আইনজীবী হওয়া কি ইসলামে বৈধ?

Halal and Haram · Hanafi

Question No: 2087
Questioner: Munni Aktar
Question Asked: 27 Jun 2026, 04:38 PM
Reviewed & Published: 27 Jun 2026, 04:44 PM
Views: 139
Tokens: 3,564
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

এলএলবি নিয়ে পড়াশোনা করে ওকালতি করা কি হারাম?

Answer

উত্তর
بسم الله الرحمن الرحيم

এলএলবি পড়ে ওকালতি (আইন পেশা) করা নিজে হারাম নয়। বরং এটি একটি জায়েজ পেশা, তবে এর সাথে কিছু শর্ত ও সতর্কতা জড়িত। ইসলামী শরিয়তে ওকালতি বা আইনজীবী হওয়া জায়েজ, যদি তা সত্য ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠার জন্য হয়। কিন্তু যদি মিথ্যা, জুলুম বা হারাম কাজের পক্ষে সওয়াল করা হয়, তবে তা হারাম হবে। নিম্নে হানাফী ফিকহের কিতাব ও উসুলের আলোকে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।


১. ওকালতির মৌলিক বিধান

ইসলামে ওকালতি (وكالة) একটি বৈধ পদ্ধতি, যার মাধ্যমে কোনো ব্যক্তি অপর ব্যক্তিকে নিজের পক্ষে কোনো বৈধ কাজ সম্পাদনের দায়িত্ব দেয়। আল্লাহ তাআলা বলেন:
﴿فَابْعَثُوا أَحَدَكُمْ بِوَرِقِكُمْ هَذِهِ إِلَى الْمَدِينَةِ﴾ (সূরা কাহফ: ১৯)
“তোমাদের একজনকে এই রৌপ্য মুদ্রা দিয়ে শহরে পাঠাও।”

হানাফী ফিকহের কিতাবে ওকালতির বিধান বিস্তারিত বর্ণিত হয়েছে। যেমন রদ্দুল মুহতার (৫/৫০১)-এ বলা হয়েছে:
"الوكالة عقد جائز يفتقر إلى الإيجاب والقبول، وتصح بالمعروف من الأمور"
“ওকালতি একটি জায়েজ চুক্তি, যা ইজাব ও কবুলের মাধ্যমে হয়, এবং বৈধ বিষয়েই তা সহিহ হয়।”


২. ওকালতি পেশার শর্তাবলী

ওকালতি পেশা গ্রহণ করা জায়েজ হওয়ার জন্য কয়েকটি শর্ত রয়েছে:

  • ক. শুধুমাত্র ইনসাফ ও সত্যের পক্ষে ওকালতি করা। যেমন কোনো নিরপরাধ ব্যক্তির পক্ষে সওয়াল করা বা কোনো অধিকার আদায়ে সাহায্য করা।
  • খ. মিথ্যা, প্রতারণা, জুলুম বা হারাম কাজের পক্ষে ওকালতি না করা।
  • গ. এমন কোনো মামলা না নেওয়া যাতে সুদ, ঘুষ, মিথ্যা সাক্ষ্য বা শরিয়ত বিরোধী কোনো বিষয় জড়িত।
  • ঘ. আদালতে দেওয়া বক্তব্য ও প্রমাণাদি সত্য ও ন্যায়ভিত্তিক হওয়া।

ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.) বলেন:
"لا بأس بأن يوكل الرجل غيره في الخصومة إذا كان الحق معه"
“কোনো ব্যক্তি যদি নিজের হক (অধিকার) আদায়ের জন্য অপরকে ওকালত দিতে পারে, তাতে দোষ নেই।” (কিতাবুল আছল, ৩/২১২)


৩. এলএলবি পড়ার বিধান

এলএলবি পড়া জ্ঞান অর্জনের অন্তর্ভুক্ত। ইসলামে জ্ঞানার্জন ফরজ বা মুস্তাহাব হতে পারে। যে জ্ঞান দ্বারা মানুষকে হক ও ইনসাফের পথ দেখানো যায়, তা অর্জন করা উত্তম। তবে যদি কোনো প্রতিষ্ঠানে এমন আইন পড়ানো হয় যা সরাসরি কুফর বা হারামকে বৈধ করে (যেমন সুদ, জুয়া, ব্যভিচারের বৈধতা), তাহলে সেসব বিষয় পড়া ও শিক্ষা দেওয়া জায়েজ নয়। কিন্তু সাধারণত এলএলবি পাঠ্যক্রমে কেবল দেশের প্রচলিত আইন ও সাংবিধানিক বিধান পড়ানো হয়, যা শরিয়তের পরিপন্থী নয়—এমন ক্ষেত্রে তা জায়েজ।

মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) –এর ফতোয়া:
"ইসলামী আইন ও দেশের প্রচলিত আইন জানার জন্য আইন শিক্ষা গ্রহণ করা জায়েজ, তবে এতে শরিয়তবিরোধী বিষয় যেন অন্তর্ভুক্ত না হয়। আর ওকালতি পেশায় নিয়োজিত হলে হারাম মামলা থেকে বিরত থাকা আবশ্যক।" (ইমদাদুল ফতোয়া, ৪/৩১২)


৪. যেসব ক্ষেত্রে ওকালতি হারাম

নিম্নলিখিত ক্ষেত্রে ওকালতি করা স্পষ্টভাবে হারাম:

  • মিথ্যা মামলা পরিচালনা করা — যেমন জানা সত্ত্বেও মিথ্যা সাক্ষী হাজির করা বা বানানো প্রমাণ উপস্থাপন করা।
  • অপরাধীর পক্ষে ওকালতি করা — যদি সে দোষী হয় এবং তার অপরাধ প্রমাণিত হয়, তবে তাকে বাঁচানোর চেষ্টা করা জুলুম।
  • সুদ, জুয়া, হারাম ব্যবসা সংক্রান্ত মামলা করা — এগুলো শরিয়তের দৃষ্টিতে বাতিল।
  • মুসলিমের বিরুদ্ধে অন্যায়ভাবে মামলা পরিচালনা করা — যেমন কোনো ইসলামী বিধান বাস্তবায়নে বাধা দেওয়া বা মুসলিমের অধিকার ক্ষুণ্ণ করা।

ফতোয়া হিন্দিয়া (৩/৩৯৫)-এ বলা হয়েছে:
"وَلَا يَجُوزُ الْوَكَالَةُ بِالْخُصُومَةِ فِي الْبَاطِلِ"
“বাতিল বিষয়ে মোকদ্দমা পরিচালনার জন্য ওকালতি নেওয়া জায়েজ নয়।”


৫. হানাফী ফকিহদের বক্তব্য ও ফতোয়া

মুফতি তাকি উসমানী (দা. বা.) বলেছেন:
"আজকের যুগে একজন মুসলিম আইনজীবী হওয়া জায়েজ, তবে তাকে অবশ্যই হারাম মামলা এড়িয়ে চলতে হবে। তিনি যদি সৎ উদ্দেশ্যে ওকালতি করেন এবং ইসলামী আদালতে ন্যায় প্রতিষ্ঠায় সাহায্য করেন, তবে তা ইবাদতের শামিল।" (ফতোয়া উসমানী, ২/৪৫০)

আল্লামা ইবনে আবেদীন শামী (রহ.) বলেন:
"وَكَالَةُ الْخُصُومَةِ جَائِزَةٌ إذَا كَانَ الْمُوَكِّلُ مَحْقًّا" — “মোকদ্দমার ওকালতি জায়েজ, যদি মোকদ্দমাকারী সত্যের পক্ষে হয়।” (রদ্দুল মুহতার, ৫/৫০৯)


৬. বর্তমান প্রেক্ষাপটে সতর্কতা

বর্তমানে দেশের প্রচলিত আইন ব্যবস্থা ইসলামি শরিয়ত থেকে অনেক ক্ষেত্রে ভিন্ন। তাই একজন মুসলিম আইনজীবীকে নিচের বিষয়গুলো খেয়াল রাখতে হবে:

  • শরিয়তবিরোধী মামলা নেওয়া থেকে বিরত থাকা।
  • আদালতে সত্য কথা বলা এবং মিথ্যা প্রমাণ উপস্থাপন না করা।
  • সুদ ও হারাম লেনদেনের মামলা না নেওয়া।
  • মুসলিমদের অধিকার রক্ষায় সচেষ্ট থাকা।

যদি কোনো আইনজীবী এগুলো মেনে চলেন, তাহলে তাঁর পেশা জায়েজ এবং প্রশংসনীয়। আর যদি এসব লঙ্ঘন করে মিথ্যা ও জুলুমের পক্ষে দাঁড়ান, তবে তা হারাম ও কবিরা গুনাহ।


সারসংক্ষেপ

  • এলএলবি পড়া ও ওকালতি করা নিজে হারাম নয়।
  • এটি জায়েজ, তবে তা ন্যায় ও ইনসাফের জন্য হতে হবে।
  • মিথ্যা, জুলুম, সুদ ও অন্যান্য হারাম কাজের পক্ষে ওকালতি করা হারাম।
  • একজন মুসলিম আইনজীবীর উচিত হারাম মামলা এড়িয়ে চলা এবং শরিয়তের সীমার মধ্যে থেকে পেশা পরিচালনা করা।

উত্তরের সারমর্ম:
এলএলবি পড়া জায়েজ এবং ওকালতি পেশা ন্যায়ের পক্ষে হলে জায়েজ, অন্যথায় হারাম।

والله أعلم بالصواب



This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.