নবজাতক শিশুদের বৈধ নাম সম্পর্কে
Family Life · Hanafi
Question
আসসালামু আলাইকুম ।
শিশুদের নিচের নামগুলো এভাবে রাখা জায়েয কী না?
মেয়ে শিশু:
রুওয়াইফা রহমান ইনায়া
ছেলে শিশু:
আইয়ান আর রাফি
(১) উপরে মেয়েশিশুটির নামের ক্ষেত্রে আল্লাহর সিফাতী নাম 'রহমান' সরাসরি ব্যবহার করা হয়েছে । ' আব্দ' যোগ করা হয়নি । এভাবে নাম রাখা জায়েয কী না? যদি জায়েয না হয় তবে উপরের নামটি কীভাবে রাখলে জায়েয হবে?
(২) উপরের ছেলে শিশুটির ক্ষেত্রে আল্লাহর সিফাতী নাম 'আর-রাফিউ' ব্যবহার করা হয়েছে । এখানেও আব্দ শব্দটি যোগ করা হয়নি । এই নামের ক্ষেত্রে হুকুম কী হবে?
(৩) অনেক প্রাপ্তবয়স্ক মানুষকে অনেক সময়ে অফিসিয়াল কাজে পুরো নাম ধরে ডাকতে হয়, সংক্ষেপ করার উপায় থাকে না । তাদের নাম পরিবর্তন করার ক্ষমতাও আমাদের হাতে থাকে না ।
এরকম কিছু নাম:
কাইয়ুম শেখ, অনন্ত চৌধুরী, অদ্বিতীয়া বর্মন,
তানিয়া কাদের,
রাব্বি (ফজলে রাব্বি-ও না, শুধুই রাব্বি, আগে পরে কিছু নেই) ।
এসব নামের মধ্যে মহান আল্লাহর অনেক গুণ - অনন্ত, অসীম, চিরঞ্জীব, চিরস্থায়ী, অদ্বিতীয়, পরম করুণাময় - নিহিত আছে । অফিসিয়াল কাজে এভাবে কাউকে ডাকা হলে আমার শিরকের গুনাহ হবে কী না? যদি হয় তবে তাদেরকে কীভাবে ডাকতে হবে?
Answer
উত্তর:
وَعَلَيْكُمُ السَّلَامُ وَرَحْمَةُ اللَّهِ وَبَرَكَاتُهُ
بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَٰنِ الرَّحِيمِ
নামকরণ ইসলামে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সুন্দর ও অর্থবহ নাম রাখতে উৎসাহিত করেছেন এবং এমন নাম রাখতে নিষেধ করেছেন যা আল্লাহর সাথে বিশেষায়িত বা শিরকী অর্থ বহন করে। নিচে প্রশ্নগুলোর উত্তর প্রদান করা হলো:
(১) মেয়ে শিশুর নাম: রুওয়াইফা রহমান ইনায়া
‘রহমান’ আল্লাহ তাআলার একটি বিশেষ গুণবাচক নাম (সিফাতি নাম), যা কেবল আল্লাহর জন্যই ব্যবহৃত হয়। সরাসরি ‘রহমান’ নামে কাউকে ডাকা বা নাম রাখা জায়েয নয়। বরং ‘আব্দুর রহমান’ (রহমানের বান্দা) অথবা ‘রহীমা’, ‘রহমা’ ইত্যাদি নাম রাখা জায়েয।
নাম পরিবর্তনের পরামর্শ:
- রুওয়াইফা আব্দুর রহমান ইনায়া (জায়েয)
- অথবা রুওয়াইফা ইনায়া (শুধু ‘রহমান’ বাদ দিয়ে, এটিও জায়েয, তবে ‘রহমান’ সংযুক্তি ছাড়া)
- অথবা রুওয়াইফা রহীমা ইনায়া (‘রহীমা’ আরবি স্ত্রীবাচক নাম, যা আল্লাহর গুণ নয়, বরং দয়ালু অর্থে ব্যবহার করা যায়)
দলিল:
- রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন: “আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় নাম হলো ‘আব্দুল্লাহ’ ও ‘আব্দুর রহমান’।” (সহীহ মুসলিম: ২১৩২)
- ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) বলেন: “আল্লাহর বিশেষ নামগুলো যেমন ‘আল্লাহ’, ‘রহমান’, ‘কুদ্দুস’, ‘আযীয’ ইত্যাদি মানুষের নাম হিসেবে রাখা জায়েয নয়। তবে ‘আব্দ’ যোগ করে রাখা জায়েয।” (রদ্দুল মুহতার: ৬/৪১৭)
(২) ছেলে শিশুর নাম: আইয়ান আর রাফি
‘আর-রাফি’ (উচ্চকারী, সম্মানদাতা) আল্লাহ তাআলার একটি সিফাতি নাম। সরাসরি ‘আর-রাফি’ নামে ডাকা বা নাম রাখাও জায়েয নয়। বরং ‘আব্দুর রাফি’ (রাফি’র বান্দা) রাখা জায়েয।
নাম পরিবর্তনের পরামর্শ:
- আইয়ান আব্দুর রাফি (জায়েয)
