ঈলা হবে কিনা?
Waswasa-OCD · Ahle Hadith / Salafi
Question
হুজুর আমার স্ত্রী তালাক চাইত তখন আমি এড়িয়ে যেতে বলেছি , "" দেখো ৪০ দিন শারীরিক সম্পর্ক করব না অটো হবে মুখে বলাও লাগে না ঈলা হবে "" এ কথার দ্বারা কি ৪০ দিন পর তালাক হবে ? কারণ এমন বহুবার আমি বলেছি এবং এর মধ্যে আমাদের শারীরিক সম্পর্ক হয়েছে কোনোদিন ৪০ দিন পার হয়নি ।
তবে যেহেতু বলে ফেলেছি "৪০। দিন পর অটোমেটিক হবে " (এটা ইলার প্রেক্ষিতেই বুঝাতাম )শুধু এটা বলা জন্য কি শর্তযুক্ত তালাক হবে ? একটু মাশয়ালা দিবেন আফওয়ান শায়েখ
এবং উপরোক্ত ঘটনার পরবর্তীতে মাঝে মাঝে এরকম বলতাম তালাক চাইলে " ৩ মাস পর হবে অটো হবে ইনশাআল্লাহ " এখানে ঈলার কথা উল্লেখ করিনাই কারণ এই হাদীস যেহেতু আগেই বলছি স্ত্রীকে । দেখা গেছে এই বাক্য বলার কিছুদিন এর মধ্যে মিলে যাইতাম এক্ষেত্রে কি ৩ মাস পর তালাক হয়ে গেছে? আমার কথায় কি শর্ত তালাক হবে? আমি শুধুমাত্র ঈলার ভিওিতে বলতাম ৩ মাস পর অটো হবে এখানে শর্ত বা এসব নিয়ত ছিল না শর্ত তালাক কি এইটাই তো জানতাম না তখন তবুও কি শর্ত তালাক হবে
প্লিজ বাংলায় সব উওর দিন পুরো প্রশ্নের
Answer
উত্তর:
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রশ্নটি সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা প্রয়োজন। আপনার উক্তিগুলো মূলত ঈলা (শপথ করে স্ত্রী থেকে বিরত থাকা) ও শর্তযুক্ত তালাক – এই দুটি বিষয়ের সাথে সম্পর্কিত। নিচে কুরআন, হাদীস ও সালাফী উলামাদের মতামতের আলোকে উত্তর দেওয়া হলো।
১. ঈলা (إيلاء) কী?
ঈলা হল স্বামী যদি ৪ মাস বা তার বেশি সময় স্ত্রীর সাথে যৌন সম্পর্ক না করার শপথ করে। কুরআনে বলা হয়েছে:
لِّلَّذِينَ يُؤْلُونَ مِن نِّسَائِهِمْ تَرَبُّصُ أَرْبَعَةِ أَشْهُرٍ ۖ فَإِن فَاءُوا فَإِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ
وَإِنْ عَزَمُوا الطَّلَاقَ فَإِنَّ اللَّهَ سَمِيعٌ عَلِيمٌ
(সূরা আল-বাকারাহ ২:২২৬-২২৭)
অর্থ: যারা তাদের স্ত্রীদের থেকে ঈলা করে (শপথ করে বিরত থাকে), তাদের জন্য চার মাসের অপেক্ষা। যদি তারা ফিরে আসে (সম্পর্ক স্থাপন করে), তাহলে আল্লাহ ক্ষমাশীল, দয়ালু। আর যদি তারা তালাকের ইচ্ছা পোষণ করে, তাহলে আল্লাহ সবশুনেন, সবজানেন।
ঈলার হুকুম:
- যদি স্বামী ৪ মাসের মধ্যে স্ত্রীর সাথে মিলিত হয়, তাহলে ঈলা ভঙ্গ হয়েছে এবং কাফফারা দিতে হবে।
