দাদীর পিতার সম্পদ নেওয়া জায়েজ কিনা, কাকার চাপ ও হুমকির মুখে করণীয় কি?
Halal and Haram · Hanafi
Question
মামা বাড়ির লোকজন আপোষে সম্পদ দিবেনা। আইনি ভাবেই এটা আনবে কাকা।
২. আমার দাদীর মার কিছু সম্পদ মিঊটেশন/ নামজারী করলেই চলে আসবে। এখন সে আগে মারা গেছে কিনা জানা নেই। এটা কি আনা জায়েজ হবে?
Answer
উত্তর দেওয়ার আগে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা:
প্রশ্নকারী ভাই/বোন, আপনার প্রশ্ন দুটি গুরুত্বপূর্ণ ফিকহি মাসআলার ওপর ভিত্তি করে গঠিত। আমি হানাফি মাযহাবের নির্ভরযোগ্য কিতাবের আলোকে বিস্তারিত উত্তর দেব। ইন শা আল্লাহ।
মূল উত্তর:
প্রথম অংশ: দাদীর পিতার সম্পদ (যেখানে দাদী পিতার আগে মারা গেছেন)
মূলনীতি: ইসলামী শরিয়তে মৃত ব্যক্তির সম্পদ বণ্টনের নিয়ম কুরআন-হাদিস দ্বারা নির্ধারিত। কেউ যদি কোনো ওয়ারিশের মৃত্যুর আগেই মারা যায়, তাহলে সে ঐ মৃত ব্যক্তির সম্পদে কোনো অধিকার রাখে না। তাই আপনার দাদী যেহেতু তার পিতার আগে মারা গেছেন, সেহেতু দাদীর পিতার সম্পদে দাদীর কোনো শরীয়তী অংশ নেই। ফলে আপনার কাকা বা আপনার পরিবারের অন্য কেউ সেই সম্পদ শরীয়তী আইনে পেতে পারেন না।
আপনার কাকার যুক্তির জবাব:
আপনার কাকা বলছেন, "মুসলিম শাসক যখন জনগণের কল্যাণে আইন করে, তখন তা পালন করতে সমস্যা নেই।" কিন্তু এখানে কয়েকটি বিষয় খেয়াল রাখতে হবে:
-
বর্তমান দেশের আইন ইসলামী শরিয়তের বিপরীত: যে দেশে আপনি বসবাস করছেন (বাংলাদেশ বা অন্য কোনো দেশ), সেখানকার প্রচলিত আইন যদি ইসলামী শরিয়তের (ফারায়েজ) বিপরীত হয়, তাহলে তা মুসলিমের জন্য অনুসরণ করা জায়েজ নয়। কারণ আল্লাহ বলেছেন:
"আর যে আল্লাহ যা নাজিল করেছেন তদনুসারে ফয়সালা করে না, তারা কাফির।" (সূরা মায়িদা: ৪৪) -
মুসলিম শাসকের আইনের শর্ত: মুসলিম শাসক যদি কোনো আইন করেন, তবে তা হতে হবে শরিয়তের পরিপন্থী নয় এবং জনগণের কল্যাণের জন্য। কিন্তু এখানে উক্ত আইনটি সরাসরি কুরআনের ফারায়েজের (যেমন সূরা নিসা ১১-১২) বিরোধী। তাই তা মানা জায়েজ নয়। (ইবনে আবিদীন, রদ্দুল মুহতার ৪/৩৪৫; ফাতাওয়া উসমানী ২/২৭৫)
-
জবরদস্তি ও হুমকির প্রভাব:
- আপনার কাকা যদি চাপ দেয়, সম্পর্কচ্ছেদের হুমকি দেয় বা ক্ষতির ভয় দেখায়, তবে এ অবস্থায় শরীয়ত অত্যাবশ্যকীয় প্রয়োজনে (যারুরাত) কিছু ছাড় দেয়। কিন্তু সম্পদ হালাল করার জন্য জবরদস্তি যথেষ্ট নয়। বরং আপনি যদি ভয় পান যে তিনি আপনাকে শারীরিকভাবে ক্ষতি করবেন বা আপনার প্রাণনাশের আশঙ্কা থাকে, তাহলে আপনি বাহ্যিকভাবে সম্পদ নিতে পারেন, কিন্তু নিয়ে অবশ্যই তা প্রকৃত হকদারদের (যারা শরীয়তী উত্তরাধিকারী) কাছে পৌঁছে দিতে হবে। আপনি নিজে তা ভোগ করতে পারবেন না।
(ইমদাদুল ফাতাওয়া ৫/২৯২; ফাতাওয়া শামী ৬/৩৪৬)
- আপনার কাকা যদি চাপ দেয়, সম্পর্কচ্ছেদের হুমকি দেয় বা ক্ষতির ভয় দেখায়, তবে এ অবস্থায় শরীয়ত অত্যাবশ্যকীয় প্রয়োজনে (যারুরাত) কিছু ছাড় দেয়। কিন্তু সম্পদ হালাল করার জন্য জবরদস্তি যথেষ্ট নয়। বরং আপনি যদি ভয় পান যে তিনি আপনাকে শারীরিকভাবে ক্ষতি করবেন বা আপনার প্রাণনাশের আশঙ্কা থাকে, তাহলে আপনি বাহ্যিকভাবে সম্পদ নিতে পারেন, কিন্তু নিয়ে অবশ্যই তা প্রকৃত হকদারদের (যারা শরীয়তী উত্তরাধিকারী) কাছে পৌঁছে দিতে হবে। আপনি নিজে তা ভোগ করতে পারবেন না।