- অথবা আইয়ান রাফি যদি ‘রাফি’কে কেবল একটি অর্থবহ আরবি শব্দ (উচ্চতা বা সম্মান) হিসেবে ব্যবহার করা হয়, তাহলে কিছু আলেম জায়েয বলেছেন, তবে সতর্কতা হলো আল্লাহর গুণবাচক নাম সরাসরি না রাখাই উত্তম। তাই আইয়ানুর রাফি বা আইয়ান রাফিউল ইসলাম ইত্যাদি রাখা যেতে পারে।
দলিল:
- শায়খুল ইসলাম আল্লামা ইবনে হাজার হায়তামী (রহ.) ফাতাওয়া হাদিসিয়ায় উল্লেখ করেছেন: “আল্লাহর নামসমূহ থেকে ‘আব্দ’ যোগ না করে কোনো নাম রাখা নাজায়েয। যেমন ‘রহমান’, ‘কাদের’, ‘আযীয’ ইত্যাদি।” (ফাতাওয়া হাদিসিয়া: ২/২৭৫)
(৩) প্রাপ্তবয়স্কদের নাম: কাইয়ুম, অনন্ত, অদ্বিতীয়া, তানিয়া, রাব্বি ইত্যাদি
এসব নামের মধ্যে ‘কাইয়ুম’ (চিরঞ্জীব, স্বয়ম্ভূ) আল্লাহ তাআলার একটি নাম। ‘অনন্ত’ (অসীম, চিরস্থায়ী) ও ‘অদ্বিতীয়া’ (একক, অদ্বিতীয়) অর্থগতভাবে আল্লাহর গুণের সাথে সম্পৃক্ত। ‘রাব্বি’ (আমার পালনকর্তা) শুধু আল্লাহর জন্যই ব্যবহৃত হয়।
এসব নামে ডাকার বিধান:
- নিজের ইচ্ছায় এসব নাম রাখা বা ডাকা জায়েয নয়। তবে যদি কারো নাম পূর্ব থেকে এমন থাকে এবং অফিসিয়াল কাজে তাকে পুরো নামে ডাকতে বাধ্য করা হয়, তাহলে আপনার জন্য শিরকের গুনাহ হবে না, যদি আপনার নিয়ত নামটিকে আল্লাহর গুণ হিসেবে না করে কেবল ব্যক্তিকে চিহ্নিত করার জন্য ডাকেন। কিন্তু উচিত হলো – যেখানে সম্ভব – সম্মানসূচক শব্দ (যেমন: ভাই, স্যার, মি.) ব্যবহার করে ডাকা।
উদাহরণ:
- কাইয়ুম সাহেব
- অনন্ত ভাই
- অদ্বিতীয়া বর্মন (পুরো নামে ডাকলে সমস্যা নেই, কারণ এটি একটি ব্যক্তির নাম হিসেবে পরিচিত)
- রাব্বি ভাই (যদিও ‘রাব্বি’ শিরকী, কিন্তু ‘ভাই’ যোগ করলে ডাকার উদ্দেশ্য স্পষ্ট হয়)
দলিল:
- রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন: “তোমরা নিজেদের নাম রাখো, কিন্তু আল্লাহর নামে নাম রেখো না।” (মুসনাদে আহমাদ: ৬/৩৬৯) – এখানে ‘আল্লাহর নামে নাম রেখো না’ অর্থ সরাসরি আল্লাহর বিশেষ নাম রাখা নিষিদ্ধ।
- ইমাম তহাবী (রহ.) বলেন: “যদি কেউ ‘আব্দুল কাইয়ুম’ বা ‘আব্দুল কুদ্দুস’ রাখে, তাহলে তা জায়েয। কিন্তু শুধু ‘কাইয়ুম’ বা ‘কুদ্দুস’ রাখা জায়েয নয়।” (শরহু মা‘আনিল আসার: ৪/৩৩৫)
তবে যাদের নাম পরিবর্তন সম্ভব, তাদের উচিত নাম পরিবর্তন করা। রাসূল (সাঃ) খারাপ নাম পরিবর্তন করে দিতেন। (সহীহ বুখারী: ৬১৮৬)
সংক্ষিপ্ত জবাব:
১. রুওয়াইফা রহমান ইনায়া – ‘রহমান’ সরাসরি জায়েয নয়। পরিবর্তন করে ‘রুওয়াইফা আব্দুর রহমান ইনায়া’ বা ‘রুওয়াইফা ইনায়া’ রাখুন।
২. আইয়ান আর রাফি – ‘আর-রাফি’ সরাসরি জায়েয নয়। ‘আইয়ান আব্দুর রাফি’ রাখুন।
৩. কাইয়ুম, অনন্ত, অদ্বিতীয়া, রাব্বি – এগুলো আল্লাহর গুণবাচক নাম। এদেরকে ডাকার সময় সম্মানসূচক উপাধি (ভাই, স্যার) যোগ করে ডাকা জায়েয, এবং আপনার জন্য শিরকের গুনাহ হবে না যদি আপনি কেবল ব্যক্তিকে চিহ্নিত করার নিয়তে ডাকেন। তবে নাম পরিবর্তনের সুযোগ থাকলে তা করা কর্তব্য।
বিশেষ সতর্কতা:
- সন্তানের নাম রাখার আগে অর্থ ও ইসলামী বিধান জেনে নিন।
- অফিসিয়াল কাজে নাম লেখার সময় ‘আব্দ’ ছাড়া কোনো আল্লাহর নাম লিখবেন না।
- যদি কেউ নাম পরিবর্তনে অসম্মত হন, তাহলে তাকে ডাকার সময় ‘ভাই’ বা ‘স্যার’ বলার চেষ্টা করুন।
والله أعلم بالصواب