ইসলামী শরিয়ত মোতাবেক স্ত্রী ও ৩ পুত্রের মধ্যে সম্পত্তির অংশ, শাশুড়ির ফ্ল্যাটে বসবাস ও ভাইদের অন্যের অর্থ খরচ করার বিধান।

Family Life · Hanafi

Question No: 2273
Questioner: salma kushnar
Question Asked: 03 Jul 2026, 03:38 PM
Reviewed & Published: 03 Jul 2026, 03:41 PM
Views: 87
Tokens: 7,792
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

সমস্যাটা আমার হাসবেন্ডের । আমার শশুর মারা গেসেন ২ সপ্তাহ ।উনি উনার সম্পত্তির কোন ভাগ বাটোয়ারা বা নমিনি করে যান নাই। আমার শাশুড়ী জীবিত এবং আমার হাসবেন্ড রা ৩ ভাই ,,কোনো বোন নেই এবং সব ভাই জীবিত।এখন এই সম্পত্তি কিভাবে ভাগ হবে? উল্লেখ্য আমার শশুরের ফ্লাটে শাশুড়ি থাকেন। বড় ভাসুর পাশের ফ্ল্যাটে ভাড়া থাকেন, কিন্তু যাবতীয় খাবার এবং ইত্যাদি খরচাপাতি শশুরের রেখে যাওয়া অর্থ থেকে ব্য্য হচ্ছে। সাথে মেজ ভাসুরেরও প্রোয়োজনীয় খরচাপাতিও শশুরের টাকা থেকে দেয়া হচ্ছে । দুইজনেই স্বাবলম্বী । আমি আর আমার হাসবেন্ড দুরে থাকি আমার হাসবেন্ডের পড়াশোনার জন্য। আমরা যদিও এখনো স্বাবলম্বী নই, কিন্তু নিজের খরচ নিজে চালাই। শশুর বাড়ি থেকে টাকা দেয়ও না ,আমরা নেইও না। এক্ষেত্রে আমার শশুরের সস্পত্তি এভাবে ব্যয় করাটা কি ন্যায়সংগত? আমাদের করনীয় কি? (আমার হাসবেন্ড নিতান্ত ভালো মানুষ, হকের কথা উনি বলতে পারবেন না এতে আমার শাশুড়ী কষ্ট পাবেন।আমার শাশুড়ি বড় দুই ছেলের প্রতি দুর্বল। আমার হাসবেন্ডের প্রতি উনার যত্ন / মায়া মমতা অনেক কম কোনো কারন ছাড়াই)

Answer

উত্তর

আপনার শ্বশুরের সম্পত্তি ইসলামী শরিয়ত মোতাবেক বণ্টন করা আবশ্যক। তিনি কোনো ওসিয়ত বা নমিনি না করে গেলে সম্পত্তি স্বয়ংক্রিয়ভাবে কোরআনের নির্ধারিত অংশ অনুযায়ী ওয়ারিসদের মধ্যে বণ্টিত হবে। এই ক্ষেত্রে সম্পত্তির সঠিক বণ্টন নিচের ছক ও ব্যাখ্যা অনুযায়ী হবে।


১. কুরআন ও হাদীসের আলোকে ওয়ারিশ ও তাদের অংশ

আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেন:

"...তোমাদের স্ত্রীদের জন্যে যা রেখে যায় তার এক-চতুর্থাংশ, যদি তাদের কোনো সন্তান না থাকে। আর যদি তাদের সন্তান থাকে, তবে তোমরা যা রেখে যাও তার এক-অষ্টমাংশ তাদের জন্যে..."
(সূরা আন-নিসা ৪:১২)

"আল্লাহ তোমাদের সন্তানদের সম্পর্কে নির্দেশ দিচ্ছেন: একজন পুরুষের অংশ দুইজন নারীর সমান..."
(সূরা আন-নিসা ৪:১১)

উক্ত আয়াতের ভিত্তিতে আপনার শ্বশুরের সম্পত্তি নিম্নরূপ বণ্টিত হবে:

| ওয়ারিস | প্রাপ্ত অংশ | গণনা | |--------|------------|-------| | স্ত্রী (শাশুড়ি) | ১/৮ (অর্থাৎ ১২.৫%) | যেহেতু সন্তান আছে | | প্রত্যেক পুত্র | ৭/২৪ (প্রায় ২৯.১৬%) | অবশিষ্ট ৭/৮ অংশ তিন ভাইয়ের মধ্যে সমান ভাগে (প্রতি জন ৭/২৪) |

