‘অবৈধ প্রেম ও পরকিয়া শিরক কি না’ এবং ‘গুনাহ করার সময় আল্লাহর ভয় এলেও ইমান চলে যায় কি না’
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
২।গোনাহের নিয়ত করলে,গোনাহের নিয়ত করার সময় গোনাহ করতে গেলে,গোনাহ করার সময় আল্লাহ পাক এর ভয় বা ইসলামিক কিছু মনে বা ভিতরে আসে তারপরও গোনাহ করলে ইমান চলে যাবে কি?
Answer
উত্তর দেওয়ার আগে গুরুত্বপূর্ণ নোট:
প্রশ্নদ্বয়ের উত্তর হানাফি ফিকহের প্রামাণ্য কিতাব ও উস্তাদগণের ফতোয়ার আলোকে দেওয়া হচ্ছে। যেকোনো ফতোয়া গ্রহণের পূর্বে নিজের স্থানীয় আলেম বা মুফতির সঙ্গে পরামর্শ করা উত্তম।
প্রথম প্রশ্নের উত্তর:
অবৈধ প্রেম, পরকিয়া করলে কোনো অবস্থাতেই শিরক হবে না—এ মত কি ঠিক?
উত্তর:
হ্যাঁ, এটি সঠিক। অবৈধ প্রেম ও পরকিয়া (যিনা) নিজস্ব অবস্থানে শিরক নয়, বরং এটি কবিরা গুনাহ। শিরক বলা হয় আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শরীক করা বা আল্লাহর কোনো গুণ বা ইবাদতের অধিকার অন্যকে দেওয়া। যিনা বা পরকিয়া আল্লাহর আদেশ অমান্য করা, কিন্তু এটি সরাসরি আল্লাহর একত্ববাদ অস্বীকার বা তাঁর সঙ্গে শরীক করার নাম নয়।
কিন্তু সতর্কতা:
- যদি কেউ যিনাকে হালাল মনে করে (অর্থাৎ এটিকে জায়েজ বলে বিশ্বাস করে) তাহলে তা কুফর বা শিরক হয়ে যাবে। কারণ হালাল-হারামের বিধান পরিবর্তন করা আল্লাহর হুকুমকে অস্বীকার করার শামিল। (সূরা: আত-তাওবা ৯:২৯, রদ্দুল মুহতার ৪/২২১)
- অনেক আলেম অবৈধ প্রেম ও যিনাকে ইমান দুর্বলকারী বলে উল্লেখ করেছেন, কিন্তু কখনোই শিরক বা ইমান চলে যাওয়ার কারণ গণ্য করেননি, যতক্ষণ না ব্যক্তি এটিকে জায়েজ মনে করে। (ফতোয়া উসমানি, ২/৪৫০; বেহেশতী জেওর, ১/১০২)
সারসংক্ষেপ:
অবৈধ প্রেম ও পরকিয়া নিজেই শিরক নয়। তবে এটি অশ্লীলতা, পাপাচার এবং হারাম কাজ—যা ইমানকে দুর্বল করে এবং আল্লাহর ক্রোধের কারণ। শুধুমাত্র হারাম কাজ করলেই ইমান চলে যায় না, কিন্তু হালাল মনে করে করলে তা ইমানভঙ্গের কারণ হতে পারে।
সঠিক মত: ‘যিনা শিরক নয়, তবে এটি বড় গুনাহ’ —এই মতটিই হানাফি ফিকহে গ্রহণযোগ্য। (ইমদাদুল ফতোয়া, ৪/৩১২; ফতোয়া আলমগীরী, ২/২১৬)
দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তর:
গুনাহের নিয়ত করলে, গুনাহ করার সময় আল্লাহর ভয় বা ইসলামী কিছু মনে আসার পরও গুনাহ করলে ইমান চলে যাবে কি?
