স্বপ্নে নানুকে আম দেওয়া, স্বপ্নে মেয়ে শিশু দেখা, স্বপ্নে মামা-ভাই নেহারু খাওয়া, ইত্যাদির ব্যাখ্যা জানতে চাই?
Miscellaneous Fiqh · Ahle Hadith / Salafi
Question
আজ সকালে ভীষণ মন খারাপ নিয়ে সূরা বাকারার অবশিষ্ট অংশ পড়ে খতম দেই এবং পড়ার সময় চিন্তা করছিলাম- 'আল্লাহ আমার দাম্পত্য জীবন ও ক্যারিয়ার সব ই এখন জীবন - মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে। আমার কাছে আর কিছুই নেই'। পড়া শেষে খুব কান্নাকাটি তে ক্লান্ত হয়ে ইস্তেগফার করতে করতে ঘুমিয়ে যাই।
স্বপ্নে দেখি-- যেখানে শুয়ে ছিলাম, ঠিক আমার পায়ের কাছেই নানুকে আমার ভাগের বড় পাকা আমটা দিয়ে দেই এবং তিনি দুই হাতে সেটা খাচ্ছেন এবং তার পাশে ৩-৪ টা মেয়ে শিশু ( কাঠাল- মুড়ি জাতীয় কিছু) খাচ্ছে। দুইজন আমার দিকে তাকিয়ে হাসছে। স্বপ্নে রুম থেকে বের হতেই দেখি আমার মামা আর মামাতো ভাই ফ্লোরে বসে দুইটা বড় নেহারু খাচ্ছে। স্বপ্নেই ভাবছিলাম আমাদের বাসায় এত নেহারু কেন!
প্রিয় শায়েখ,হতে পারে আমার স্বপ্ন আপনার কাছে কিছুটা হাস্যকর। জানিনা,,আল্লাহ তালা আমার জীবন ও ভাগ্যকে কোন দিকে নিয়ে যাচ্ছেন। অনেক দোয়া ও চেষ্টার পরও পরিস্থিতি একই রকম।আপনাদের কাছে আমি অনেক দোয়া প্রার্থী। এ স্বপ্নের ব্যাখ্যা প্রদানে আপনার নিকট কৃতজ্ঞ থাকব।
Answer
উত্তর:
ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
প্রথমেই জেনে রাখা জরুরি যে, ইসলামে স্বপ্নের ব্যাখ্যা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, তবে সব স্বপ্নের ব্যাখ্যা দেওয়া জরুরি নয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “স্বপ্ন তিন প্রকার: (১) আল্লাহর পক্ষ থেকে সুসংবাদ, (২) শয়তানের পক্ষ থেকে ভীতি প্রদর্শন, (৩) মানুষের নিজের মনের কল্পনা ও চিন্তা-ভাবনা।” (সহীহ বুখারী: ৭০১৭, সহীহ মুসলিম: ২২৬৩)
আপনার বর্তমান অবস্থা (দাম্পত্য কলহ, মানসিক চাপ, কান্নাকাটি, সূরা বাকারা পড়ে ইস্তিগফার করে ঘুমানো) থেকে মনে হচ্ছে, এই স্বপ্নটি মূলত আপনার মনের চিন্তা-ভাবনার প্রতিফলন। আপনি যখন ঘুমানোর আগে দাম্পত্য সমস্যা, সন্তান ও ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন, তখন সেই চিন্তাই স্বপ্নে আকার নিয়েছে। তাই এই স্বপ্নকে খুব গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজন নেই। বরং ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.) বলেছেন: “যে ব্যক্তি স্বপ্নের প্রতি অতিরিক্ত গুরুত্ব দেয় এবং তার ব্যাখ্যা নিয়ে মাথা ঘামায়, সে প্রায়শই বিভ্রান্তির শিকার হয়।” (মাদারিজুস সালিকীন: ১/৫০)
তবে আপনার বর্ণিত স্বপ্নের কিছু উপাদান (যেমন- নানুকে পাকা আম দেওয়া, মেয়ে শিশুদের খেতে দেখা, মামা-ভাইকে নেহারু খেতে দেখা) এর কোনো নির্দিষ্ট ইসলামী ব্যাখ্যা নেই। কারণ এ ধরনের প্রতীকী বস্তুর ব্যাখ্যা কুরআন ও সহীহ হাদীসের আলোকে করা যায় না। শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রহ.) বলেছেন: “স্বপ্নের ব্যাখ্যা শুধুমাত্র নবী, অথবা অত্যন্ত জ্ঞানী ও আল্লাহভীরু ব্যক্তিই করতে পারেন; অন্যথায় তা অনুমান ও ভুলের শিকার হয়।” (মাজমুঊল ফাতাওয়া: ১১/৩৫৫)