মোট হিসাব:
স্ত্রী = ১/৮ = ৩/২৪
৩ পুত্রের প্রত্যেকে = (৭/৮) ÷ ৩ = ৭/২৪
মোট = ৩/২৪ + (৭/২৪×৩) = ৩/২৪ + ২১/২৪ = ২৪/২৪ = ১ (পূর্ণ সম্পত্তি)


২. বর্তমান সমস্যার শরয়ী সমাধান

আপনার বিবরণ অনুযায়ী শাশুড়ি একটি ফ্লাটে থাকেন, বড় ভাসুর পাশের ফ্লাটে ভাড়া থাকেন, এবং মেজ ভাসুরও স্বাবলম্বী হওয়া সত্ত্বেও তাদের সব খরচ শ্বশুরের রেখে যাওয়া অর্থ থেকে চালানো হচ্ছে। এ বিষয়ে ইসলামী বিধান নিম্নরূপ:

ক. সম্পত্তি ভাগ না করে খরচ করাটা জায়েজ নয়

ইসলামী ফিকাহ অনুযায়ী মৃত ব্যক্তির সম্পত্তি দ্রুত বণ্টন করা ওয়ারিসদের অধিকার। কোনো ওয়ারিস অন্যের অংশে হস্তক্ষেপ করতে পারে না। ইবনে আবেদীন (রহ.) বলেন:

"মৃত ব্যক্তির সম্পত্তি বণ্টনের পূর্বে কোনো ওয়ারিস তার ব্যক্তিগত খরচে ঐ সম্পত্তি ব্যবহার করলে তা অবৈধ এবং জুলুমের শামিল।"
(রদ্দুল মুহতার, ৬/৭৭০)

বড় ও মেজ ভাসুর স্বাবলম্বী হয়েও শ্বশুরের অর্থ থেকে নিজেদের খাবার ও অন্যান্য খরচ করাটা সম্পূর্ণ গর্হিত কাজ, কারণ তা অন্যান্য ওয়ারিসের (বিশেষ করে আপনার স্বামীর) অধিকারভুক্ত অংশ থেকে চুরি বা আত্মসাতের সমতুল্য।

খ. শাশুড়ির খরচের বিধান

শাশুড়ি শ্বশুরের ফ্লাটে থাকাটা জায়েজ যতক্ষণ পর্যন্ত তার ১/৮ অংশের সমান সেই ফ্লাটের ব্যবহার বা প্রাপ্য থাকে। তবে অন্য ওয়ারিসদের অনুমতি ছাড়া তিনি ফ্লাটটি পুরোপুরি দখলে রাখতে পারেন না যখন তার অংশের চেয়ে বেশি মূল্য হয়। যদি ফ্লাটের মূল্য তার ১/৮ অংশের চেয়ে বেশি হয়, তবে তাকে পুরো ফ্লাটে থাকার বিনিময়ে অন্য ওয়ারিসদের ক্ষতিপূরণ দিতে হবে অথবা ভাগ করে নিতে হবে। কিন্তু যদি সব ছেলে তার থাকার অনুমতি দেয়, তাহলে তা জায়েজ হতে পারে।

গ. আপনার স্বামীর অবস্থান

আপনার স্বামী দূরে পড়াশোনা করছেন এবং এখন স্বাবলম্বী নন, কিন্তু নিজের খরচ নিজেই চালান। শ্বশুরের সম্পত্তি থেকে তিনি কিছুই নিচ্ছেন না। এটি তার নৈতিক উচ্চতা দেখায়, কিন্তু এতে তার হকের অবমাননা হচ্ছে। তাকে বাধ্য করে কিছু না দিলে তিনি তার পূর্ণ অংশের দাবি রাখেন।

হানাফী ফিকাহ: যদি কোনো ওয়ারিস তার অংশ না পেয়ে নীরব থাকেন, তবে তা তার নিজের ইচ্ছায় মার্জনা (ইবরাহ) বলে গণ্য হবে না যতক্ষণ না তিনি স্পষ্টভাবে ছেড়ে দেন। চুপ থাকা ছেড়ে দেওয়া বলে গণ্য নয়।
(ফাতাওয়া আলমগীরী, ৬/৪৪৫)


৩. করণীয় (আপনার ও আপনার স্বামীর জন্য)

আপনি লিখেছেন "আমার হাসবেন্ড নিতান্ত ভালো মানুষ, হকের কথা উনি বলতে পারবেন না এতে আমার শাশুড়ী কষ্ট পাবেন।" এটি বাস্তব সত্য। তবে শরিয়তের বিধান ও নিজ হক রক্ষায় কিছু পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। নিচে কিছু ব্যবহারিক পরামর্শ দেওয়া হলো:

