কপার টি জন্মনিয়ন্ত্রণের জন্য ব্যবহার করা কি জায়েজ হবে?
Miscellaneous Fiqh · Ahle Hadith / Salafi
Question
Answer
উত্তর:
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম। আলহামদুলিল্লাহ ওয়াস সালাতু ওয়াস সালামু ‘আলা রাসূলিল্লাহ।
প্রশ্নকারী বোনের অবস্থা বিবেচনা করে বলা যায়, কপার টি (তামার তৈরি গর্ভনিরোধক যন্ত্র) ব্যবহার করা জায়েজ কি না—এ বিষয়ে সালাফি/আহলে হাদীস বিদ্বানগণের মতামত নিম্নরূপ:
কপার টি ব্যবহারের হুকুম:
কপার টি একটি অস্থায়ী জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি, যা জরায়ুর ভেতর স্থাপন করে ডিম্বাণু নিষিক্ত হওয়া বা জাইগোট (নিষিক্ত ডিম্বাণু) জরায়ুর দেয়ালে বসতে বাধা দেয়। এটি স্থায়ী বন্ধ্যাকরণ (টিউবেকটমি) নয়, বরং অস্থায়ী ব্যবস্থা।
সালাফি বিদ্বানদের নিকট অস্থায়ী জন্মনিয়ন্ত্রণ নিম্নোক্ত শর্তে বৈধ:
- স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক সম্মতি থাকতে হবে। স্বামী বা স্ত্রীর একার পক্ষে এককভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া জায়েজ নয়।
- স্থায়ী বন্ধ্যাকরণ নয়—অর্থাৎ ভবিষ্যতে সন্তান নেওয়ার ইচ্ছা থাকলে তা সম্ভব থাকতে হবে।
- শারীরিক বা বৈধ কারণ—অর্থাৎ চিকিৎসা সংক্রান্ত জটিলতা, শারীরিক অক্ষমতা, অর্থনৈতিক অসচ্ছলতা, বা পূর্ববর্তী সন্তানদের লালন-পালনে গুরুতর অসুবিধার মতো বৈধ কারণে হতে হবে।
- ক্ষতিকর না হওয়া—অর্থাৎ নারীর স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর প্রমাণিত না হলে।
উল্লেখ্য, আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন:
مَا نَهَيْتُكُمْ عَنْهُ فَاجْتَنِبُوهُ، وَمَا أَمَرْتُكُمْ بِهِ فَافْعَلُوا مِنْهُ مَا اسْتَطَعْتُمْ "আমি যা থেকে নিষেধ করি, তা থেকে বিরত থাকো; আর যা আদেশ করি, তা সামর্থ্য অনুযায়ী পালন করো।" (সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৭২৮৮)
কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন:
لَا تُضَارَّ وَالِدَةٌ بِوَلَدِهَا "কোনো মাকে তার সন্তানের জন্য কষ্ট দেওয়া যাবে না।" (সূরা বাকারা, ২:২৩৩)
যদি সন্তানের সংখ্যা বেশি হওয়ার কারণে মায়ের শারীরিক এবং মানসিক কষ্ট হয়, অথবা পূর্ববর্তী সন্তানদের লালন-পালনে বিঘ্ন ঘটে, তাহলে অস্থায়ী জন্মনিয়ন্ত্রণ জায়েজ।
বিদ্বানগণের মতামত:
শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রহিমাহুল্লাহ) বলেছেন:
"স্বামী-স্ত্রী উভয়ের সম্মতিতে আজল (গর্ভধারণ প্রতিরোধের একটি পদ্ধতি) করা জায়েজ। তদ্রূপ অন্যান্য অস্থায়ী পদ্ধতি ব্যবহার করাও জায়েজ, যতক্ষণ পর্যন্ত তা স্থায়ী বন্ধ্যাকরণ না হয়।" (মাজমু‘ ফাতাওয়া, ৩৪/১৬৮)
শাইখ ইবনে বায (রহিমাহুল্লাহ)-কে প্রশ্ন করা হয়েছিল: "বিবাহিত স্ত্রী নিজ গর্ভে ইমপ্লান্ট করার জন্য গোলাকার কপারের রিং ব্যবহার করতে পারে কি?" উত্তর:
