জ্বীনের আছর থেকে বাঁচার উপায় কি? হাম্বলী মাযহাবের আলোকে জানতে চাই?
Faith and Belief · Hanbali
Question
আমার শরীরে অনেক সময় পূর্বে খারাপ জ্বীন আছর করেছে। সে নামাজে তীব্র ওয়াসওয়াসা দেয়। আমি যখন নামাজ পড়ি তখন আল্লাহকে সেজদায় দিতে চায়। আমার হাত ব্যবহার করে মুখ ব্যবহার করে আমার পরিবারের মানুষদের গায়ে আঘাত করে। বিশেষ করে আমার মায়ের গায়ে হাত তুলতে চায়।
আমাকে কিছু নাসীহাহ দিন।
Answer
উত্তর:
ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
প্রথমেই জেনে রাখুন, আপনার এই সমস্যা শয়তান বা জ্বীনের প্রভাব থেকে হতে পারে। তবে ইসলামে যে কোনো রোগের চিকিৎসা যেমন আছে, তেমনি জ্বীনের আছর ও ওয়াসওয়াসার চিকিৎসাও কুরআন ও সুন্নাহ দ্বারা করা হয়। নিচে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নাসীহাহ (পরামর্শ) দেওয়া হলো:
১. ওয়াসওয়াসা থেকে বাঁচার উপায়
নামাজে ওয়াসওয়াসা শয়তানের একটি বড় চক্রান্ত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
"যখন তোমাদের কেউ নামাজে (বা ইবাদতে) ওয়াসওয়াসা অনুভব করে, তখন সে যেন তিনবার ‘আ‘উযু বিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজীম’ বলে এবং বাম দিকে থুথু ফেলে (হালকা করে)।"
(সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২২০৩)
এছাড়া নামাজে স্থির থাকবেন, দ্রুত পড়বেন না। শয়তানের ওয়াসওয়াসাকে গুরুত্ব দেবেন না। ইমাম আহমদ (রহ.) বলেছেন: "ওয়াসওয়াসা ইবাদতের শত্রু; এটাকে উপেক্ষা করাই একমাত্র পথ।"
২. রুকইয়াহ (কুরআনী চিকিৎসা)
আপনার শরীরে জ্বীনের আছর থাকলে কুরআন পড়ে নিজে নিজে রুকইয়াহ করুন অথবা কোনো নির্ভরযোগ্য আলেমের মাধ্যমে করান। নিচের সূরাগুলো নিয়মিত পড়ুন:
- সূরা আল-ফাতিহা (দিনে ৭ বার)
- আয়াতুল কুরসী (প্রতি ফরজ নামাজের পর ও ঘুমানোর আগে)
- সূরা আল-ইখলাস, আল-ফালাক, আন-নাস (সকাল-সন্ধ্যা ৩ বার করে)
- সূরা আল-বাকারার শেষ দুই আয়াত (প্রতি রাতে)
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: "যে ব্যক্তি রাতে আয়াতুল কুরসী পড়ে, সে এবং তার পরিবারের ওপর শয়তান সকাল পর্যন্ত কাছেও আসে না।" (সহীহ বুখারী)
৩. পরিবারের প্রতি আঘাত করা থেকে বিরত থাকা
আপনার মায়ের প্রতি হাত তোলা বড় গুনাহ। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: "মা-বাবার অবাধ্যতা ও তাদের প্রতি হাত তোলা কবিরা গুনাহ।" (বুখারী ও মুসলিম)
আপনি যখন রাগ বা ওয়াসওয়াসা অনুভব করেন, তখন দ্রুত:
- আ‘উযু বিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজীম বলুন।
- ওযু করে নিন বা ঠাণ্ডা পানি মুখে দিন।
- যদি পারেন, স্থান পরিবর্তন করুন (ঘর থেকে বেরিয়ে যান)।
- নিজেকে স্মরণ করিয়ে দিন, এই কাজ শয়তানের পক্ষ থেকে।
৪. বিশেষজ্ঞ আলেমের শরয়ী চিকিৎসা নিন
যেহেতু আপনার শরীরে জ্বীনের প্রভাব আছে, তাই কোনো অভিজ্ঞ ও আমলদার আলেমের মাধ্যমে রুকইয়াহ করানো জরুরি। শায়খুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ (রহ.) বলেছেন: "জ্বীনের আছরের চিকিৎসা কুরআন ও দোয়া দ্বারা করাই সুন্নাহ; তাতে কোনো অপবাদ নেই।" (মাজমু‘ ফাতাওয়া, ১৯/৬৪)
৫. দৈনিক যিকির ও সুরক্ষা
- সকাল-সন্ধ্যার যিকির (বিশেষ করে ‘বিসমিল্লাহিল্লাযি লা ইয়াদুররু মাআসমিহি শাইউন ফিল আরদি ওয়ালা ফিস সামা’...)
- ঘরে প্রবেশ ও বের হওয়ার সময় দোয়া পড়া।
- নিজের বিছানায় সূরা ইখলাস, ফালাক, নাস ফুঁকে হাত ঘষে শরীরের যেখানে পৌঁছায় সেখানে মাসেহ করা।
৬. আল্লাহর ওপর ভরসা ও ধৈর্য
আল্লাহ বলেন:
"নিশ্চয়ই শয়তানের চক্রান্ত দুর্বল।" (সূরা আন-নিসা: ৭৬)
আপনি যত বেশি আল্লাহর ওপর ভরসা করবেন, শয়তানের প্রভাব তত কমবে। ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.) বলেছেন: "ওয়াসওয়াসা থেকে বাঁচার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো আল্লাহর যিকির ও কুরআন তিলাওয়াতে মনোযোগী হওয়া।" (মাদারিজুস সালিকীন)
উপসংহার
উপরের কাজগুলো নিয়মিত করুন। ধৈর্য ধরে চলতে থাকুন। শয়তান হতাশ হয়ে ছেড়ে দেবে। তবে যদি অবস্থা খারাপ হয়, তাহলে দ্রুত আলেমের শরণাপন্ন হন।
আল্লাহ আপনার ওপর থেকে জ্বীনের ক্ষতি দূর করুন এবং আপনাকে সুস্থতা দিন। আমীন।