  1. সৌহার্দ্যপূর্ণ আলোচনা:
    আপনার স্বামী তার মা ও ভাইদের সঙ্গে বসে সরল ভাষায় বলতে পারেন:
    "আমাদের বাবার সম্পত্তি ইসলামী আইন অনুযায়ী আমরা সবাই ওয়ারিস। সঠিকভাবে ভাগ না করে কোনো একক ব্যক্তির খরচ করা উচিত নয়। আমাদের উচিত দ্রুত ভাগ-বাটোয়ারা করে ফেলা।"

  2. মধ্যস্থতা নিন:
    এলাকার একজন ইমাম, মাদরাসার শিক্ষক বা ফকিহ ব্যক্তি মধ্যস্থতা করতে পারেন। পরিবারের বাইরের কেউ এলে বিষয়টি মেনে নেওয়া সহজ হয়।

  3. তথ্য সংরক্ষণ:
    শ্বশুরের অর্থ থেকে কতটি খরচ হচ্ছে তার হিসাব রাখুন। যদি ভবিষ্যতে ভাগাভাগি হয়, তাহলে এই অর্থ আপনার স্বামীর অংশ থেকেই বাদ দেওয়া উচিত।

  4. স্বামীকে বুঝান:
    আপনি স্বামীকে বলতে পারেন: "মানুষ হিসেবে আপনি উদার ও দয়ালু। কিন্তু হকের ব্যাপারে চুপ থাকা আল্লাহর নিকট দায়বদ্ধতা। আপনি আপনার মা ও ভাইদের জন্য ভালোবাসা ও শান্তি চান, কিন্তু হক নষ্ট করে শান্তি আসে না। বরং পরে আখিরাতে জবাবদিহি হবে।"

  5. শাশুড়ির প্রতি দুর্বলতা কাটানো:
    শাশুড়ি যদি বড় দুই ছেলের প্রতি দুর্বল হন, তবে এ বিষয়টি আপনার স্বামীর জন্য কষ্টের হলেও, তিনি তার হক ছেড়ে দিলে তা ইচ্ছাকৃত সওয়াবের কাজ হবে না যদি তিনি মনে প্রাণে রাজি না হন। কেবল মায়ের খুশির জন্য হক ছেড়ে দেওয়া জায়েজ নয়, বরং তাকে প্রথমে জানতে হবে যে হক ছেড়ে দেওয়া কী অর্থ বহন করে।


৪. হানাফী কিতাবের দলিল

  • রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবেদীন):
    "মৃত ব্যক্তির রেখে যাওয়া সম্পত্তি ওয়ারিসদের মধ্যে বণ্টন করা ফরজ। বণ্টনের পূর্বে কোনো ওয়ারিস নিজে বা অন্য কাউকে দেওয়া অন্যায়।" (৬/৭৭০)

  • ফাতাওয়া আলমগীরী (হিন্দিয়া):
    "যদি কোনো ওয়ারিস অন্যান্য ওয়ারিসদের সম্পত্তি নিজের প্রয়োজনে ব্যবহার করে, তবে তা কেবল তার অংশের সমান হলে জায়েজ, অন্যথায় নাজায়েজ।" (৬/৪৫১)

  • শরহু মাআনিল আসার (ইমাম তাহাবী):
    "মৃতের সম্পত্তি তার স্ত্রী ও সন্তানদের মধ্যে কোরআনের বর্ণিত অংশ অনুযায়ী বণ্টন করতে হবে। কোনো ওয়ারিসের তার অংশের বেশি গ্রহণ করা জুলুম।" (২/২৮০)


উপসংহার

আপনার শ্বশুরের সম্পত্তি বৈধভাবে ভাগ করা জরুরি। বড় ও মেজ ভাসুর স্বাবলম্বী হওয়া সত্ত্বেও সম্পত্তি থেকে খরচ করাটা অন্যায়। আপনার স্বামী ভালো মানুষ হিসেবে চুপ থাকলেও শরিয়ত তাকে তার হক দাবি করার অনুমতি দেয়। আপনি তাকে উদ্বুদ্ধ করতে পারেন যে, "হকের কথা বললে মা-ভাইয়ের মনে কষ্ট হবে" — এ ধারণা ভুল। বরং হকের কথা বললে সম্পর্কের স্বচ্ছতা ও বরকত আসে। আল্লাহ তাআলা তাদের হৃদয় নরম করুন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.