হেদায়েতের বিষয়ে
Faith and Belief · Hanafi
Question
আমার ভাইয়া দীর্ঘদিন যাবত দেশের বাইরে থাকে।
কিন্তু ঠিকমতো নামাজ পড়ার নিয়ত থাকলেও নিয়মিত আদায় করতে পারেনা ... ওর ওমরাতে যাওয়ার অনেক ইচ্ছা তাও যেতে পারেনা।
তো গতকাল ও অনেক বেশি মন থেকে ভেঙে পড়েছে যে ও কেনো ফজরের সালাতে উঠতে চেয়েও পারেনা
মুখ দিয়ে কোনো সূরা বের হয় না
কাজে যাওয়ার আগে এলার্ম বাজলেও ফহর নামাজের আগে এলার্ম বাজেনা
আবার হজ্ব করতে যাওয়ার জন্য পর্যাপ্ত আয় এবং সামর্থ্য থাকলেও যখন হজ্ব করতে যেতে চাই তখন টাকা ফুরিয়ে যায়।
তারওপর রিযিকে আয় বরকতও পাচ্ছেনা।
(বলে রাখা ভালো ওর আয়ের কিছু টাকা সুদের মধ্যে যায়... ও ছাড়তে চাইলেও যার টাকার ওর সুদ দিতে হয় সে জুলুম কর)
এরূপ অবস্থায় কী করণীয়?
Answer
উত্তর: وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রিয় বোন, আপনার ভাইয়ের অবস্থা শুনে খুবই কষ্ট হলো। এটি একটি জটিল সমস্যা যেখানে ঈমান, আমল, রিযিক ও ইবাদত একসাথে জড়িত। হাদীসে এসেছে, যখন কোনো বান্দা গুনাহ করতে থাকে, তখন তার রিযিক সংকুচিত হয় এবং ইবাদতের তাওফীক কমে যায়। আপনার ভাইয়ের সাথে যা ঘটছে তার মূল কারণ হতে পারে সুদ (রিবা) ও অন্যান্য গুনাহ, যা বরকত কেড়ে নেয় এবং আমলকে ভারী করে তোলে। নিচে প্রাসঙ্গিক কিতাবের রেফারেন্সসহ বিস্তারিত সমাধান দেওয়া হলো।
১. সমস্যার মূল কারণ চিহ্নিত করুন: সুদ (রিবা)
আপনি লিখেছেন, ভাইয়ের আয়ের কিছু টাকা সুদের মধ্যে যায় এবং তিনি ছাড়তে চাইলেও সুদ দিতে বাধ্য করা হয়। সুদ ইসলামের সবচেয়ে বড় গুনাহগুলোর একটি। কুরআনে সুদখোরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে (সূরা বাকারা: ২৭৯)। ইমাম আবু হানীফা (রহ.) এর মতে, সুদ হারাম ও কবিরা গুনাহ। (রদ্দুল মুহতার, ৫/১৬৬)
করণীয়:
- সর্বপ্রথম ভাইকে বুঝিয়ে বলুন যে, এই আয়ের কোনো বরকত নেই। বরং এটি ইবাদতের তাওফীক কেড়ে নেয়।
- যদি তিনি জোরপূর্বক সুদ দিতে বাধ্য হন, তাহলে তিনি নিজে সুদ নিচ্ছেন না, তবে তিনি যে টাকা সুদে দিচ্ছেন (ঋণ দিয়ে সুদ নিচ্ছেন) সেটি তার পক্ষ থেকে সুদ গ্রহণ। এটি সম্পূর্ণ হারাম। তিনি যদি পারেন, তাহলে সেই ব্যক্তিকে বুঝিয়ে বলুন যে, তিনি শুধু মূল টাকা ফেরত নেবেন, সুদ নেবেন না। যদি তা সম্ভব না হয়, তাহলে অন্তত নিয়ত করুন যে, তিনি এই ব্যবসা থেকে বের হয়ে আসবেন এবং ভবিষ্যতে আর সুদের লেনদেন করবেন না।
- ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.) ও ইমাম মুহাম্মাদ (রহ.) এর মতে, সুদের টাকা নিজে খাওয়া জায়েয নয়; বরং তা সদকা করে দেওয়া উচিত (যদি মালিককে ফেরত দেওয়া সম্ভব না হয়)। (আল-হিদায়া, ৩/৯৮)
২. নামাজে অলসতা ও ফজর পড়তে না পারা
ফজরের সালাত কুরআন ও হাদীসে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। আল্লাহ বলেন:
﴿إِنَّ الصَّلَاةَ كَانَتْ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ كِتَابًا مَوْقُوتًا﴾ (সূরা নিসা: ১০৩)
অর্থ: "নিশ্চয়ই সালাত মুমিনদের উপর নির্ধারিত সময়ে ফরজ।"
করণীয়:
- গুনাহের কারণে ইবাদতের তাওফীক কমে যায়। তাই প্রথমে সব ধরনের গুনাহ (বিশেষ করে সুদ) থেকে তওবা করতে হবে।
- ফজরের জন্য একটি নিয়মিত রুটিন করুন: রাতে তাড়াতাড়ি ঘুমানো, ফজরের সময় জাগার জন্য একাধিক এলার্ম সেট করা এবং পরিবারের কাউকে জাগানোর জন্য অনুরোধ করা।
- বিছানায় যাওয়ার আগে আয়াতুল কুরসি ও শেষ তিন সূরা (ইখলাস, ফালাক, নাস) পড়ে ফুঁ দিয়ে ঘুমানো। হাদীসে এসেছে, এতে শয়তান থেকে রক্ষা পাওয়া যায় (বুখারী)।
- দোয়া করুন: «اللَّهُمَّ أَعِنِّي عَلَى ذِكْرِكَ وَشُكْرِكَ وَحُسْنِ عِبَادَتِكَ» (হে আল্লাহ! আমাকে তোমার স্মরণ, শুকরিয়া ও উত্তম ইবাদতের তাওফীক দাও) - আবু দাউদ।
