ঘুমে, মনে মনে বা অনিচ্ছাকৃতভাবে তালাক বললে কি তালাক হয়?
Marriage and Divorce · Ahle Hadith / Salafi
Question
1. রাত্রি তে ঘুমিয়ে ছিলাম , হটাৎ তালাক কথা টা মনে হয়, আমি তখন মনে মনে ভাবছি , মনে মনে বললে কিছু হয়না। দিয়ে আবার ঘুমিয়ে গেলাম দিয়ে মনে মনে তালাক কথা টা হয়েছে, দিয়ে আমি নিশ্চিন্ত নয় যে আমি উচ্চরণ করেছি কিনা,তাই আমি কয়েকবার মনে মনে আর হালকা একদম হালকা ঠোঁট নাড়িয়ে তালাক কথা টা বলে দেখছিলাম যে আমি উচ্চরণ করেছিলাম নাকি আসলে আমি উচ্চরণ করিনি , আমি এই রকম করে দেখছিলাম নিশ্চিন্ত হওয়ার জন্য , কোনো খারাপ উদ্দেশ্য নিয়ে বলিনি এর জন্য কি তালাক হবে?
2.হুজুর কদিন থেকে আমি তালাক বা শর্ত তালাক নিয়ে অটোমেটিক ভাবনা চলে আসছে, আমি সব সময় মুখ বন্দ করে রাখছি, ভয় এ ,কিছু উচ্চরণ হয়ে যাবে বলে,
হুজুর বিষয় হলো আমি ঘুমিয়ে ছিলাম , হটাৎ আমার মনে হলো আমি কিছু বললাম , দিয়ে সঙ্গে সঙ্গে ঘুম ভেঙে গেলো দিয়ে ভাবলাম আমি কি বললাম , তখন একটু একটু মনে ছিল আমি কিছু বলেছি হালকা জিহ্ববা নড়েছে , মনে হলো তালাক বলেছি বা শর্ত তালাক বিষয় এ , বলেছি , কিন্তু সঠিক মনে ছিল না দিয়ে আবার ঘুমিয়ে জাই, দিয়ে যখন ঘুম ভাঙলো তখন তখন আর কিছু মনে পড়ছে না , শুধু মনে হচ্ছে তালাক বা শর্ত তালাক বিষয় এ হয়ত কিছু বলেছি, কিন্তু আমার স্পষ্ট কিছু ই মনে পড়ছে না। কিচ্ছু মনে পড়ছে না অনেক চেষ্টা করলাম তাও মনে পড়ছে না। আর হুজুর আমি ইচ্ছা কৃত কিছু বলিনি অটোমেটিক ঘুমের মধ্যে বা হালকা ঘুম ভেঙেছে সেই মুর্হুতে বলে ফেলেছি, হুজুর কোনো কিছুই মনে পড়ছে না স্পষ্ট ভাবে হুজুর এক্ষেত্রে কি কোনো তালাক বা শর্ত তালাক হবে?
3. হুজুর আমি এই বিষয় এ অনেক ভাবলাম দিয়ে মনে হচ্ছে, অনেক ভাবার পর এটাই মনে হলো আমার হয়ত হাই উটেছিল , দিয়ে অটোমেটিক তালাক কথা টা হালকা জিব নড়িয়ে বলা হয়েছে। এতে আমার কোনো ইচ্ছা ছিল না , সম্পূর্ণ অনিচ্ছাকৃত ও উদ্দেশ্য হীন ভাবে বলা হয়েছে , কোনো উদ্দেশ্য ছিল না এমনি বিনা কারণে বিনা উদ্দেশ্যে কথা টা হয়েছে এর জন্য কি তালাক হবে? ( Plz হুজুর এইটার উত্তর দিবেন এইটা মনে হচ্ছে এখন)
দিয়ে শয়তানের ওয়াসওয়াসা তে মনে হচ্ছে যা বলেছি ঠিক বলেছি এমন মনে হচ্ছে কিন্তু মুখে উচ্চরণ করিনি। হুজুর আমার কোনো উদ্দেশ্য ই ছিল না এমনি কথা টা বেরিয়ে গিয়েছে। হুজুর এক্ষেত্রে তালাক হবে?
