জিনা ও অবৈধ সম্পর্ক কি কবিরা গুনাহ?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
Answer
উত্তর: প্রশ্নে উল্লেখিত বিষয়টি শিরক নয়, বরং কবিরা গুনাহ (মহাপাপ) — তবে তা ঈমান বিনষ্ট করে না, যতক্ষণ না কেউ এগুলোকে হালাল মনে করে বা বৈধ বলে বিশ্বাস করে।
নিম্নে হানাফি মাযহাবের কিতাব ও কুরআন-হাদিসের আলোকে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেওয়া হলো:
১. জিনা ও অবৈধ সম্পর্কের গুনাহের মাত্রা
কুরআন ও হাদিসে জিনাকে স্পষ্টভাবে কবিরা গুনাহ বলা হয়েছে এবং এর জন্য কঠোর শাস্তির ঘোষণা এসেছে।
কুরআন:
“আর তোমরা জিনার কাছে যেয়ো না, নিশ্চয় তা অশ্লীল ও নিকৃষ্ট পথ।” (সূরা বনী ইসরাইল: ৩২)
“যারা আল্লাহর সাথে অন্য ইলাহ ডাকে না এবং অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা করে না, যাকে আল্লাহ হারাম করেছেন, এবং যিনা করে না; যে এগুলো করে সে শাস্তির সম্মুখীন হবে। কিয়ামতের দিন তার শাস্তি দ্বিগুণ করা হবে এবং সে লাঞ্ছিত অবস্থায় চিরস্থায়ী হবে। তবে যারা তাওবা করে, ঈমান আনে ও সৎকাজ করে, আল্লাহ তাদের পাপকে পুণ্য দ্বারা পরিবর্তন করবেন। আর আল্লাহ অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” (সূরা আল-ফুরকান: ৬৮-৭০)
হাদিস:
“যে ব্যক্তি যিনা করে, সে মুমিন অবস্থায় যিনা করে না।” (সহীহ বুখারী, হাদিস: ২৪৭৫) — অর্থাৎ পূর্ণ ঈমানের অবস্থায় নয়, তবে ঈমান যায় না, দুর্বল হয়।
হানাফি ফিকহের কিতাব ‘রদ্দুল মুহতার’-এ (৩/১৪৭, কিতাবুল হুদুদ) জিনাকে কবিরা গুনাহ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে, কিন্তু কুফর নয়।
২. শিরকের কাছাকাছি বা ঈমান যাওয়ার বিষয়
শিরক হলো আল্লাহর সাথে অন্য কাউকে শরিক করা (সূরা লুকমান: ১৩)। জিনা, পরকিয়া, বা অবৈধ সম্পর্ক শিরকের অন্তর্ভুক্ত নয়। তাই এগুলো করলে ঈমান চলে যায় না — তবে ঈমান দুর্বল হয় এবং ব্যক্তি কবিরা গুনাহের পাপী হয়।
ইমাম তাহাবি (রহ.) তাঁর ‘আকিদাহ ত্বহাবিয়্যাহ’-তে বলেন:
“আমরা কবিরা গুনাহের কারণে কোনো মুসলিমকে কাফির বলি না, যতক্ষণ না সে তা হালাল মনে করে।”
হানাফি ফকীহগণ (যেমন ইবনে আবিদীন, রদ্দুল মুহতার ৩/২৮৫) একই মত পোষণ করেন।
৩. পুরুষ-মহিলার বন্ধুত্বপূর্ণ কথাবার্তা ও সম্পর্ক
ইসলামে অপরিচিত বা বৈধ সম্পর্কের বাইরে নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা, প্রেমালাপ, ও বন্ধুত্ব নিষিদ্ধ। তবে তা যিনা পর্যন্ত না পৌঁছালেও ছোট বা বড় গুনাহ হতে পারে (নিয়ত ও অবস্থার উপর নির্ভর করে)।
হাদিসে এসেছে:
“চোখের যিনা হলো দেখা, কানের যিনা হলো শোনা, জিহ্বার যিনা হলো কথা বলা, হাতের যিনা হলো স্পর্শ করা, পায়ের যিনা হলো চলা — আর অন্তর কামনা করে ও চায়, আর লজ্জাস্থান তা সত্য করে বা মিথ্যা।” (সহীহ মুসলিম, হাদিস: ২৬৫৭)
সুতরাং:
- অবৈধ প্রেম ও সম্পর্ক করা → গুনাহ, হতে পারে কবিরা বা সগিরা (গুরুত্ব ও পুনরাবৃত্তির উপর নির্ভর করে)। জিনায় পৌঁছালে তা নিঃসন্দেহে কবিরা।
- শুধু কথা বলা বা মেসেজ করা → হারাম, কিন্তু যিনার পর্যায়ের নয়। তবে তা যিনার দিকে নিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকায় কবিরা গুনাহের সন্নিকটে।
৪. উপসংহার: প্রশ্নের সরাসরি উত্তর
আপনার বক্তব্য সঠিক যে:
“অবৈধ প্রেম, পরকিয়া, জিনা বা পুরুষ-মহিলার অনৈধ সম্পর্ক ও কথাবার্তা কবিরা গুনাহ — কিন্তু এগুলো শিরকের নিকটবর্তী নয় এবং করলে ঈমান যায় না, যতক্ষণ না কেউ এসবকে হালাল মনে করে।”
তবে সতর্ক থাকা জরুরি যে, কবিরা গুনাহ মানুষকে ধীরে ধীরে ঈমান থেকে দূরে সরিয়ে দিতে পারে এবং মৃত্যুর সময় কুফরী অবস্থায় মৃত্যু হতে পারে (আল্লাহ রক্ষা করুন)। তাই তওবা করা অতি আবশ্যক।
৫. হানাফি কিতাবের রেফারেন্স
- রদ্দুল মুহতার (৩/১৪৭, ৩/২৮৫) — জিনার গুনাহ ও কুফর না হওয়া সংক্রান্ত।
- ফাতাওয়া হিন্দিয়া / আলমগিরি (২/১৯৫) — যিনা সম্পর্কিত বিধান।
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (মুফতি আশরাফ আলী থানভী, ৪/২৮৫) — কবিরা গুনাহ ও ঈমানের সম্পর্ক।
- বেহেশতি জেওর (মাওলানা আশরাফ আলী থানভী, প্রথম ভাগ, গুনাহের অধ্যায়) — জিনা ও নিষিদ্ধ সম্পর্কের বিবরণ।
- মারিফুল কুরআন (মুফতি মুহাম্মদ শফি, সূরা ফুরকানের তফসির) — জিনার শাস্তি ও তওবার ফজিলত।
- উসুলুশ শাশি — কুফর ও ইমানের সীমারেখা।