ফজর ও আসরের ওয়াক্তে কাযা নামাজ পড়ার বিধান
Salah-Prayer · Hanafi
Question
Answer
প্রশ্নের উত্তর
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
ফজর ও আসরের ওয়াক্তে (অর্থাৎ ফজরের ফরজ নামাজের পর থেকে সূর্য উদয় হওয়া পর্যন্ত এবং আসরের ফরজ নামাজের পর থেকে সূর্য অস্ত যাওয়া পর্যন্ত) নফল নামাজ পড়া নিষিদ্ধ (মাকরুহ তাহরিমি)। তবে কাযা নামাজ (ফরজ বা ওয়াজিব নামাজের কাযা) পড়া জায়েজ ও বৈধ। কেননা কাযা নামাজ নফলের মতো নয়; এটি আদায় করা জরুরি (ওয়াজিব) এবং তা সময়মতো পড়ার সুযোগ ফুরিয়ে গেছে। তাই উক্ত সময়গুলোতে কাযা নামাজ আদায় করা যায়, তবে নফল পড়া যাবে না।
দলিল ও বিস্তারিত ব্যাখ্যা
১. হাদিসের আলোকে: রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন:
"ফজরের নামাজের পর সূর্য উদয় না হওয়া পর্যন্ত কোনো নামাজ নেই এবং আসরের নামাজের পর সূর্য অস্ত না যাওয়া পর্যন্ত কোনো নামাজ নেই।" (সহিহ বুখারী, হাদিস: ৫৮৬; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৮২৬)
এই হাদিসে উল্লেখিত 'কোনো নামাজ নেই' দ্বারা নফল নামাজ উদ্দেশ্য। কারণ ফরজ ও ওয়াজিব নামাজের কাযা এই সময় করতেও নিষেধ নেই, বরং তা জায়েজ। প্রমাণ হলো:
- হাদিসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) নিজে ফজরের পর সূর্য উদয়ের আগে কখনো কখনো ফজরের সুন্নতের কাযা পড়েছেন। (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৪২১; সহিহ ইবনে খুজাইমা, হাদিস: ১১১৯)
২. হানাফি ফিকহের কিতাবসমূহে স্পষ্ট নির্দেশনা:
- ইমাম কাসানী (রহ.) ‘বাদাইউস সানাই’ গ্রন্থে বলেন:
"ফজরের পর থেকে সূর্যোদয় পর্যন্ত এবং আসরের পর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত নফল নামাজ মাকরুহ। কিন্তু ফরজ নামাজের কাযা এবং জানাজার নামাজ এই সময় পড়া মাকরুহ নয়।" (বাদাইউস সানাই, ১/২৮৬)
- ইবনে আবেদিন (রহ.) ‘রদ্দুল মুহতার’ গ্রন্থে বলেন:
"যে সময়ে নফল নামাজ মাকরুহ, সেই সময়ে ফরজের কাযা, ওয়াজিবের কাযা এবং সিজদায়ে তিলাওয়াত করা জায়েজ।" (রদ্দুল মুহতার, ১/৩৮১-৩৮২)
- ফতোয়ায়ে হিন্দিয়া (আলমগীরি) তেও উল্লেখ আছে:
"ফজরের পর থেকে সূর্যোদয় পর্যন্ত এবং আসরের পর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত নফল নামাজ মাকরুহ, তবে কাযা নামাজ মাকরুহ নয়।" (ফতোয়ায়ে হিন্দিয়া, ১/১০৮)
৩. স্বতন্ত্র নিষিদ্ধ সময় (মাকরুহে তাহরিমির সময়): তবে হ্যাঁ, তিনটি সময়ে কোনো প্রকার নামাজ (ফরজ, ওয়াজিব, নফল, কাযা, এমনকি জানাজার নামাজও) পড়া হারাম (গুরুতররূপে মাকরুহ তাহরিমি)। এই সময়গুলো হলো:
- সূর্য উদয় হওয়ার সময় (যতক্ষণ না সম্পূর্ণ রশ্মি বের হয়)
- সূর্য ঠিক মধ্যগগনে থাকার সময় (যতক্ষণ না হেলে যায়)
- সূর্য অস্ত যাওয়ার সময় (যতক্ষণ না সম্পূর্ণ অস্ত যায়)
ফজর ও আসরের ওয়াক্তে কাযা পড়ার সময় এই তিন সময় সম্মুখীন হলে সে সময় বিরত থাকতে হবে এবং পরবর্তী অনুমোদিত সময়ে পড়তে হবে। (রদ্দুল মুহতার, ১/৩৭৩)
ফজর ও আসরের ওয়াক্তে কাযা পড়ার নিয়ম
- ফজরের ওয়াক্তে কাযা: ফজরের ফরজ আদায়ের পর থেকে সূর্য উদয় হওয়ার আগ পর্যন্ত যেকোনো ফরজ বা ওয়াজিবের কাযা পড়া যাবে। তবে ফজরের সুন্নত আদায়ের পর কাযা পড়লে সে সুন্নত আর পড়তে হবে না (যেহেতু সুন্নত কাযা হয় না)।
- আসরের ওয়াক্তে কাযা: আসরের ফরজ আদায়ের পর থেকে সূর্য অস্ত যাওয়ার আগ পর্যন্ত যেকোনো ফরজ বা ওয়াজিবের কাযা পড়া যাবে। তবে সূর্য অস্ত যাওয়ার সময় (সূর্যের লালিমা চলে যাওয়ার পর) কাযা পড়া থেকে বিরত থাকতে হবে।
জরুরি টিকা
- নফল নামাজ (যেমন: ইশরাক, চাশত, তাহিয়্যাতুল মসজিদ ইত্যাদি) ফজরের পর সূর্যোদয় পর্যন্ত এবং আসরের পর সূর্যাস্ত পর্যন্ত পড়া মাকরুহ তাহরিমি। তাই এই সময়গুলোতে নফল পরিত্যাগ করা উচিত।
- মৃত ব্যক্তির জানাজার নামাজ এবং সিজদায়ে তিলাওয়াত ফজর ও আসরের সময় জায়েজ।
- সময়ের শেষভাগে (যেমন: সূর্য উদয়ের খুব কাছে বা সূর্যাস্তের খুব কাছে) কাযা পড়া থেকে বিরত থাকাই উত্তম, যদিও তা জায়েজ।
উত্তর সংক্ষেপে
- ফজর ও আসরের ওয়াক্তে কাযা নামাজ পড়া জায়েজ, হারাম বা মাকরুহ নয়।
- একই ওয়াক্তে নফল নামাজ পড়া মাকরুহ তাহরিমি (গুনাহের কাজ)।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সঠিক বুঝ দান করুন এবং ইবাদত কবুল করুন। (আমিন)