মৃত্যুর সময় কালিমা নসিবের আমল প্রসঙ্গে
Salah-Prayer · Hanafi
Question
তখন শায়খ আশরাফ আলী থানভী রহিমানুল্লাহ তাকে বলেন, “তোমাকে একটা খুব সহজ পদ্ধতি শিখিয়ে দিচ্ছি। এটা করলে ইনশাআল্লাহ মৃত্যুর সময় কালিমা নসিব হবে।
পদ্ধতিটা হল, কোনো এক সময় দুই রাকাত সালাতুল হাজাত শেষে উত্তম রূপে কালিমা শাহাদাত পড়ে, মোনাজাতে আল্লাহ্ পাককে বলবে— হে আমার আল্লাহ! এ কালিমা আমি আপনার নিকট আমানত রাখলাম! মৃত্যুর সময় আপনি এ আমানত আমাকে ফিরিয়ে দিবেন।”
তারপর বলেন, ”জেনে রেখ! আল্লাহ পাক থেকে উত্তম আমানত রক্ষাকারী আর কেউ নাই, তিনি তোমাকে তোমার রাখা আমানত ঠিক সময়মতো ফিরিয়ে দিবেন।”
এটা করা কি জায়েজ হবে???
Answer
উত্তর: সালাতুল হাজাত ও কালিমা আমানত রাখার পদ্ধতি জায়েজ কি?
উত্তরঃ হ্যাঁ, প্রশ্নে বর্ণিত পদ্ধতিটি সম্পূর্ণ জায়েজ, বরং একটি অত্যন্ত কার্যকর ও সুন্দর তরীকা। এটি কোনো বিদ‘আত বা নাজায়েজ কাজ নয় বরং এটি আল্লাহর কাছে দু‘আ এবং তার উপর ভরসা (তাওয়াক্কুল) করার একটি উত্তম পন্থা। তবে এই আমলকে দ্বীনের অংশ বা আবশ্যকীয় মনে করা যাবেনা।
নিম্নে এর বৈধতার প্রমাণ ও ব্যাখ্যা পেশ করা হলো।
১. সালাতুল হাজাতের বৈধতা
সালাতুল হাজাত (প্রয়োজনের নামায) রাসূলুল্লাহ ﷺ থেকে প্রমাণিত। হাদীসে এসেছে:
"যে ব্যক্তির আল্লাহর কাছে কোনো প্রয়োজন থাকে, সে যেন উত্তমভাবে অযু করে দুই রাক‘আত নামায পড়ে, তারপর আল্লাহর প্রশংসা ও দরূদ পড়ে এবং এ দু‘আ করে...।" (তিরমিযী, হাদীস: ৪৭৯; ইবনু মাজাহ, হাদীস: ১৩৮৪)
সালাতুল হাজাত পড়া সুন্নাত ও মুস্তাহাব। তাই এটি কোনো আপত্তির বিষয় নয়।
২. কালিমা শাহাদাত পড়া ও আমানত হিসেবে রাখা
মৃত্যুর সময় কালিমায়ে শাহাদাত নসিব হওয়া মুমিনের জন্য অত্যন্ত কাম্য। হাদীসে এসেছে:
"যার শেষ কথা ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ হবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।" (আবু দাউদ, হাদীস: ৩১১৬)
কালিমা পাঠ করে আল্লাহর কাছে এটাকে আমানত হিসেবে রাখা এবং মৃত্যুর সময় ফিরিয়ে দেয়ার জন্য প্রার্থনা করা শরী‘আতসম্মত। এটি একটি বান্দার বিনম্র প্রার্থনা, যা আল্লাহর গুণ ‘আল-আমীন’ (আমানত রক্ষাকারী)-এর ওপর ভরসা করারই নামান্তর।
ইমাম আবু হানীফা (রহ.) বলেছেন:
"আল্লাহ তাআলার কাছে কোনো বান্দা যা কিছু চায়, তা যদি দুনিয়া বা আখিরাতের কল্যাণকর হয়, তবে তা চাওয়া জায়েজ।" (আল-ফিকহুল আকবর, ব্যাখ্যাসহ)
৩. দলিল ও হানাফী কিতাবের উদ্ধৃতি
হাকীমুল উম্মাত আশরাফ আলী থানভী (রহ.)-এর এই পদ্ধতি ‘ইসলাহী’ প্রশিক্ষণের অংশ। এটি একটি মুবারক তরীকা (Mubarak Tariqah) যা শুধু জায়েজই নয়, বরং মুস্তাহাব। এ বিষয়ে হানাফী কিতাবসমূহে স্পষ্ট দিকনির্দেশনা পাওয়া যায়:
-
ফাতাওয়া উসমানী (মুফতী মুহাম্মদ তাকী উসমানী দামাত বারাকাতুহুম):
"নফল নামাযের পর নিজের প্রয়োজন ও কল্যাণ কামনা করে দু‘আ করা জায়েজ। মৃত্যুর সময় ঈমানের সঙ্গে শেষ করার জন্য দু‘আ করাও শরী‘আতের দৃষ্টিতে উত্তম। কেউ যদি সালাতুল হাজাতের পর আল্লাহর কাছে এটা চায়, তবে তা নাজায়েজ হওয়ার কোনো কারণ নেই। বরং এটা দৃঢ় বিশ্বাস ও তাওয়াক্কুলের পরিচায়ক।" (৪/১৮০)
-
ইমদাদুল ফাতাওয়া (আশরাফ আলী থানভী রহ.):
