লেনদেন, মান্নত, নামাজ,ফরজ গোসল, তালাক সম্পর্কে জানতে চাই?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
প্রশ্ন২. কোনো এক ব্যক্তি যদি কোনো দোকানদারকে এক ফুট প্লাস্টিক টিন কত টাকা করে বিক্রি করে জিজ্ঞাস করে? তখন দোকানদার যদি তাকে ২০০ টাকা ফুট ধরে বিক্রি করে বলে, তাহলে পরবর্তীতে অন্য কারো কাছে এই প্লাস্টিক টিন এক ফুট ২৩০ টাকা করে বিক্রি করলে কি দোকানদারের ইমান চলে যাবে কি?প্রশ্ন৩. ফরজ গোসল করার সময় কথা বললে ফরজ গোসল সহীহ হবে কি?
প্রশ্ন৪. কোনো ব্যক্তির নফস যদি মনে মনে বলে " তুমি কি তুমার স্ত্রীকে তালাক দিতেছ?" আর তার নফসের প্রশ্নের উত্তরে সেই ব্যক্তি যদি মুখে "হ্যা" বলে তাহলে কি সেই ব্যক্তির স্ত্রী তালাক হয়ে যাবে কি?
প্রশ্ন৫.কোনো ব্যক্তির নফস যদি মনে মনে বলে "তুমি কি তুমার স্ত্রীকে তালাক দিতেছ?" আর তার নফসের প্রশ্নের উত্তরে সেই ব্যক্তি যদি মাথা নিচের দিকে নুয়ে সম্মতি প্রকাশ করে তাহলে কি সেই ব্যক্তির স্ত্রী তালাক হয়ে যাবে কি?
প্রশ্ন৬. কেউ যদি মান্নত করে তার ছেলে সন্তান হলে ১০ জন গরীবকে খাওয়াবে, কিন্তু ছেলে সন্তান জন্ম হওয়ার পরে যদি ১০ জন গরীবে না খাওয়ায় ও মান্নত ভঙ্গ করার কাফফারাও না দেয় তাহলে কি তার ছেলে সন্তানটি কি অবৈধ হয়ে যাবে কি ও ত্যাজ্যপুত্র হয়ে যাবে কি?
প্রশ্ন৭. বাচ্চা জন্মের পর বাচ্চার চুল মুণ্ডনের আগে ও নাভি পড়ার আগে বাচ্চা কোলে নিলে কি নামাজ পড়া যাবে কি?
প্রশ্ন৮: বিক্রাতার সম্মতিতে কিনা পন্য ফিরত দিলে সেটা কি জায়েজ হবে?
প্রশ্ন৯: কাউকে যদি কোনো কাজের বিনিময়ে ১০০ টাকা দেওয়ার কথা বলে যদি তার চেয়ে কম দেয় তাহলে কি ইমান চলে যাবে কি?
প্রশ্ন১০: ফরজ গোসলের সময় কথা বললে ফরজ গোসল সহিহ হবে কি?
Answer
উত্তর
প্রশ্ন ১ ও ২: ভিন্ন ভিন্ন গ্রাহকের কাছে ভিন্ন দামে পণ্য বিক্রি
উত্তর: দোকানদার যদি কোনো গ্রাহককে একটি পণ্যের দাম জিজ্ঞাসা করলে তা জানিয়ে দেয় এবং সেই গ্রাহক না কেনার পর অন্য কারও কাছে অধিক মূল্যে বিক্রি করে, তাহলে তা জায়েজ আছে এবং এতে ইমান চলে যাওয়ার কোনো প্রশ্ন নেই। ইমান হারানোর বিষয়টি শুধুমাত্র কুফরি ও শিরকের মতো বড় অপরাধের সাথে সম্পর্কিত। বেচাকেনায় ভিন্ন মূল্যে বিক্রি করা জায়েজ, তবে ধোঁকা বা মিথ্যা বলা নিষিদ্ধ।
তথ্যসূত্র:
- রদ্দুল মুহতার (৪/৫৬): "এক পণ্য ভিন্ন ভিন্ন ক্রেতাকে ভিন্ন মূল্যে বিক্রি করা জায়েজ, যদি কোনো প্রতারণা না থাকে।"
- ফাতাওয়া হিন্দিয়া (৩/১৮৬): "দোকানদার নিজ ইচ্ছায় যেকোনো মূল্যে পণ্য বিক্রি করতে পারে, যতক্ষণ না তা ধোঁকাবাজি হয়।"
প্রশ্ন ৩ ও ১০: ফরজ গোসলের সময় কথা বলা
উত্তর: ফরজ গোসলের সময় কথা বললে গোসল সহীহ হবে। তবে এটি মাকরূহ (অপছন্দনীয়) কারণ গোসলের আদব এর বিপরীত। গোসলের ফরজ কাজ (সমস্ত শরীরে পানি পৌঁছানো) সম্পন্ন হলে গোসল শুদ্ধ হবে।
তথ্যসূত্র:
- আল-হিদায়া (১/২১): "গোসলের সময় কথা বলা মাকরূহ, কিন্তু গোসল নষ্ট হয় না।"
- ফাতাওয়া উসমানী (১/২৩৪): "গোসলের সময় কথা বলা গোসলের জন্য ক্ষতিকর নয়।"
প্রশ্ন ৪ ও ৫: মনে মনে তালাকের প্রশ্নের উত্তর দেওয়া বা মাথা নেড়ে সম্মতি
উত্তর:
- প্রশ্ন ৪: নিজের নফসের প্রশ্নের উত্তরে মুখে "হ্যা" বললে তালাক হবে না, কারণ তা স্ত্রীর কাছে তালাক ইচ্ছা প্রকাশ নয়; বরং আত্মগত সংলাপ মাত্র। তালাক কার্যকর হতে হলে স্ত্রীর উদ্দেশ্যে বা তার সামনে স্পষ্ট শব্দে বলতে হবে।