Answer
উত্তর
ওয়ালাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।
আপনার প্রশ্নটি মনোযোগ দিয়ে পড়েছি। আপনি তালাক নিয়ে শয়তানের ওয়াসওয়াসায় (ভ্রান্ত ধারণা) ভুগছেন। নিচে প্রতিটি পয়েন্টের উত্তর কুরআন ও সহীহ হাদীসের আলোকে এবং সালাফী/আহলে হাদীস ফিক্বহ অনুযায়ী দেওয়া হল।
১. তালাক মনে মনে বলা বা ঠোঁট নাড়িয়ে বলা (উচ্চারণ নিশ্চিত না হওয়া)
রুল:
- মনে মনে তালাক বললে কোনো তালাক হয় না। কারণ তালাকের জন্য মুখে উচ্চারণ এবং ইচ্ছা উভয়ই শর্ত।
- রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: "নিশ্চয়ই আল্লাহ আমার উম্মতের মনে যা খেয়াল হয় তা ক্ষমা করে দেন, যতক্ষণ না তারা তা বলে বা কাজ করে।" (সহীহ বুখারী: ২৫২৮, সহীহ মুসলিম: ১২৭)
- আপনি যখন ঠোঁট নাড়িয়ে দেখছিলেন যে আগে উচ্চারণ করেছিলেন কিনা, তাহলে আপনার উদ্দেশ্য ছিল তালাক দেওয়া নয়, বরং নিশ্চিত হওয়া। যেহেতু আপনার নিয়ত তালাকের ছিল না, তাই এতে তালাক হবে না। ইমাম ইবনে তাইমিয়্যাহ ও ইবনুল কাইয়্যিম রাহিমাহুমুল্লাহ বলেছেন: "তালাক নির্ভর করে উচ্চারণ ও নিয়তের ওপর; নিয়ত না থাকলে তালাক হয় না।" (মাজমু’ ফাতাওয়া: ৩৩/২৭০)
সারাংশ: আপনার এই কাজে কোনো তালাক হয়নি।
২. ঘুমের মধ্যে বা ঘুম ভাঙার মুহূর্তে না জেনে তালাক বলা
রুল:
- ঘুমন্ত ব্যক্তির তালাক বৈধ নয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: "তিন ব্যক্তি থেকে কলম উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে: ঘুমন্ত ব্যক্তি, যতক্ষণ না জাগে; নাবালেগ, যতক্ষণ না বালেগ হয়; এবং পাগল, যতক্ষণ না সুস্থ হয়।" (সুনান আবু দাউদ: ৪৪০৩, সহীহ ইবনে হিব্বান)
- আপনি যদি আধা-ঘুম অবস্থায় (ঘুম ভাঙার সাথে সাথে) কোনো কথা বলে ফেলেন এবং পরিষ্কার মনে না থাকে কী বলেছেন, তাহলে তা তালাক গণ্য হবে না। শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ বলেন: "যে ব্যক্তি কথা বলার সময় জানে না কী বলছে, যেমন ঘুমন্ত বা বেহুঁশ, তার কথা কোনো প্রভাব ফেলে না।" (মাজমু’ ফাতাওয়া: ৩৪/৪২)
- আপনার কোনো তালাক হয়নি। শয়তানের ওয়াসওয়াসা থেকে বাঁচতে এসব নিয়ে বারবার চিন্তা করবেন না।
৩. হাই তোলার সময় অনিচ্ছাকৃতভাবে ‘তালাক’ শব্দ বেরিয়ে আসা
রুল:
- সম্পূর্ণ অনিচ্ছাকৃত এবং উদ্দেশ্যহীনভাবে কোনো কথা বেরিয়ে গেলে তা গণ্য হবে না। তালাকের জন্য স্পষ্ট ইচ্ছা (নিয়ত) ও উচ্চারণ প্রয়োজন।
- আপনি নিজেই বলেছেন: "আমার কোনো ইচ্ছা ছিল না, সম্পূর্ণ অনিচ্ছাকৃত ও উদ্দেশ্যহীনভাবে..."
- শাইখ ইবনে উসাইমীন রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন: "যদি কেউ রাগ বা ভুলবশত তালাক বলে ফেলে, এবং তার মানসিক অবস্থা এমন থাকে যে সে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি, তাহলে তালাক পতিত হয় না।" (ফাতাওয়া নূরুন আলাদ দরব: ৪/২)
- যেহেতু হাই তোলার সময় আপনি নিয়ন্ত্রণহীন ছিলেন, তাই এটাও কোন তালাক নয়।
শয়তানের ওয়াসওয়াসা : কী করবেন?
আপনার বর্তমান অবস্থায় শয়তান বারবার তালাকের চিন্তা ও সন্দেহ ঢুকিয়ে দিচ্ছে। এর প্রতিকার:
-
ওয়াসওয়াসাকে গুরুত্ব দেবেন না। এটা শয়তানের কুমন্ত্রণা। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: "শয়তান তোমাদের কাছে আসে এবং বলে, 'কে এই সৃষ্টি করেছে? কে ঐ সৃষ্টি করেছে?' এমনকি বলে, 'আল্লাহ কে সৃষ্টি করেছে?' তখন তোমরা এ থেকে আল্লাহর কাছে পানাহ চাও এবং থেমে যাও।" (সহীহ বুখারী: ৩২৭৬)
-
মুখ বন্ধ করে রাখার দরকার নেই। স্বাভাবিকভাবে চলুন। তালাকের কথা ভাবলেই 'আউযু বিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজীম' পড়ুন এবং অন্য কাজে মনোযোগ দিন।
-
ইচ্ছাকৃতভাবে তালাক শব্দ উচ্চারণ করা থেকে বিরত থাকুন। তবে ভুলে বা অনিচ্ছায় উচ্চারিত হলে তালাক হবে না।
চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত
আপনার বর্ণিত তিনটি অবস্থানের কোনোটিতেই তালাক পতিত হয়নি। আপনি আপনার স্ত্রীর সাথে স্বাভাবিক দাম্পত্য জীবন চালিয়ে যেতে পারেন। বারবার মনে সন্দেহ এলে শয়তানের ওয়াসওয়াসা মনে করবেন এবং এড়িয়ে চলবেন। প্রয়োজনে একজন আলেমের সাথে সরাসরি পরামর্শ করুন।
আল্লাহ আপনাকে শয়তানের ওয়াসওয়াসা থেকে হেফাজত করুন। আমিন।