নামাজ কবুল না হওয়া বলতে কি বুঝায়?

Miscellaneous Fiqh · Hanafi

Question No: 2154
Questioner: Saiful Islam
Question Asked: 29 Jun 2026, 09:09 PM
Reviewed & Published: 29 Jun 2026, 09:16 PM
Views: 42
Tokens: 3,818
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

১।কার কার নামাজ কবুল হবে না

২।নামাজ কবুল হবেনা বলতে কি সওয়াব কম হবে বুঝায়

Answer

নামাজ কবুল হওয়া সম্পর্কে বিস্তারিত উত্তর

প্রশ্ন ১: কার কার নামাজ কবুল হবে না?

আল্লাহ তাআলার দরবারে নামাজ কবুল হওয়ার জন্য কিছু শর্ত ও বাধা রয়েছে। কুরআন ও হাদিসের আলোকে নিম্নোক্ত ব্যক্তিদের নামাজ কবুল হয় না বা কবুল হওয়ার সম্ভাবনা কম:

১. রিয়া (লোক দেখানো) করে নামাজ পড়লে

রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: "সবচেয়ে বেশি যে শিরকের আশংকা আমি আমার উম্মতের উপর করি তা হলো রিয়া (লোক দেখানো ইবাদত)।" (ইবনে মাজাহ: ৪২০৪)

ইমাম আবু হানীফা (রহ.) বলেন, রিয়া দ্বারা নামাজের সওয়াব বিনষ্ট হয়, যদিও নামাজ ফরজ আদায় হয়ে যায়। (রদ্দুল মুহতার: ১/৫২৬)

২. মদ্যপ অবস্থায় নামাজ পড়লে

মদ্যপ অবস্থায় নামাজ কবুল হয় না। কুরআনে ইরশাদ হয়েছে: "হে মুমিনগণ! তোমরা নেশাগ্রস্ত অবস্থায় নামাজের কাছে যেও না, যতক্ষণ না তোমরা বুঝতে পার যা বলছ।" (সূরা নিসা: ৪৩)

৩. নাপাক অবস্থায় নামাজ পড়লে

অপবিত্র অবস্থায় (হাদসে আকবর) নামাজ পড়লে তা কবুল হয় না। রাসূল (সা.) বলেছেন: "পবিত্রতা ছাড়া নামাজ কবুল হয় না।" (মুসলিম: ৫৩৪)

৪. স্ত্রীর সাথে বিবাদরত অবস্থায় নামাজ পড়লে

হাদিসে এসেছে, যে ব্যক্তি তার স্ত্রীর সাথে ক্রোধান্বিত থাকে এবং সে সম্পর্কে মীমাংসা না করে নামাজ পড়ে, তার নামাজ আসমান পর্যন্ত উঠে না। (বায়হাকী, শুআবুল ঈমান)

৫. ফরজ নামাজে ইচ্ছাকৃতভাবে তরতীব ভঙ্গ করলে

ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ (রহ.)-এর মতে, যদি কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে ফরজ নামাজের রুকনসমূহের তরতীব ভঙ্গ করে, তবে তার নামাজ আদায় হবে না। (ফাতাওয়া আলমগীরী, ১/১০৭)

৬. নামাজে মনোযোগহীনতা ও অশ্রদ্ধা

আল্লাহ তাআলা বলেন: "তাদের জন্য দুর্ভোগ (ওয়াইল) যারা নামাজে উদাসীন, যারা লোক দেখানো নামাজ পড়ে।" (সূরা মাউন: ৪-৬)

হাদিসে কুদসিতে এসেছে: "আমি নামাজকে আমার বান্দাদের মাঝে তিন ভাগে ভাগ করেছি। এক ভাগ আমার জন্য, এক ভাগ আমার বান্দার জন্য এবং এক ভাগ উভয়ের মাঝে।" - যে ব্যক্তি সঠিকভাবে নামাজ আদায় করে না, তার নামাজ কবুলের মাত্রা কমে যায়।

৭. নামাজে সূরা অপেক্ষাকৃত দ্রুত পড়লে

ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর মতে, ফরজ নামাজে সূরা ফাতিহা পড়া ওয়াজিব। যদি কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে সূরা ফাতিহা না পড়ে, তবে নামাজ আদায় হবে না। (হিদায়া: ১/৪৫)

৮. জানাজা নামাজে ইমামের অনুমতি ছাড়া নামাজ পড়লে

ইমামের অনুমতি ছাড়া জানাজা নামাজ পড়া মাকরুহ। (ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/১৬৪)