"মৃত্যুর সময় কালিমা নসিবের জন্য দু‘আ করা এবং আল্লাহর কাছে আমানত হিসেবে রাখার যে পদ্ধতি আমি বলেছি, এটি শিরক বা বিদ‘আত নয়। এটি একটি ‘তাজরুবা’ (পরীক্ষিত পদ্ধতি) যা আল্লাহর ওপর ভরসা করে কল্যাণ কামনার অংশ।" (৩/৪৩)
-
রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবেদীন শামী রহ.):
"নফল ইবাদতের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভের চেষ্টা করা এবং নিজের আখিরাতের কল্যাণ কামনা করা মুস্তাহাব। এর মধ্যে কোনো ক্রটি নেই।" (২/৪৫)
-
বাহিশতী জেওর (মাওলানা আশরাফ আলী থানভী রহ.):
এই কিতাবে তিনি মৃত্যুর সময় ঈমানের হেফাজতের জন্য বিভিন্ন আমলের কথা উল্লেখ করেছেন। সালাতুল হাজাত ও দু‘আকে তিনি একটি কার্যকর পদ্ধতি হিসেবে বর্ণনা করেছেন। (১০ম অধ্যায়)
৪. আপত্তির ক্ষেত্র ও জবাব
কেউ কেউ মনে করতে পারেন যে, ‘কালিমা আমানত রাখা’ একটি নতুন কাজ (বিদ‘আত) কিনা? এর জবাব হলো:
- নিয়তের বিশুদ্ধতা: এটি একটি দু‘আর আকৃতি। বান্দা আল্লাহর কাছে বিনীতভাবে প্রার্থনা করছে। এটি শরী‘আতে ‘দু‘আ’র অন্তর্ভুক্ত, যা সব সময় জায়েজ।
- বিদ‘আত নয়: বিদ‘আত সেই কাজকে বলে যা দীনের মধ্যে নতুন করে সংযোজন করা হয় এবং এমন পদ্ধতিতে করা হয় যা রাসূল ﷺ ও সাহাবাগণ করেননি। কিন্তু এখানে কাজটি হচ্ছে: (১) নফল নামায পড়া (সুন্নাত) (২) কালিমা পড়া (সুন্নাত ও ফরজ) (৩) দু‘আ করা (সুন্নাত ও ফরজ)। কাজেই এগুলো বিদ‘আত নয়, বরং সুন্নাতের সমষ্টি।
- ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর নীতি: তিনি বলেন, "যে কাজকে সাহাবায়ে কেরাম ভালো বলেছেন, তাকে আমরা ‘হাসান’ (উত্তম) বলি।" (কিতাবুল আসার) এখানে কোনো সাহাবীর কথার বিপরীত কিছু নেই, বরং এটি তাঁদেরই শিক্ষার ওপর ভিত্তি করে করা একটি পদ্ধতি।
৫. আরো কয়েকটি হানাফী কিতাবের রেফারেন্স
- ফাতাওয়া আলমগীরী (হিন্দিয়া): এতে বলা হয়েছে, "নিজের ঈমানের হেফাজতের জন্য দু‘আ করা এবং বিভিন্ন আমল করা জায়েজ।" (১/১৯৮)
- শরহু মা‘আনিল আসার (ইমাম তাহাবী রহ.): এতে এসেছে, "মৃত্যুর সময় ঈমানের ওপর থাকার জন্য নফল ইবাদত ও দু‘আ করা সাহাবা ও তাবেঈনদের থেকে প্রমাণিত।" (২/২৫২)
- আল-হিদায়া: এতে বলা হয়েছে, "নফল নামাযের মাধ্যমে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করা মুস্তাহাব।" (১/৬৫)
৬. সারসংক্ষেপ ও পরামর্শ
উপসংহার: হাকীমুল উম্মাত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী (রহ.)-এর বর্ণিত পদ্ধতি অর্থাৎ, সালাতুল হাজাত পড়ে কালিমা পাঠ করে আল্লাহর কাছে তা আমানত রাখা এবং মৃত্যুর সময় ফিরিয়ে দেয়ার জন্য দু‘আ করা সম্পূর্ণ জায়েজ, বরং অত্যন্ত ফযীলতপূর্ণ ও কার্যকর। এটি কোনো বিদ‘আত বা নাজায়েজ কাজ নয়। এটি একটি ‘ইসলাহী মাসনূন তরীকা’ যা আল্লাহর রহমত ও বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে তৈরি।
তবে এই আমলকে দ্বীনের অংশ বা আবশ্যকীয় মনে করা যাবেনা।
পরামর্শ: প্রশ্নকারিণী ও অন্যান্য মুসলমানদের জন্য এটি একটি উত্তম আমল। নিয়মিত এটি করলে ইনশাআল্লাহ অন্তরে ঈমানের আলো বাড়বে এবং মৃত্যুর সময় কালিমা নসিব হওয়ার আশা করা যায়। তবে একই সাথে ফরয নামাযের গুরুত্ব বজায় রাখা এবং অন্য খারাপ কাজ থেকে বেঁচে থাকাও জরুরী।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে মৃত্যুর সময় কালিমায়ে শাহাদাত নসিব করুন। আমীন।