- প্রশ্ন ৫: শুধু মাথা নেড়ে সম্মতি জানালেও তালাক হবে না, কারণ কথা বলতে সক্ষম ব্যক্তির জন্য ইশারা-ইঙ্গিত তালাকের জন্য যথেষ্ট নয়।
তথ্যসূত্র:
- রদ্দুল মুহতার (৩/২৫৪): "তালাকের জন্য স্পষ্ট উচ্চারণ বা লিখিত বিবৃতি আবশ্যক। নিজের সাথে নিজের কথা বললে তালাক হয় না।"
- ফাতাওয়া হিন্দিয়া (১/৩৫২): "ইশারায় তালাক শুধুমাত্র বাকরুদ্ধ ব্যক্তির জন্য কার্যকর।"
প্রশ্ন ৬: মান্নত ভঙ্গ করলে সন্তানের বৈধতা
উত্তর: মান্নত ভঙ্গ করলে সন্তানের বৈধতা কিংবা ত্যাজ্যপুত্র হওয়ার কোনো সম্পর্ক নেই। সন্তান পূর্ণ বৈধ ও পিতার উত্তরাধিকারী থাকবে। তবে মান্নত ভঙ্গকারীর ওপর গুনাহ হয় এবং তাকে কাফফারা দিতে হবে (১০ জন মিসকীনকে খাওয়ানো বা ৩ দিন রোজা)।
তথ্যসূত্র:
- ফাতাওয়া হিন্দিয়া (১/২৭৫): "মান্নত পূর্ণ না করলে কাফফারা ওয়াজিব, কিন্তু সন্তানের ওপর এর কোনো প্রভাব নেই।"
- বাহিশতি জেওর (৩/১২): "মান্নত ভঙ্গ করলে সন্তান অবৈধ হয় না।"
প্রশ্ন ৭: বাচ্চা কোলে নিয়ে নামাজ পড়া
উত্তর: বাচ্চা কোলে নিয়ে নামাজ পড়া জায়েজ, তবে শর্ত হলো বাচ্চা পবিত্র (নাপাকি মুক্ত) হবে এবং নামাজে বিঘ্ন না ঘটে। বাচ্চার চুল মুণ্ডন বা নাভি পড়ার আগে-পরে কোনো পার্থক্য নেই। ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর মতে, নামাজের মধ্যে বাচ্চা ধারণ করা মাকরূহ তানযিহি, কিন্তু নামাজ সহীহ।
তথ্যসূত্র:
- রদ্দুল মুহতার (১/৬৫৫): "বাচ্চা কোলে নিয়ে নামাজ পড়া জায়েজ, তবে অযথা না করা ভালো।"
- আল-মারগীনানী, আল-হিদায়া (১/১২৪): "নামাজের মধ্যে বাচ্চা ধারণ করলে নামাজ নষ্ট হয় না।"
প্রশ্ন ৮: বিক্রেতার সম্মতিতে পণ্য ফেরত দেওয়া
উত্তর: ক্রেতা যদি পণ্য ফেরত দিতে চায় এবং বিক্রেতা সম্মত হন, তাহলে তা জায়েজ। একে ইসলামী ফিকহে "ইকালা" বলে। উভয়ের সম্মতিতে ক্রয়-বিক্রয় রদ করা বৈধ।
তথ্যসূত্র:
- সহীহ বুখারী (হাদীস ২০৯৬): "যে ব্যক্তি পণ্য ফেরত চায়, বিক্রেতা তার সাথে ইকালা করুক।"
- ফাতাওয়া আলমগীরী (৩/১৫৮): "উভয়ের সম্মতিতে পণ্য ফেরত নেওয়া জায়েজ।"
প্রশ্ন ৯: কাজের বিনিময়ে কম টাকা দেওয়া
উত্তর: কারও সাথে কাজের বিনিময়ে নির্দিষ্ট টাকা দেওয়ার কথা বলে পরে কম দেওয়া গুনাহের কাজ, কিন্তু এতে ইমান চলে যায় না। ইমান হারানোর বিষয়টি কুফরি ও শিরকের সাথে জড়িত। তবে কম দেওয়া জুলুম, তাই ন্যায্য মূল্য পরিশোধ করতে হবে। যদি কোনো চুক্তি না থাকে, তাহলে প্রচলিত মজুরি দিতে হবে।
তথ্যসূত্র:
- কুরআন (সূরা বাকারা, ২:২৮৮): "তোমরা প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করো।"
- ফাতাওয়া উসমানী (২/৪৫০): "প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ গুনাহ, কিন্তু ইমান নষ্ট হয় না।"
সারসংক্ষেপ
- বেচাকেনায় ভিন্ন দাম জায়েজ, ইমান যায় না।
- গোসলের সময় কথা বললে গোসল সহীহ।
- নিজের সাথে নিজের তালাকের সংলাপে তালাক হয় না।
- মান্নত ভঙ্গে সন্তান বৈধ থাকে।
- বাচ্চা কোলে নামাজ জায়েজ।
- সম্মতিতে পণ্য ফেরত জায়েজ।
- কাজের মূল্য কম দেওয়া গুনাহ, ইমান যায় না।
সতর্কীকরণ: এটি সাধারণ ফতোয়া; বাস্তব জীবনের জটিল পরিস্থিতিতে স্থানীয় মুফতির সাথে পরামর্শ করুন।