করণীয়:
- আপনার কাকাকে বোঝানোর চেষ্টা করুন যে ইসলামী আইন অনুযায়ী দাদী মৃত থাকায় তার কোনো অংশ নেই। তাই সেই সম্পদ নেওয়া হারাম।
- যদি তিনি না শোনেন, তাহলে আপনি নিজে সেই সম্পদ নেওয়ার জন্য আইনি পদক্ষেপ নেবেন না। বরং যদি আদালতের রায় হয়, তাহলে আদালতকে জানিয়ে দিন যে শরীয়ত অনুযায়ী আপনি তা নিতে রাজি নন।
- সম্পর্ক রক্ষার জন্য আপনি কাকাকে অন্য কোনো উপায়ে সাহায্য করতে পারেন, কিন্তু হারাম সম্পদ গ্রহণ করে নয়।
দ্বিতীয় অংশ: দাদীর মায়ের সম্পদ (যেখানে জানা নেই কে আগে মারা গেছেন)
মূলনীতি: মিরাসের ক্ষেত্রে মৃত্যুর সময় নির্ধারণ করা জরুরি।
- যদি দাদী তার মায়ের আগে মারা যান, তাহলে দাদীর মায়ের সম্পদে দাদীর কোনো অংশ নেই। ফলে দাদীর ওয়ারিশরা (আপনার বাবা, কাকা ইত্যাদি) সেই সম্পদ পাবেন না।
- যদি দাদী তার মায়ের পর মারা যান, তাহলে দাদী তার মায়ের সম্পদের ওয়ারিশ হবেন। তারপর দাদী মারা গেলে সে সম্পদ দাদীর ওয়ারিশদের (আপনার বাবা, কাকা, আপনারা) মধ্যে বণ্টিত হবে।
যেহেতু এটা জানা নেই, তাই সন্দেহযুক্ত অবস্থায় তা গ্রহণ করা জায়েজ নয়। বরং মৃত্যুর সঠিক সময় যাচাই করতে হবে (জন্ম-মৃত্যুর সার্টিফিকেট, পারিবারিক স্মৃতি ইত্যাদি)। যদি যাচাই না সম্ভব হয়, তাহলে উভয় সম্ভাবনা বিবেচনা করে সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত এবং সেই সম্পদ নেওয়া থেকে বিরত থাকা। (আল-হিদায়া ৩/২৯০; ফাতাওয়া আলমগীরী ৬/৪৫২)
মিউটেশন/নামজারির মাধ্যমে আনার ব্যাপারে:
সরকারি নামজারি বা মিউটেশন সম্পদের মালিকানা নির্ধারণ করে না, বরং তা জমির রেকর্ড আপডেট করে। শরীয়তী মালিকানা নির্ধারিত হয় মিরাসের নিয়মে। তাই নামজারি করলেই সম্পদ হালাল হবে না, যদি শরীয়তী হকদার না হন।
সারসংক্ষেপ ও পরামর্শ:
-
প্রথম সম্পদ (দাদীর পিতার):
- নেওয়া জায়েজ নয়, কারণ শরীয়তী কোনো অধিকার নেই।
- কাকার চাপ ও হুমকির কারণে বাধ্য হলে নিতে পারেন, কিন্তু সেটি নিজে ভোগ না করে প্রকৃত শরীয়তী ওয়ারিশদের দিয়ে দিন।
- সম্পর্ক রক্ষার বিকল্প উপায় খুঁজুন (যেমন নিজের টাকা থেকে কিছু সহায়তা, কিন্তু হারাম সম্পদের মাধ্যমে নয়)।
-
দ্বিতীয় সম্পদ (দাদীর মায়ের):
- প্রথমে মৃত্যুর সময় নিশ্চিত করুন।
- যদি নিশ্চিত না হয়, তাহলে তা নেওয়া থেকে বিরত থাকাই উত্তম।
- নামজারি করলেই হালাল হবে না।
সর্বোত্তম পথ:
আল্লাহকে ভয় করুন এবং কাকাকে নরম ভাষায় বুঝান। যদি তিনি ক্ষতি করার হুমকি দেন, তাহলে স্থানীয় মসজিদের ইমাম বা আলেমের মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করুন। প্রয়োজনে আইনগত সাহায্য নিন। হারাম সম্পদ আখিরাতে বড় ক্ষতি ডেকে আনবে।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সঠিক পথ দেখান।
প্রয়োজনীয় রেফারেন্স:
- রদ্দুল মুহতার (শামী): ৪/৩৪৫, ৬/৩৪৬ (জবরদস্তির ক্ষেত্রে সম্পদ নেওয়ার নিয়ম)
- ইমদাদুল ফাতাওয়া: ৫/২৯২ (হারাম সম্পদ গ্রহণে বাধ্য হলে করণীয়)
- ফাতাওয়া উসমানী: ২/২৭০-২৭৫ (মুসলিম শাসকের আইন ও শরীয়তের সম্পর্ক)
- আল-হিদায়া: ৩/২৯০ (মিরাসে মৃত্যুর সময় নির্ণয়)
- ফাতাওয়া আলমগীরী: ৬/৪৫২ (সন্দেহযুক্ত সম্পদ নেওয়ার বিধান)
- মাআরিফুল কুরআন: সূরা নিসা ৭-১২ তাফসির (মিরাসের আয়াত)
- বেহেশতি জেওর: ৬ষ্ঠ খণ্ড, মিরাস অধ্যায়