মায়ের সুদের ঋণ পরিশোধে হালাল টাকা ব্যবহার করা জায়েজ কি?

Halal and Haram · Hanafi

Question No: 2266
Questioner: Sonali Islam 0084
Question Asked: 03 Jul 2026, 01:00 PM
Reviewed & Published: 03 Jul 2026, 01:11 PM
Views: 138
Tokens: 5,578
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম,
আমার আম্মু অনেক টাকা সুদ এর ঋণ হয়ে গেছে।
সারাদিন ছোটাছুটি করে টাকার জন্য।সকাল থেকে শুরু হয় রাত হয়ে যায় সামলাতে সামলাতে। একজন থেকে নিয়ে আরেকজনকে দেয়।শারীরিক /মানসিক ২ ভাবেই কষ্ট পাচ্ছে।
আমার অনেক সময় না খেয়ে কাটাচ্ছি।
আমার বাবার টাকায় সংসার চালানো ঋণ দেওয়া সম্ভব নয়।তাই আমরা ২ বোন টিউশন করি।

আমাদের টাকা টা অনেক সময় ই সুদ / ধার নিয়ে সুদ পরিশোধ করছে এমন ধার টাকা শোধ করে।
এই অবস্থা আমাদের হালাল টাকা উক্ত ঋণ পরিশোধ এ জায়েজ আছে?

পরিশোধ যদি না করা হয় তাহলে সেটা শেষ হবে কী ভাবে সেটা তো বাড়তেই থাকবে?

Answer

প্রশ্ন: আমার আম্মু অনেক টাকা সুদের ঋণে জড়িয়ে পড়েছেন। তিনি একজন থেকে ধার নিয়ে আরেকজনকে দিয়ে সুদের বোঝা সামলাচ্ছেন, ফলে শারীরিক ও মানসিকভাবে কষ্ট পাচ্ছেন। আমরা দুই বোন টিউশনি করে কিছু হালাল টাকা উপার্জন করি। এই হালাল টাকা দিয়ে যদি আমরা মায়ের সুদের ঋণ পরিশোধ করি, তাহলে তা কি জায়েজ হবে? ঋণ পরিশোধ না করলে তো সুদ বাড়তেই থাকবে।


উত্তর:

وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

প্রথমেই বলব, আপনার এবং আপনার পরিবারের এই কঠিন পরিস্থিতির জন্য আমি অত্যন্ত দুঃখিত। আল্লাহ তা‘আলা আপনাদের এই কষ্ট লাঘব করুন এবং সহজ পথ দেখান। (আমিন)

আপনার প্রশ্নের সরাসরি উত্তর হলো: হ্যাঁ, আপনারা যে হালাল টাকা উপার্জন করছেন, তা দিয়ে আপনাদের মায়ের সুদের ঋণ পরিশোধ করা জায়েজ (বৈধ) আছে। বরং এটি একটি নেক কাজ এবং পরিবারকে আরও বড় পাপ ও কষ্ট থেকে রক্ষা করার উপায়।

নিচে কুরআন, হাদিস এবং হানাফি ফিকহের কিতাবের আলোকে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিচ্ছি:


১. সুদের কঠোর নিষেধাজ্ঞা:

সুদ (রিবা) ইসলামের চোখে একটি জঘন্য গুনাহ। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَذَرُوا مَا بَقِيَ مِنَ الرِّبَا إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ "হে ঈমানদারগণ! আল্লাহকে ভয় কর এবং সুদের যা বাকি আছে তা ছেড়ে দাও, যদি তোমরা মুমিন হয়ে থাকো।" (সূরা আল-বাকারা, ২:২৭৮)

অন্য আয়াতে আল্লাহ সুদখোরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন:

فَإِنْ لَمْ تَفْعَلُوا فَأْذَنُوا بِحَرْبٍ مِنَ اللَّهِ وَرَسُولِهِ "যদি তোমরা তা না করো, তবে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের পক্ষ থেকে যুদ্ধের ঘোষণা জেনে নাও।" (সূরা আল-বাকারা, ২:২৭৯)

