১/২ তালাকের ইদ্দতের মধ্যে স্বামী স্ত্রীর পরস্পর সাধারণ কথাবার্তা ও আলোচনা কি অনুমোদিত?
Halal and Haram · Hanafi
Question
১ বা ২ তালাক হওয়ার পর ইদ্দত চলাকালীন পর্যন্ত স্বামী স্ত্রী সমস্যা মিটানোর জন্য অথবা আবারও বৈবাহিক সম্পর্ক শুরু করাটা উচিত কিনা এসবের জন্য ডিসকাস করা এবং স্বামী স্ত্রী সুলভ আচরণ ব্যতীত সাধারণ কথা কি বলা জায়েজ হবে?
Answer
উত্তর
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاتة
প্রিয় প্রশ্নকারী বোন,
আপনার প্রশ্নের উত্তর সংক্ষেপে এই যে, ১ বা ২ তালাকের পর (যাকে রজ‘ঈ তালাক বলে) স্ত্রী ইদ্দতের মধ্যে থাকাকালীন স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সমস্যা মিটিয়ে ফেলা এবং পুনরায় বৈবাহিক সম্পর্ক শুরু করার জন্য আলোচনা করা শুধু জায়েজই নয়, বরং এটি অত্যন্ত প্রশংসনীয় ও উৎসাহিত কাজ। আর ইদ্দতের মধ্যে স্বামী-স্ত্রীর সুলভ আচরণ ব্যতীত স্বাভাবিক কথাবার্তা বলা সম্পূর্ণ জায়েজ এবং কোনো গুনাহ নেই।
নিচে হানাফী ফিকহের কিতাব ও কুরআন-হাদীসের আলোকে বিস্তারিত দলিল-প্রমাণসহ উত্তর পেশ করছি।
রজ‘ঈ তালাক ও ইদ্দতের হুকুম
১ বা ২ তালাক (অর্থাৎ তৃতীয় তালাক না দেওয়া) রজ‘ঈ তালাক। এ তালাকের পর স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিবাহবন্ধন সম্পূর্ণ ছিন্ন হয় না; বরং ইদ্দতকাল পর্যন্ত তা বহাল থাকে। ইদ্দতের ভিতরে স্বামী চাইলে তালাক প্রত্যাহার করে নিতে পারেন (রজ‘উ) এবং এর জন্য নতুন করে বিবাহ পড়ানোর প্রয়োজন নেই। কেবল মুখে বলে দিলে বা এমন কোনো কাজ করলেই (যেমন স্ত্রীকে চুমু দেওয়া বা সহবাস করা) রজ‘উ হয়ে যায়। এই সময় স্ত্রী অন্যত্র বিয়ে করতে পারে না।
কুরআন পাকে ইরশাদ হয়েছে: "وَبُعُولَتُهُنَّ أَحَقُّ بِرَدِّهِنَّ فِي ذَٰلِكَ إِنْ أَرَادُوا إِصْلَاحًا" অর্থ: "আর তাদের স্বামীরাই তাদের ফিরিয়ে নেওয়ার অধিকতর হকদার, যদি তারা সন্ধি ও সংস্কার চায়।" (সূরা বাকারা, ২:২২৮)
অন্য আয়াতে: "الطَّلَاقُ مَرَّتَانِ ۖ فَإِمْسَاكٌ بِمَعْرُوفٍ أَوْ تَسْرِيحٌ بِإِحْسَانٍ" অর্থ: "তালাক (প্রত্যাহারযোগ্য) দুইবার। এরপর হয় ভালোভাবে রাখা, না হয় সৌজন্যের সাথে ছেড়ে দেওয়া।" (সূরা বাকারা, ২:২২৯)
এই আয়াত স্পষ্ট করে যে, দুই তালাকের পর ইদ্দতের মধ্যে স্বামী স্ত্রীকে ফিরিয়ে নিতে পারেন এবং তাদের মধ্যে সংস্কার ও মীমাংসা কাম্য।
ইদ্দতের মধ্যে আলোচনা ও সাধারণ কথাবার্তার বিধান
রজ‘ঈ তালাকের ইদ্দতে স্ত্রী স্বামীর ঘরেই থাকে (কেননা ইদ্দত গৃহে বসবাসের সময়)। তারা একে অপরের সাথে দেখা-সাক্ষাৎ ও কথা বলতে পারে। তালাক দিয়ে স্ত্রীকে বিদায় করে দেওয়া না হলেও চলবে। এমনকি স্বামী যদি ইচ্ছা করে তাহলে সহবাসও করতে পারে; তাহলেই তালাক প্রত্যাহার হয়ে যায় এবং স্বাভাবিক বৈবাহিক জীবন ফিরে আসে।
ইমাম কাসানী (রহঃ) ‘বাদায়িউস সানায়ি’-তে লেখেন:
"وإذا كان الطلاق رجعياً، فلها أن تبقى في بيت الزوجية، وللزوج أن ينظر إليها ويخلو بها ويجامعها، وهذا كله من حق الرجعة" অর্থ: "যখন তালাক রজ‘ঈ হয়, তখন স্ত্রী স্বামীর গৃহে থাকতে পারে। স্বামী তার দিকে তাকাতে, তার সাথে নির্জনে মিলিত হতে এবং সহবাস করতে পারে। এ সবই রজ‘উ করার অধিকারভুক্ত।" (বাদায়িউস সানায়ি, ৩/২১৫)
