মেয়েকে ইচ্ছার বিরুদ্ধে বিয়ে দিলে, মেয়ে পরে তালাক দিলে কি পাপ হবে?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
Answer
উত্তর
ওয়া ‘আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
প্রশ্নে বর্ণিত পরিস্থিতিতে ইসলামী শরী‘আহ অনুযায়ী মেয়ে যদি নিজের মুখে কবুল না বলে তাহলে মেয়েটির বিবাহ শুদ্ধ হয়নি, কারণ প্রাপ্তবয়স্কা ও জ্ঞানসম্পন্ন নারীর বিবাহে তার নিজের স্পষ্ট সম্মতি অপরিহার্য। পিতার জোরজবরদস্তি বা ভয়ভীতি দেখিয়ে বিবাহ দেওয়া শরী‘আহসম্মত নয়। নিচে বিস্তারিত দলীল-প্রমাণসহ উত্তর পেশ করা হলো। তবে যদি মেয়ে নিজের মুখে কবুল বলে ফেলে, তাহলে বিবাহ শুদ্ধ হয়ে যাবে।
১. জোরপূর্বক বিবাহের বিধান
কুরআন ও হাদীসে নারীর সম্মতি ছাড়া বিবাহকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন—
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا يَحِلُّ لَكُمْ أَنْ تَرِثُوا النِّسَاءَ كَرْهًا
“হে ঈমানদারগণ! জোরপূর্বক নারীদের উত্তারাধিকারী হওয়া তোমাদের জন্য হালাল নয়।” (সূরা আন-নিসা ৪:১৯)
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন—
لَا تُنْكَحُ الْأَيِّمُ حَتَّى تُسْتَأْمَرَ، وَلَا تُنْكَحُ الْبِكْرُ حَتَّى تُسْتَأْذَنَ
“বিধবা নারীর বিবাহ তার অনুমতি ব্যতীত করা যাবে না, এবং কুমারী নারীর বিবাহ তার সম্মতি ব্যতীত করা যাবে না।” (সহীহ বুখারী, হাদীস: ৫১৩৬; সহীহ মুসলিম, হাদীস: ১৪১৯)
হানাফী ফিক্বাহ অনুযায়ী—
প্রাপ্তবয়স্কা ও সুস্থ মস্তিষ্কের নারীর বিবাহে তার স্পষ্ট সম্মতি জরুরি। পিতা বা অভিভাবক যদি তাকে জোরপূর্বক বিবাহ দেয়, তবে সেই বিবাহ মওকুফ (সাসপেন্ডেড) থাকবে। মেয়ে যদি পরে তা গ্রহণ করে তবে বৈধ হবে, আর যদি প্রত্যাখ্যান করে তবে বিবাহ বাতিল বলে গণ্য হবে।
(রদ্দুল মুহতার, ৩/৫৫; ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/২৯২; ইমদাদুল ফাতাওয়া, ২/২৭৮)
প্রশ্নে উল্লেখ আছে, মেয়েটি ছেলেকে পছন্দ করেনি এবং তা জানানোর পরও পিতা জোর করে বিবাহ দিয়েছে। মেয়েটি শুধু বাবার ভয়ে বিবাহ করেছে কবুল বলেছে—এটি ইকরাহ (জবরদস্তি) এর শামিল। এজন্য বিবাহ শুদ্ধ হলেও বাবার গোনাহ হবে। এবং মেয়ের বিবাহ ভঙ্গের অধিকার অর্জিত হবে।
২. মেয়ে যদি তালাক দিয়ে দেয়, তবে কি তার পাপ হবে?
মেয়েটি নিজে থেকে তালাক দিতে পারে না। স্ত্রী কর্তৃক তালাক ইসলামে স্বীকৃত নয়। বরং সে খুলা বা ফাসখ (বিচারকের মাধ্যমে বিবাহ ভঙ্গ) এর ব্যবস্থা করতে পারে।
কিন্তু প্রশ্নে “মেয়ে তালাক দিয়ে দেয়” বলতে বোঝানো হয়েছে যে, সে বিবাহ থেকে নিজেকে মুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে (হয় স্বামীর সম্মতিতে বা আদালতের মাধ্যমে)।
যেহেতু বিবাহটি তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে জোরপূর্বক করানো হয়েছে, তাই মেয়ের ওপর কোনো পাপ হবে না। বরং পাপ হবে পিতার—যিনি মেয়ের ইচ্ছার বিরুদ্ধে জোর করে বিবাহ দিয়েছেন। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন—
لَا ضَرَرَ وَلَا ضِرَارَ
“নিজের বা অন্যের ক্ষতি করা জায়েয নয়।” (সুনানে ইবনে মাজাহ ২৩৪০)
জোরপূর্বক বিবাহের মাধ্যমে মেয়ের ক্ষতি করা হয়েছে, তাই সে তা থেকে বেরিয়ে আসতে পারে এবং এজন্য তাকে গুনাহগার বলা যাবে না।
(আল-হিদায়া, ২/৩০০; ফাতাওয়া উসমানী, ২/৪৪৫)
৩. মোহরানা ও অন্যান্য জিনিস না নেওয়া
বিবাহ যদি জোরপূর্বক হয় এবং পরে তা বাতিল হয়ে যায়, তাহলে স্ত্রী মোহরানা পাওয়ার অধিকারিণী হবে না যদি দাম্পত্য সম্পর্ক স্থাপিত না হয়। যদি দাম্পত্য সম্পর্ক স্থাপিত হয়ে থাকে (স্বামী-স্ত্রী মিলিত হয়ে থাকেন), তবে তাকে মোহরে মিস্ল (মেয়ের সমপরিমাণ মোহর) দেওয়া ওয়াজিব হবে।
কিন্তু প্রশ্নে মেয়ে মোহরানার টাকা বা কোনো জিনিসই নিজের কাছে রাখেনি। এটি তার পক্ষ থেকে মাফ করে দেওয়া (বা না নেওয়া) হিসেবে গণ্য হবে। ইসলামী শরী‘আহতে কাউকে জোর করে কিছু নিতে বাধ্য করা হয় না। তাই তিনি যদি নিজ ইচ্ছায় কিছু না নেন, তাতে তার কোনো দোষ নেই। বরং এটা তার ত্যাগ ও সহনশীলতার পরিচায়ক।
(ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/২৯৩; রদ্দুল মুহতার, ৩/১১২)
৪. সারসংক্ষেপ ও পরামর্শ
১. মেয়েটি গুনাহগার হবে না; বরং তার পিতা গুনাহগার।
২. মেয়ে চাইলে খুলা বা ফাসখ এর মাধ্যমে বিবাহ থেকে মুক্তি পেতে পারে।
৩. মোহরানা ও অন্যান্য জিনিস না নেওয়ায় কোনো অসুবিধা নেই।
৪. এখন থেকে মেয়ের উচিত দ্বীনের বিধান মেনে চলা এবং ভবিষ্যতে পিতার জোরজবরদস্তি না মানার সাহস রাখা।
আল্লাহ তাআলা তাকে এই সংকট থেকে উত্তরণের তাওফীক দান করুন।
وَاللّٰهُ أَعْلَمُ بِالصَّوَابِ