আপনার মায়ের জন্য এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসা খুবই জরুরি। তবে তিনি যদি ইতিমধ্যেই সুদের ঋণে জড়িয়ে পড়ে থাকেন, তাহলে এখন করণীয় হলো:

  1. তওবা করা: আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা এবং ভবিষ্যতে সুদ থেকে বিরত থাকার দৃঢ় সংকল্প করা।
  2. ঋণ পরিশোধ করা: যত দ্রুত সম্ভব মূল ঋণ ও সাথে যা অতিরিক্ত (সুদ) ধার্য হয়েছে তা পরিশোধ করে দেওয়া। কিন্তু শরিয়তের দৃষ্টিতে শুধু মূল টাকা পরিশোধ করাই যথেষ্ট; বাড়তি অংশ (সুদ) দেওয়া জরুরি নয়, বরং তা গ্রহণ করাও হারাম। তবে যদি এতেই ঋণমুক্ত হওয়া সম্ভব হয়, তবে তা করতে হবে।

২. হালাল টাকা দিয়ে সুদের ঋণ পরিশোধ করার বিধান:

আপনার মায়ের ঋণ পরিশোধ করার জন্য আপনার উপার্জিত হালাল টাকা ব্যবহার করা সম্পূর্ণ জায়েজ। কারণ:

  • ঋণ পরিশোধ করা একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব: ঋণ পরিশোধ না করলে তা বাড়তে থাকে এবং উত্তমর্ণের জন্য কষ্ট হয়। ইসলাম ঋণ পরিশোধের নির্দেশ দিয়েছে। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন:

مَنْ أَخَذَ أَمْوَالَ النَّاسِ يُرِيدُ أَدَاءَهَا أَدَّى اللَّهُ عَنْهُ، وَمَنْ أَخَذَ يُرِيدُ إِتْلاَفَهَا أَتْلَفَهُ اللَّهُ "যে ব্যক্তি মানুষের সম্পদ পরিশোধ করার নিয়তে গ্রহণ করে, আল্লাহ তার পক্ষ থেকে তা আদায় করে দেন। আর যে বিনষ্ট করার নিয়তে গ্রহণ করে, আল্লাহ তাকে বিনষ্ট করেন।" (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৩৮৭)

  • গুনাহ কমিয়ে সুদের শৃঙ্খল থেকে মুক্তি: আপনি যদি ঋণ পরিশোধ না করেন, তবে সুদ বাড়তেই থাকবে এবং গুনাহও বাড়তে থাকবে। হালাল টাকা দিয়ে ঋণ পরিশোধ করলে আপনি আপনার মাকে সেই গুনাহ থেকে বের করে আনছেন।

তবে আপনি তওবা অব্যাহত রাখবেন।

  • হানাফি ফিকহের দলিল: হানাফি ফিকহের বিশুদ্ধ মতানুসারে, হারাম উপার্জন (যেমন সুদ) দিয়ে দান-সদকা বা কোনো পুণ্যের কাজ করা জায়েজ নয়। কিন্তু হালাল উপার্জন দিয়ে হারাম বস্তু (যেমন সুদ) পরিশোধ করা জায়েজ। কেননা এখানে উদ্দেশ্য হলো আরও হারামের পথ রুদ্ধ করা।

    ইমাম ইবনে আবিদীন (رحمة الله) রাদ্দুল মুহতার গ্রন্থে বলেন:

    وَإِذَا كَانَ الدَّيْنُ رِبًا فَأَدَّاهُ مِنْ مَالٍ حَلَالٍ جَازَ وَبَرِئَتْ ذِمَّتُهُ "যখন ঋণটি সুদের হয়, এবং সে তা হালাল মাল দিয়ে আদায় করে, তবে তা জায়েজ হবে এবং তার দায়মুক্তি হবে।" (রাদ্দুল মুহতার, ৫/২৬৮)

    আল্লামা শামী (رحمة الله) আরও বলেন:

    لَا بَأْسَ بِأَنْ يُؤَدِّيَ الرَّجُلُ دَيْنَ الرِّبَا مِنْ مَالٍ حَلَالٍ "কোনো ব্যক্তি তার সুদের ঋণ হালাল মাল দিয়ে পরিশোধ করলে তাতে কোনো দোষ নেই।" (ফাতহুল কাদীর, ৮/২৭৪)

  • ফাতাওয়া উসমানি ও ইমদাদুল ফাতাওয়া:

    • হযরত মাওলানা মুফতি মুহাম্মদ শফী (رحمة الله) ফাতাওয়া উসমানি তে বলেন, সুদের ঋণ পরিশোধের জন্য হালাল টাকা ব্যবহার করা জায়েজ। এর মাধ্যমে ঋণমুক্তি হবে এবং গুনাহ কমবে।
    • হযরত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী (رحمة الله) ইমদাদুল ফাতাওয়ায় বলেন, যদি কেউ সুদখোরের কাছ থেকে সুদ পরিশোধের জন্য তার হালাল টাকা দিয়ে মূল টাকা শোধ করে দেয়, তাহলে তার জন্য তা জায়েজ এবং উত্তম।

৩. আপনার মায়ের অবস্থার জন্য কিছু পরামর্শ:

  1. সুদ আদায়কারীদের সাথে আলোচনা করুন: দেখার চেষ্টা করুন তারা মূল টাকা নিয়ে সন্তুষ্ট হন কিনা এবং বাড়তি অংশ (সুদ) মাফ করে দেন। অনেক সময় নিয়মিত ডিফল্ট হলে বা আর্থিক সংকট দেখালে তারা মূল টাকা নিয়ে ছাড় দেয়।
  2. আপনার মায়ের জন্য দোয়া করুন: আল্লাহ তার এই কঠিন অবস্থা থেকে উত্তরণের পথ বের করে দেবেন।
  3. ভবিষ্যতে সুদ থেকে দূরে থাকুন: যে কোনো ধরনের সুদের লেনদেন থেকে বিরত থাকার চেষ্টা করুন। আপনার মাকেও বুঝিয়ে বলুন, সুদ শুধু জাগতিক নয়, আখিরাতেও কঠিন শাস্তির কারণ।

প্রশ্ন: যদি পরিশোধ না করা হয় তাহলে সেটা শেষ হবে কী ভাবে? সেটা তো বাড়তেই থাকবে?

আপনি সম্পূর্ণ সঠিক বলেছেন। যদি ঋণ পরিশোধ না করা হয়, তবে সুদের কিস্তি বা মূল টাকা বাড়তে থাকবে এবং এটি একটি দুষ্টচক্র তৈরি করবে। এই অবস্থা থেকে বের হওয়ার একমাত্র উপায় হলো ঋণ পরিশোধ করা। তাই আপনারা যে হালাল টাকা উপার্জন করছেন, তা দিয়ে যতটুকু সম্ভব ঋণ শোধ করতে থাকুন। এটি বৈধ এবং প্রশংসনীয় কাজ।


সারসংক্ষেপ:

| বিষয় | বিধান | |------|-------| | আপনার মায়ের সুদের ঋণ | হারাম কাজ, তবে তিনি ভুল করে ফেলেছেন; এখন তওবা ও ঋণ পরিশোধ জরুরি | | আপনাদের হালাল টাকা দিয়ে সেই ঋণ পরিশোধ করা যাবে। এক্ষেত্রে মহান আল্লাহর কাছে তওবা করা অব্যাহত রাখবেন

| উত্তম পন্থা | সুদ আদায়কারীদের সাথে মূল টাকা শোধ করার চেষ্টা করুন; সম্ভব হলে সুদ মাফ করিয়ে নিন; না পারলে হালাল টাকা দিয়ে শোধ করুন |

**অতএব, আপনারা আপনাদের হালাল উপার্জন দিয়ে মায়ের সুদের ঋণ পরিশোধ করতে পারেন। এক্ষেত্রে মহান আল্লাহর কাছে তওবা করা অব্যাহত রাখবেন।

আল্লাহ সর্বজ্ঞ।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.