সুতরাং স্বাভাবিক কথাবার্তা, সমস্যা নিয়ে আলোচনা, পুনর্বিবাহের পরিকল্পনা ইত্যাদি তো জায়েজই, বরং উত্তম।
ফাতাওয়া আলমগীরী (হিন্দিয়া)-তে এসেছে:
"الرجعة تحصل بالوطء واللمس بشهوة وبالقول، ولو قال: راجعتك أو رددتك أو أمسكتك وغير ذلك من الألفاظ الصريحة" অর্থ: "রজ‘উ (প্রত্যাহার) হয় সহবাস, শাহওয়াতের সাথে স্পর্শ এবং মুখের কথায়। যেমন বলে: আমি তোমাকে ফিরিয়ে নিলাম, অথবা রাখলাম ইত্যাদি স্পষ্ট শব্দ।" (ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/৩৮৮)
অতএব, ইদ্দতের মধ্যে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কথা বলা বা সমস্যা মেটানোর চেষ্টা করা নিষিদ্ধ নয়; বরং এটাই কুরআনের নির্দেশ "إِنْ أَرَادُوا إِصْلَاحًا" (যদি তারা সংস্কার চায়) – যা ওয়াজিবের কাছাকাছি স্তরের একটি ভালো কাজ।
যদি আবার বৈবাহিক সম্পর্ক শুরু করার ইচ্ছা না থাকে?
এমনও হতে পারে যে, স্বামী ইদ্দত শেষে স্ত্রীকে পুরোপুরি ছেড়ে দেওয়ার ইচ্ছা রাখে। তখনও তাদের মধ্যে স্বাভাবিক মর্যাদাপূর্ণ কথাবার্তা জায়েজ। তবে এমতাবস্থায় অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠতা বা প্রেম-আদর থেকে বিরত থাকা উচিত, কেননা তালাকের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হতে পারে। কিন্তু শুধু ‘সাধারণ কথা’ বলায় কোনো বাধা নেই।
ইমাম ইবনে আবেদীন (রহঃ) রদ্দুল মুহতার -এ সতর্ক করেছেন যে, ইদ্দতের সময় স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে নিরাপত্তার জন্য পর্দা করার প্রয়োজন নেই, কারণ তারা তখনো স্বামী-স্ত্রী। তবে যদি স্বামী ইদ্দতের ভিতর স্ত্রীকে বাড়ি থেকে বের করে দেয় বা পৃথক থাকে, তাহলেও স্বাভাবিক যোগাযোগ জায়েজ। হ্যাঁ, যদি স্বামী পুনরায় বিয়ে করতে না চায়, তবে ইদ্দতের মধ্যে সহবাস বা শাহওয়াতের সাথে স্পর্শ না করাই ভালো, কারণ সেটি প্রত্যাহারের কাজে পরিগণিত হবে।
সংক্ষিপ্ত উত্তর
১. ১ বা ২ তালাকের পর ইদ্দতের মধ্যে সমস্যা মেটানো ও পুনর্বিবাহের জন্য আলোচনা করা:
জায়েজ ও অত্যন্ত ভালো কাজ। এটি কুরআন-সুন্নাহ উৎসাহিত করে।
২. স্বামী-স্ত্রীর সুলভ আচরণ ব্যতীত সাধারণ কথা বলা:
সম্পূর্ণ জায়েজ। এতে কোনো গুনাহ নেই। তবে যদি ইচ্ছা হয় যে ফিরিয়ে নেবেন না, তাহলে অপ্রয়োজনে বেশি ঘনিষ্ট না হওয়াই উত্তম; কিন্তু সাধারণ কথাবার্তা সর্বাবস্থায় জায়েজ।
৩. সন্তান লালন-পালন, আর্থিক দায়িত্ব, ভরণপোষণ ইত্যাদি নিয়েও আলোচনা করা যেতে পারে।
দলিল-প্রমাণের সারসংক্ষেপ
| প্রসঙ্গ | দলিল | |---------|------| | রজ‘ঈ তালাকের পরে স্বামী ইদ্দতের মধ্যে ফিরিয়ে নেওয়ার অধিকার রাখে | সূরা বাকারা ২:২২৮, ২২৯ | | ইদ্দতে কথাবার্তা ও সাক্ষাৎ জায়েজ | বাদায়িউস সানায়ি, ৩/২১৫ | | ফিরিয়ে নেওয়ার পদ্ধতি (কথা, কাজ) | ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/৩৮৮; রদ্দুল মুহতার, ৩/৪৮৩ | | সমস্যা মিটিয়ে ‘ইসলাহ’ করার নির্দেশ | সূরা বাকারা ২:২২৮ (إِنْ أَرَادُوا إِصْلَاحًا) |
و الله أعلم بالصواب