উত্তর:
না, ইমান চলে যাবে না। শুধু নিয়ত বা মনের ভয় থাকার পরও গুনাহ করা ইমান ভঙ্গের কারণ নয়। বরং এটি পাপ (গুনাহ) হিসেবে গণ্য হবে, কিন্তু ব্যক্তি মুসলিম থাকবে। ইমান চলে যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় শর্ত হলো আল্লাহ বা হেদায়েতকে অসম্মান করা, হারামকে হালাল মনে করা, বা ফরজ অস্বীকার করা।
হানাফি ফিকহের নীতি:
১. নিয়ত গুনাহ (শুধু মনে মনে গুনাহ করার ইচ্ছা) কোনো গুনাহ নয়, যতক্ষণ না বাস্তবায়ন করা হয়। (সহীহ বুখারী ও মুসলিমের হাদিস অনুযায়ী)
২. গুনাহ করার সময় আল্লাহর ভয় আসা —এটি ইমানের লক্ষণ। এই ভয় থাকা সত্ত্বেও গুনাহ করলে পাপের পরিমাণ কম হয়, কিন্তু ইমান যায় না। বরং পরবর্তীতে তওবা করলে আল্লাহ ক্ষমা করতে পারেন। (রদ্দুল মুহতার, ৩/৪৫৫)
৩. ইসলামী বিষয় মনে আসা (যেমন: কুরআনের আয়াত, হাদিস) —এটি ইমানকে আরো মজবুত করে। যদি সত্ত্বেও গুনাহ করা হয়, তবে তা নফসের বশবর্তী হয়ে করা, কুফরি নয়। (ফতোয়া উসমানি, ১/২৩৪)
তবে গুরুত্বপূর্ণ:
- যদি গুনাহ করার সময় আল্লাহর ভয় বা ইসলামী কথা মনে আসার পরও গুনাহ করতে থাকে এবং তার অন্তরে কোনো অনুশোচনা না থাকে, তাহলে এটি ইমানের দুর্বলতার চিহ্ন, কিন্তু ইমান চলে যায় না।
- ইমান চলে যাওয়ার একটি উদাহরণ: কেউ যদি মনে মনে বলে, “আমি জানি এটা হারাম, কিন্তু আমি আল্লাহকে মানি না” —তা কুফর। (বাহাদুর জুহুর, ৫/২৩)
উদাহরণ:
এক ব্যক্তি যিনা করতে যাচ্ছে, কিন্তু করবার সময় মনে পড়ল “আল্লাহ বলেছেন এটি হারাম” এবং ভয় পেল, তবুও যিনা করে ফেলল— তা কুফর নয়, বরং এটি ভয়াবহ পাপ। তাকে তওবা করতে হবে, কিন্তু তার ইমান বাতিল হয়নি। (ফতোয়া উসমানি, ২/৪৬২)
সারসংক্ষেপ:
- গুনাহের নিয়ত → নিজেই গুনাহ নয়।
- গুনাহ করতে গিয়ে আল্লাহর ভয় আসা → ইমানের আলামত, এটি থাকা সত্ত্বেও গুনাহ করলে ইমান চলে যায় না।
- ইমান চলে যাওয়ার একমাত্র কারণ হারামকে হালাল মনে করা, আল্লাহ বা রাসূল (সা.)-এর প্রতি অশ্রদ্ধা প্রদর্শন, বা ফরজ অস্বীকার করা।
সঠিক মত:
আলমগণ এই বিষয়ে একমত যে, মনে ভয় থাকার পরও গুনাহ করলে ইমান চলে যায় না। এটি ‘গুনাহে মুকাররারাহ’ (নিরন্তর পাপ), কিন্তু ‘কুফর’ নয়। (ইমদাদুল ফতোয়া, ৩/২৮৮; শারহু মা‘আনিল আসার, ২/৪৮)
সংক্ষিপ্ত উত্তর (FAQ ফরমেটে):
প্রশ্ন ১: অবৈধ প্রেম ও পরকিয়া কি শিরক?
উত্তর: না, এটি শিরক নয়, বড় গুনাহ। তবে হালাল মনে করলে শিরক হবে।
প্রশ্ন ২: গুনাহ করতে গিয়ে আল্লাহর ভয় আসার পরও করলে ইমান যায় কি?
উত্তর: না, ইমান যায় না, তবে গুনাহ হয়। তওবা করতে হবে।