কালিমার পতাকা টানানো সম্পর্কে ইসলামের দিকনির্দেশনা জানতে চাই?
Salah-Prayer · Hanafi
Question
Answer
উত্তর:
কালিমা তাইয়্যেবা (লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ) ইসলামের মূল ভিত্তি এবং এটি অত্যন্ত পবিত্র বাণী। তাই এটি লিখে পতাকা বা ব্যানারে লাগানো ইসলামী শরীয়তে জায়েয কি না, তা নির্ভর করে উক্ত পতাকার প্রতি সম্মান ও পবিত্রতা রক্ষার শর্তের ওপর।
হানাফী ফিকহের দৃষ্টিভঙ্গি
হানাফী মাযহাবের কিতাবসমূহে (যেমন রদ্দুল মুহতার, ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ইমদাদুল ফাতাওয়া) স্পষ্ট বর্ণনা এসেছে যে, আল্লাহর নাম বা কালিমা অসম্মানিত হওয়ার স্থানে লিখা জায়েয নয়। যদি পতাকাটি এমন জায়গায় লাগানো হয় যেখানে এটি সহজেই ময়লা হতে পারে, পায়ে ঠেলা যেতে পারে, বা অনাদর ও অসম্মানের শিকার হতে পারে, তাহলে তা বৈধ নয়। বরং এটি নাজায়েয ও গুনাহের কাজ হবে।
কিন্তু যদি পতাকাটি উচ্চস্থানে, সম্মানের সাথে, এবং এমন জায়গায় লাগানো হয় যেখানে এর প্রতি অসম্মান হওয়ার সম্ভাবনা না থাকে, তবে তা জায়েয হতে পারে। তবে অধিকাংশ হানাফী ফকীহ (যেমন ইবনে আবেদীন শামী) সতর্ক করেছেন যে, পতাকায় কালিমা লিখলে সাধারণত এর অপব্যবহার বা অসম্মানের আশঙ্কা থাকে—যেমন বাতাসে পড়ে গিয়ে মাটিতে লুটানো, অমুসলিমদের দ্বারা পদদলিত হওয়া, বা রাজনৈতিক প্রদর্শনীতে ব্যবহার করা। তাই অপ্রয়োজনে এমন কাজ না করাই উত্তম।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষণ
আজকাল বিভিন্ন স্থানে (বাড়ির ছাদ, মসজিদের মিনার, মিছিল ইত্যাদি) কালিমার পতাকা লাগানো হচ্ছে। এতে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় খেয়াল করতে হবে:
- পবিত্রতা ও সম্মান: পতাকাটি যদি ধুলা, বৃষ্টি, পাখির বিষ্ঠা ইত্যাদিতে নোংরা হয়, তাহলে কালিমার বাচক শব্দগুলো অসম্মানের শিকার হবে।
- অপব্যবহার: অনেকে পতাকাটি হাতে ধরে, কাঁধে ফেলে, অথবা বিভিন্ন উঁচু-নিচু স্থানে স্থাপন করে। এতে কালিমার প্রতি হেয় প্রতিপাদন হতে পারে।
- বেদআতের আশংকা: কালিমার পতাকাকে কেউ কেউ তাবাররুক (বরকত) বা বিজয়ের প্রতীক মনে করলেও তা ইসলামের কোনো নির্দিষ্ট ইবাদত নয়। সুতরাং এটিকে ফরজ বা সুন্নতে পরিণত করা ঠিক হবে না।
কুরআন-হাদীসের দলীল
আল্লাহ বলেন:
“আর যে আল্লাহর নিদর্শনসমূহকে সম্মান করে, তা তো তাকওয়ারই ফল।” (সূরা হজ্জ, ৩২)
কালিমা হল সবচেয়ে বড় আল্লাহর নিদর্শন। তাই এর সম্মান রক্ষা করা আবশ্যক।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:
“তোমরা আমার নামে নাম রেখো, কিন্তু আমার গুণে গুণান্বিত হয়ে নিজেদের ডেকো না (অর্থাৎ আব্দুল্লাহ বা আব্দুর রহমান বাদ দিয়ে শুধু 'মুহাম্মাদ' বা 'রাসূল' নামে ডেকো না যাতে অসম্মান না হয়)…” (বুখারী, ৬১৮৬)
এ হাদীস থেকে বোঝা যায়, পবিত্র বাণীকে অসম্মানিত করা থেকে বিরত থাকতে হবে।
হানাফী ফকীহদের বক্তব্য
- ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মাদ (রহ.)-এর মতে, দিরহামে লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু লেখা জায়েয ছিল, তবে ইমাম আবু হানীফা (রহ.) শুরুতে আপত্তি করেছিলেন কারণ তখন আরবের অমুসলিমরা তা অসম্মান করত। (ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ৫/৪১৯-৪২০)
- মুফতি মুহাম্মাদ শফী উসমানী (রহ.) বলেন: “যে স্থানে পবিত্রতা রক্ষা করা কঠিন, সেখানে কালিমা বা আল্লাহর নাম লিখে টাঙানো নাজায়েয।” (মা‘আরিফুল কুরআন, তাফসীরে সূরা হজ্জ)
- মুফতি তাকী উসমানী (দামাত বরকাতুহুম) বলেন: “বর্তমানে পতাকায় কালিমা লিখে টাঙানোর প্রচলন দূর করা উচিত, কারণ এর দ্বারা অসম্মান হওয়া প্রায় অনিবার্য।” (ইসলাহী খুতুবাত, ২/২৭৬)
সিদ্ধান্ত
অতএব, হানাফী মাযহাব অনুযায়ী:
- যদি কালিমার পতাকা এমনভাবে লাগানো হয় যে তার পূর্ণ পবিত্রতা ও সম্মান রক্ষিত হয় (যেমন মসজিদের উঁচু মিনারের ভেতরে, যেখানে কখনো ময়লা হয় না, এবং তা যাতে কখনো ভূমিতে পতিত না হয়), তবে তা জায়েয আছে।
- কিন্তু বাস্তবে সাধারণত পতাকা বাইরের পরিবেশে লাগানো হয় এবং এর সম্মান ঠিক রাখা অত্যন্ত কঠিন। তাই এ থেকে বিরত থাকাই উত্তম ও অধিক সাবধানতা।
আল্লাহ ভালো জানেন।
والله أعلم بالصواب