"এতে কোনো দোষ নেই, যদি ডাক্তারি পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া যায় যে এটি নারীর স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর নয় এবং তার স্বামী এতে সম্মত হন। তবে সতর্কতা অবলম্বন করা ও উত্তম পদ্ধতি (যেমন আজল ইত্যাদি) ব্যবহার করা উচিত।" (মাজমু‘ ফাতাওয়া ইবনে বায, ২০/৪৫১)
শাইখ মুহাম্মাদ ইবনে সালিহ আল-উসাইমীন (রহিমাহুল্লাহ) বলেন:
"অস্থায়ী জন্মনিয়ন্ত্রণের অনুমতি রয়েছে যদি কোনো বৈধ প্রয়োজন থাকে, যেমন শারীরিক দুর্বলতা বা সন্তান লালন-পালনের অসুবিধা। তবে শর্ত হলো স্বামী-স্ত্রী উভয়ের সম্মতি থাকবে।" (লিকা’ আল-বাব আল-মাফতুহ, ১/২৩)
শাইখ আল-আলবানী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন:
"কপার টি ব্যবহার করা জায়েজ, কারণ এটি একটি অস্থায়ী প্রতিরোধ ব্যবস্থা এবং ভবিষ্যতে সন্তান নেওয়ার পথ খোলা রাখে। তবে এটি ক্ষতিকর না হওয়া জরুরি।" (সিলসিলা হুদা ওয়া নূর, ২৬০)
আপনার বিশেষ অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে:
- আপনার ইতিমধ্যে তিনটি সন্তান আছে এবং তাদের লালন-পালনে অসুবিধা হচ্ছে।
- আপনি আজল ও কনডম ব্যবহার করেও গর্ভধারণ এড়াতে পারছেন না।
- আরেকটি সন্তান জন্ম নিলে পূর্ববর্তী সন্তানদের যত্ন কমে যাওয়ার আশঙ্কা আছে।
এসব কারণে কপার টি ব্যবহার করা আপনার জন্য জায়েজ, তবে শর্ত সাপেক্ষে:
কপার টি ব্যবহারের শর্তাবলী:
- স্বামীর সম্মতি নিতে হবে (যেহেতু সন্তান নেওয়া স্বামীরও অধিকার, তাই তার অনুমতি আবশ্যক)।
- ভবিষ্যতে পুনরায় সন্তান নেওয়ার ইচ্ছা থাকতে হবে—অর্থাৎ এটি স্থায়ী বন্ধ্যাকরণ নয়, শুধু অস্থায়ী ব্যবস্থা।
- চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে এবং নিশ্চিত করতে হবে যে এটি আপনার স্বাস্থ্যের জন্য উপযুক্ত ও ক্ষতিকর নয়।
- স্থানীয় কোনো শরয়ী নিষেধাজ্ঞা (যেমন দেশের আইন দ্বারা নিষিদ্ধ) না থাকলে।
এখন নির্ধারণ করার পরামর্শ:
- প্রয়োজনে একজন মুসলিম চিকিৎসকের পরামর্শ নিন যিনি শরীয়ার সীমা সম্পর্কে অবগত।
- কপার টি ছাড়াও অন্য কোনো অস্থায়ী পদ্ধতি (যেমন হরমোনাল কয়েল বা পিল) নিয়ে ভাবতে পারেন। তবে কোন পদ্ধতিটি নারীর জন্য কম ক্ষতিকর, তা ডাক্তারি ভিত্তিতে ঠিক করতে হবে।
- মনে রাখবেন, সন্তান আল্লাহর পক্ষ থেকে রিজিক। তবে অতিরিক্ত সন্তান জন্ম না দেওয়ার বৈধ কারণ থাকলে তা জায়েজ।
বিশেষ জোর দিয়ে বলা হচ্ছে:
কপার টি ব্যবহার করার সময় সতর্ক থাকতে হবে যে এটি জাইগোট (নিষিক্ত ডিম্বাণু) সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করে না, বরং জরায়ুতে বসতে বাধা দেয়। কিছু আধুনিক গবেষণা অনুসারে, কখনো কখনো এটি নিষিক্ত ডিম্বাণু (যা রূহ ফুঁকানোর আগের পর্যায়) নষ্ট করতে পারে। তবে অধিকাংশ সালাফি বিদ্বানের মতে, রূহ ফুঁকানোর আগে (গর্ভধারণের ৪০ বা ১২০ দিনের আগে) ভ্রূণ নষ্ট করা জায়েজ আছে যদি কোনো বৈধ কারণ থাকে (যেমন মায়ের স্বাস্থ্য রক্ষা)।
সুতরাং, আপনার পক্ষে কপার টি ব্যবহার করা জায়েজ, তবে শর্তাবলী মেনে চলা জরুরি।
আল্লাহই সর্বজ্ঞ।