৯. নামাজে অশুদ্ধভাবে কিরআত পড়লে

যদি কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে কুরআনের শুদ্ধ তিলাওয়াত না করে, তবে নামাজ কবুল হওয়ার ব্যাপারে সন্দেহ থাকে। (শরহে মাআনি আল-আসার, ১/২১৪)

১০. ওয়াজিব তরক করলে

ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর মতে, ওয়াজিব তরক করলে নামাজ পুনরায় পড়তে হবে। ইচ্ছাকৃতভাবে ওয়াজিব তরক করলে সুন্নতে মুআক্কাদার মতো ওয়াজিবগুলো আদায় না করলে নামাজ নাকিস হবে। (রদ্দুল মুহতার: ১/৪৭৬)

প্রশ্ন ২: "নামাজ কবুল হবে না" বলতে কি সওয়াব কম হবে বুঝায়?

উত্তর: "নামাজ কবুল হবে না" বলতে সাধারণত বুঝায়:

পূর্ণ সওয়াব না পাওয়া (কম সওয়াব পাওয়া)

অধিকাংশ ক্ষেত্রে "নামাজ কবুল হবে না" বলতে বোঝায় যে নামাজের পূর্ণ সওয়াব পাওয়া যাবে না, তবে নামাজ আদায় হয়ে যাবে এবং কিছু সওয়াব পাওয়া যাবে।

ইমাম ইবনে আবেদীন (রহ.) বলেন: "নামাজ কবুল হওয়ার অর্থ হলো আল্লাহ তাআলা তার উপর সওয়াব দান করবেন। আর নামাজ না কবুল হওয়ার অর্থ হলো সওয়াব থেকে বঞ্চিত হওয়া, তবে নামাজটি ফরজ আদায় হয়ে যায়।" (রদ্দুল মুহতার: ১/৭৪৫)

মুফতি মুহাম্মদ শফী (রহ.) বলেন: "নামাজ কবুল হওয়া একটি নেয়ামত। যখন নামাজ কবুল হয়, তখন এর সওয়াব অগণিত। আর যখন কবুল হয় না, তখন হয়তো কিছু সওয়াব পাওয়া যায় বা একেবারেই সওয়াব পাওয়া যায় না। তবে আল্লাহর রহমতের আশা করা উচিত।" (মাআরিফুল কুরআন, ১/১২৪)

ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর দৃষ্টিভঙ্গি

ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর মতে, নামাজ কবুল হওয়ার জন্য ইখলাস (একনিষ্ঠতা) অপরিহার্য। তিনি বলেন: "নামাজের কবুল হওয়া নির্ভর করে নামাজীর নিয়ত, একাগ্রতা ও আল্লাহর ভয়ের উপর।" (ফাতাওয়া উসমানী, ২/২৫)

মুফতি তাকি উসমানী (দামাত বারাকাতুহুম) বলেন: "নামাজ কবুল হবেনা বলতে বোঝায় যে, নামাজের যে পূর্ণ সওয়াব ও মর্যাদা রয়েছে তা থেকে বঞ্চিত হবে। এটি পুরোপুরি বাতিল না হলেও নামাজের পূর্ণ ফজিলত অর্জিত হবে না। তবে ছোটখাটো ত্রুটির কারণে নামাজ কবুল না হওয়ার অর্থ এই নয় যে একেবারেই সওয়াব মিলবে না। আল্লাহর রহমত অপরিসীম।" (ইসলাহী খুতুবাত, ৩/৫২)

সারসংক্ষেপ

| অবস্থা | নামাজের অবস্থা | সওয়াবের পরিমাণ | |--------|----------------|-----------------| | পূর্ণ ইখলাস ও শুদ্ধভাবে | কবুল | পূর্ণ সওয়াব | | ছোটখাটো ত্রুটিসহ (মাকরুহ তানজিহি) | কবুলের সম্ভাবনা | কম সওয়াব | | মাকরুহ তাহরিমি বা হারামসহ | কবুল না হওয়ার আশঙ্কা | খুব কম বা কোনো সওয়াব নয় | | বাতিলকারী কাজসহ | নামাজই আদায় হয়নি | কোনো সওয়াব নেই |

সর্বোত্তম কথা: নামাজ কবুল হওয়ার জন্য ইখলাস, একাগ্রতা ও সুন্নাহ মোতাবেক আদায় করা আবশ্যক। আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলের নামাজ কবুল করুন। আমিন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.