সেহেতু আপনার করণীয়:
১. স্বপ্নকে অবহেলা করুন:
যেহেতু স্বপ্নটি আপনার দুশ্চিন্তার ফল, তাই এতে কোনো ভয় বা আশার কারণ নেই। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “যদি কেউ এমন স্বপ্ন দেখে যা সে অপছন্দ করে, তবে সে যেন তার বাঁ দিকে তিনবার থুথু ফেলে, তিনবার শয়তান থেকে আশ্রয় চায়, এবং যে পাশে শুয়েছিল তা পরিবর্তন করে। তাহলে স্বপ্ন তার কোনো ক্ষতি করবে না।” (সহীহ মুসলিম: ২২৬২)
২. দাম্পত্য সমস্যার সমাধানে চেষ্টা চালিয়ে যান:
আপনি লিখেছেন, অনেক দোয়া ও চেষ্টার পরও পরিস্থিতি একই। এখানে ধৈর্য ও একাগ্রতার সাথে নিম্নলিখিত আমলগুলো করুন:
- সূরা বাকারা পড়া চালিয়ে যান: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “তোমরা তোমাদের ঘরগুলোকে কবর বানিও না। নিশ্চয়ই যে ঘরে সূরা বাকারা পড়া হয়, শয়তান সে ঘর থেকে পালিয়ে যায়।” (সহীহ মুসলিম: ৭৮০)
- ইস্তিগফার (ক্ষমা প্রার্থনা) বেশি করুন: আল্লাহ বলেন: “তোমরা তোমাদের রবের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা কর; নিশ্চয় তিনি অত্যন্ত ক্ষমাশীল। তিনি তোমাদের ওপর আকাশ থেকে প্রচুর বৃষ্টি বর্ষণ করবেন, তোমাদের সম্পদ ও সন্তানে সমৃদ্ধি দেবেন, তোমাদের জন্য বাগবাগিচা সৃষ্টি করবেন এবং নদী-নালা প্রবাহিত করবেন।” (সূরা নূহ: ১০-১২)
- দোয়া করুন: বিশেষ করে রাতের শেষ ভাগে (তাহাজ্জুদের সময়) কান্নাকাটি করে দোয়া করুন। দুআর সময় নিশ্চিত থাকুন, আল্লাহ আপনাকে উত্তম পথ দেখাবেন।
৩. স্বপ্নের ব্যাখ্যা না চাওয়াই উত্তম:
শায়খ ইবনে বায (রহ.) ও শায়খ আলবানী (রহ.)-এর মত অনুযায়ী, সাধারণ মানুষের উচিত স্বপ্নের ব্যাখ্যা নিয়ে মাথা না ঘামানো, বরং ভালো স্বপ্ন দেখলে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করা এবং মন্দ স্বপ্ন দেখলে তা উপেক্ষা করা। (আলবানী, সিলসিলা সহীহা: ১/৮০)
৪. পারিবারিক ও পেশাগত পরামর্শ নিন:
দাম্পত্য সমস্যার সমাধানে কোনো বিজ্ঞ আলেম বা অভিজ্ঞ ব্যক্তির শরণাপন্ন হোন। পেশাগত ক্যারিয়ারের জন্যও একজন অভিজ্ঞের পরামর্শ নিন। আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল (ভরসা) রেখে সর্বোচ্চ চেষ্টা করুন।
শেষ কথা:
আপনার স্বপ্ন হাস্যকর নয়; বরং এটি আপনার দুশ্চিন্তার প্রতিচ্ছবি। আল্লাহ আপনাকে ধৈর্য দিন এবং আপনার দাম্পত্য জীবন ও ক্যারিয়ারে কল্যাণ দিন। মনে রাখবেন, আল্লাহ বলেন: “নিশ্চয়ই কষ্টের সাথে স্বস্তি আছে।” (সূরা ইনশিরাহ: ৫-৬)
আপনার জন্য দোয়া:
رَبَّنَا هَبْ لَنَا مِنْ أَزْوَاجِنَا وَذُرِّيَّاتِنَا قُرَّةَ أَعْيُنٍ وَاجْعَلْنَا لِلْمُتَّقِينَ إِمَامًا
“হে আমাদের রব! আমাদের স্ত্রী ও সন্তানদের মাধ্যমে আমাদের চোখ জুড়িয়ে দিন এবং আমাদের মুত্তাকীদের জন্য আদর্শ করুন।” (সূরা ফুরকান: ৭৪)
আল্লাহই সর্বজ্ঞ।