৩. কুরআন পড়তে না পারা (সূরা মুখস্থ না থাকা)
মুখ দিয়ে কোনো সূরা বের না হওয়া একটি আধ্যাত্মিক ব্লকের লক্ষণ হতে পারে। এটি শয়তানের প্রভাব বা গুনাহের কারণে হতে পারে। ইমাম গাযযালী (রহ.) বলেন, কুরআন পড়ার সময় মনে অস্থিরতা আসা বা না পড়া গুনাহের কারণে হয়। (ইহইয়াউ উলুমিদ্দীন)
করণীয়:
- বেশি বেশি ইস্তিগফার (আস্তাগফিরুল্লাহ) পড়ুন।
- প্রতিদিন অন্তত এক পৃষ্ঠা কুরআন তিলাওয়াত করার চেষ্টা করুন, যদি সঠিকভাবে না পারেন তাহলেও পড়ুন।
- ছোট ছোট সূরা (যেমন সূরা ইখলাস, ফালাক, নাস) বারবার পড়ার চেষ্টা করুন এবং অর্থ বুঝার চেষ্টা করুন।
৪. হজ্জ ও ওমরার জন্য টাকা ফুরিয়ে যাওয়া
হজ্জ ফরজ হলে অর্থাৎ শারীরিক ও আর্থিক সামর্থ্য থাকলে তা পালন করা ওয়াজিব। কিন্তু যদি টাকা ফুরিয়ে যায়, তাহলে হয়তো সেটি আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি ইশারা যে এখনো সময় হয়নি, অথবা টাকায় বরকত না থাকার কারণে এটি হচ্ছে। আল্লাহ বলেন:
﴿وَمَنْ يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَلْ لَهُ مَخْرَجًا وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ﴾ (সূরা তালাক: ২-৩)
অর্থ: "যে আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য বের হওয়ার পথ করে দেন এবং তাকে এমন উৎস থেকে রিযিক দেন যা সে কল্পনাও করেনি।"
করণীয়:
- টাকা হালাল না হওয়া পর্যন্ত হজ্জ বা ওমরা করার জন্য আগ্রহী হবেন না। হারাম টাকা দিয়ে হজ্জ করলে হজ্জ সহীহ হলেও ছওয়াব কম হয়। (ফাতাওয়া উসমানী, ২/৪২)
- আয় থেকে সুদ ও অন্যান্য হারাম উপাদান বের করে ফেলুন।
- দান-সদকা করুন এবং আল্লাহর কাছে সাহায্য চান।
৫. রিযিকে বরকত না পাওয়া
রিযিকের বরকত কমে যাওয়ার প্রধান কারণ গুনাহ, বিশেষ করে সুদ, মিথ্যা, প্রতারণা। ইমাম ইবনে আবেদীন শামী (রহ.) বলেন, সুদের মালে বরকত থাকে না, বরং তা ধ্বংস হয়। (রদ্দুল মুহতার, ৫/১৭৬)
করণীয়:
- তওবা ও ইস্তিগফার বৃদ্ধি করুন।
- নিজের সমস্ত আয়-ব্যবসা পর্যালোচনা করুন এবং নিশ্চিত করুন যে সবকিছু হালাল।
- সকালে বাজারে যাওয়ার আগে সূরা ইয়াসিন বা সূরা ওয়াকিয়াহ পড়ার অভ্যাস করুন।
- আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী ও গরীবদের দান করুন। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: "দান সম্পদ কমায় না" (মুসলিম)।
৬. একজন আলেমের শরণাপন্ন হওয়া
এই জটিল অবস্থায় শুধু সাধারণ পরামর্শ নয়, বরং একজন নির্ভরযোগ্য মুফতি বা আলেমের কাছে বসে বিস্তারিত বলুন। কারণ সুদের সাথে জড়িত ব্যক্তি তার পাওনাদারের সাথে কীভাবে নিষ্পত্তি করবে তা শরী'আহ অনুযায়ী সমাধান বের করা দরকার।
উপসংহার ও দোয়া
আল্লাহ তাআলা বলেন:
﴿قُلْ يَا عِبَادِيَ الَّذِينَ أَسْرَفُوا عَلَىٰ أَنفُسِهِمْ لَا تَقْنَطُوا مِن رَّحْمَةِ اللَّهِ﴾ (সূরা যুমার: ৫৩)
অর্থ: "হে আমার বান্দাগণ! যারা নিজেদের ওপর অত্যাচার করেছ, আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিঃসন্দেহে আল্লাহ সব গুনাহ মাফ করে দেন।"
আপনার ভাইকে বলুন, তিনি যেন হতাশ না হন। বরং এখন থেকে নতুন করে শুরু করুন। সবচেয়ে জরুরি কাজ হলো:
- সুদ থেকে সম্পূর্ণভাবে বেরিয়ে আসা (যদিও কষ্ট হয়, তবে আল্লাহর উপর ভরসা রাখুন)।
- পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ নিয়মিত পড়া, যদিও অল্প পড়ে, কিন্তু নিয়মিত।
- বেশি বেশি দোয়া করা, বিশেষ করে শেষ রাতে তাহাজ্জুদ পড়ে দোয়া করা।
আল্লাহ আপনার ভাইয়ের অবস্থা পরিবর্তন করুন এবং তাকে হালাল রিযিক ও ইবাদতের তাওফীক দিন। আমীন।