। ইমাম মুহাম্মাদ (রহ.) এর মতেও যদি নিয়ত স্পষ্ট না হয়, তবে তা কসম বলে গণ্য হবে (রদ্দুল মুহতার, ৩/২৪১)।
শরিয়তে কসম ভঙ্গ করলে কাফফারা দিতে হয়:
- দশজন মিসকিনকে মধ্যমমানের খাবার খাওয়ানো, অথবা
- তাদের কাপড় দান করা, অথবা
- একটি দাস মুক্ত করা; সামর্থ্য না থাকলে তিনদিন রোজা রাখা (সূরা মায়েদা ৫:৮৯)।
কিন্তু স্বামী যদি তালাকের নিয়তে বলেন, তাহলে শর্ত পূরণ হলে এক তালাক পতিত হবে। এখানে শর্তটি কী? স্বামীর আগের স্ত্রী "কথা নিয়েছেন" — অর্থাৎ তিনি হয়তো চাননি বা গ্রহণ করেননি। কিন্তু বর্তমান স্ত্রী (প্রশ্নকারিণী) তো সেই শর্ত পূরণের সাথে জড়িত নন। বরং স্বামী নিজেই এক তালাক দিয়ে দিয়েছেন, যা পূর্বের শর্ত-বক্তব্যের চেয়ে স্পষ্ট এবং তা কার্যকর।
সুতরাং: কালামটি কসম ধরলে, শর্ত পূরণ হলেও কসম ভঙ্গের জন্য কাফফারা দিলেই হবে; তালাক পতিত হবে না। এমতাবস্থায় স্বামী ইদ্দতের মধ্যেই স্ত্রীকে ফিরিয়ে নিতে পারেন। আর যদি তালাকের নিয়তে হতো, তাহলে শর্ত পূরণের আগেই তিনি আরেক তালাক দিয়েছেন; তাই দুটো তালাক গণনা হবে না। (কারণ শর্ত পূরণ হয়নি অথবা পরে দেওয়া তালাক পূর্বের শর্তকে অকার্যকর করে দেয়।)
৩. পুনরায় এক হওয়ার সম্ভাবনা
- ইদ্দতকালের মধ্যে: স্বামী যদি ইচ্ছা করেন, তিনি স্ত্রীকে ফিরিয়ে নিতে পারেন — শুধু মুখে বলেই: "আমি তোমাকে ফিরিয়ে নিলাম" অথবা শারীরিক মিলনের মাধ্যমেও। এতে নতুন নিকাহ বা মোহরের প্রয়োজন নেই।
- ইদ্দত শেষ হওয়ার পর: তালাক বায়েন হয়ে যাবে। তখন পুনরায় বিয়ে করতে চাইলে নতুন করে দুইজন সাক্ষীর উপস্থিতিতে নিকাহ করতে হবে; তবে নতুন বিয়েতে ইদ্দতের প্রয়োজন নেই।
প্রশ্নকারিণীর জন্য করণীয়: নতুন নিকাহের আশা থাকলে ইদ্দত শেষ হওয়ার আগেই স্বামীকে জানিয়ে ফিরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা করা উচিত। স্বামী রাজি না থাকলে, ইদ্দত শেষে উভয়ের সম্মতিতে নতুন নিকাহ করতে পারবেন।
“হওয়া সম্ভব না” বা “ফিরিয়ে নেওয়া সম্ভব না” — এমন কোনো অলঙ্ঘনীয় বাধা নেই। পূর্বের শর্তসাপেক্ষ বক্তব্য কোনো স্থায়ী বাধা সৃষ্টি করেনি, যদি না তা কসমের কাফফারা দিয়ে সমাধান হয়।
৪. বিশেষ দ্রষ্টব্য
- উপরের উত্তরটি সাধারণ হানাফি ফিকহের আলোকে দেওয়া হয়েছে। প্রকৃত অবস্থা ও নিয়ত সম্পর্কে স্বামীর কাছ থেকে বিস্তারিত না জানলে চূড়ান্ত ফতোয়া দেওয়া কঠিন। তাই যেকোনো পদক্ষেপ নেওয়ার আগে স্থানীয় কোনো মুফতি বা আলেমের কাছে পুরো ঘটনা বিবৃত করে নির্দেশনা নেওয়া উত্তম।
- স্ত্রী যদি নিজে স্বামীর সাথে সরাসরি যোগাযোগ করতে অস্বস্তি বোধ করেন, তাহলে মধ্যস্থতাকারী (পরিবারের সদস্য, সম্মানিত ব্যক্তি) মারফত খোঁজখবর নিয়ে মীমাংসার চেষ্টা করতে পারেন।
সারসংক্ষেপ
| বিষয় | হানাফি ফিকহের বিধান | |--------|----------------------| | ইদ্দতকালে যোগাযোগ | জায়েজ, শালীনতা বজায় রাখা ও পুনর্মিলনের নিয়তে | ইদ্দতের পর যোগাযোগ বৈধ নয়,গায়রে মাহরাম হয়ে যাবে। বিশেষ প্রয়োজনে কথা বলতে হলে মাহরামের মাধ্যমে কথা বলবে। কথা বলার মতো কেউ না থাকলে সেক্ষেত্রে পূর্ণ পর্দা বজায় রেখে শরয়ী গন্ডির মধ্যে থেকে জরুরী কথা বলতে পারবে।
| স্বামীর “হারাম করা” বক্তব্য | কসম হিসেবে গণ্য; কাফফারা দিলেই দায়মুক্ত | | ইদ্দতে ফিরিয়ে নেওয়া | সম্ভব, শুধু মুখে বললেই যথেষ্ট | | ইদ্দতের পর পুনর্বিবাহ | নতুন নিকাহের মাধ্যমে সম্ভব | | পূর্বের বক্তব্যে চিরস্থায়ী বাধা | নেই |
আল্লাহ তাআলা সঠিক পথ দেখান। (আমীন)
References:
- রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন), ৩/২৪১, ৩/৪৭২
- ফাতাওয়া উসমানী (মুফতি তাকী উসমানী), ১/৪৫০-৪৫২
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (মুফতি আশরাফ আলী থানভী), ২/৪৮৫
- বেহেশতী জেওর (মাওলানা আশরাফ আলী থানভী), তালাক অধ্যায়