- যদি ৪ মাস পূর্ণ হয় এবং স্বামী মিলিত না হয়, তাহলে স্ত্রী বিচারকের (কাযী) কাছে গিয়ে বিচ্ছেদ চাইতে পারে। বিচারক তাকে এক তালাক দিতে পারেন। কিন্তু ৪ মাস পর অটোমেটিক তালাক হয় না – এটি একটি ভুল ধারণা।
(ইবন তাইমিয়্যা, মাজমু‘ ফাতাওয়া ৩২/২৭৪; ইবনুল কাইয়িম, যাদুল মা‘আদ ৫/২৩৪)
২. আপনার প্রথম উক্তি: "৪০ দিন শারীরিক সম্পর্ক করব না, অটো হবে, ঈলা হবে"
এখানে কয়েকটি বিষয় লক্ষণীয়:
- ৪০ দিন ৪ মাসের কম, তাই এটি ঈলা হিসেবে গণ্য হবে না। ঈলা কেবল ৪ মাস বা তার বেশি হলেই প্রযোজ্য।
- আপনি যা বলেছেন তা আসলে একটি শপথ (ইয়ামীন) – স্ত্রীর সাথে ৪০ দিন সম্পর্ক না করার শপথ।
- আপনি যদি ৪০ দিনের আগেই সম্পর্ক স্থাপন করেন (যেমনটি আপনি বলেছেন বহুবার হয়েছে), তাহলে শপথ ভঙ্গ হয়েছে এবং কাফফারা দিতে হবে।
কাফফারা ইয়ামীন:
- দশজন মিসকীনকে খাওয়ানো বা কাপড় দেওয়া, অথবা
- একজন গোলাম আজাদ করা, অথবা
- তিন দিন রোযা রাখা।
(সূরা আল-মায়েদাহ ৫:৮৯)
তালাকের ব্যাপারে:
- আপনি যদি শর্তযুক্ত তালাকের নিয়তে না বলে থাকেন (যেমন: "যদি ৪০ দিন না মিলি, তাহলে তুমি তালাক"), তাহলে কোনো তালাক হয়নি।
- আপনি যেহেতু বলেছেন "অটো হবে", কিন্তু স্পষ্টভাবে "তালাক" শব্দ বলেননি এবং শর্তও উল্লেখ করেননি, তাই এটি তালাক হিসেবে গণ্য হবে না।
শায়খ ইবনু বায (রহি.) বলেছেন:
"ঈলা কেবল ৪ মাস বা তার বেশি সময়ের জন্যই হয়। কম হলে সেটি শপথ। শপথ ভাঙলে কাফফারা দিতে হবে, তালাক হবে না।"
(মাজমু‘ ফাতাওয়া ইবনু বায ২২/৩৭)
শায়খ আল-আলবানী (রহি.) বলেছেন:
"ঈলার জন্য ৪ মাসের শপথ জরুরি। এর কম হলে তা ঈলা নয়, বরং সাধারণ শপথ।"
(সিলসিলা আহাদীস আস-সহীহাহ ৬/৫৪২)
৩. দ্বিতীয় উক্তি: "৩ মাস পর অটো হবে ইনশাআল্লাহ"
এটিও ৪ মাসের কম, তাই ঈলা নয়। আপনি যদি এটি শুধু ঈলার ভিত্তিতে বলে থাকেন (শর্তযুক্ত তালাকের নিয়ত না করে), তাহলেও:
- এটি একটি শপথ হিসেবে গণ্য হবে।
- আপনি যদি ৩ মাস পূর্ণ হওয়ার আগেই স্ত্রীর সাথে মিলিত হন (যেমন আপনি বলেছেন মাঝে মাঝে মিলিত হতেন), তাহলে শপথ ভঙ্গ হয়েছে – কাফফারা দিতে হবে।
- ৩ মাস পূর্ণ হলেও অটোমেটিক তালাক হবে না। কারণ ঈলার বিধান অনুযায়ী, তালাকের জন্য বিচারকের সিদ্ধান্ত প্রয়োজন। আর এখানে তো ঈলার শর্তই পূর্ণ হয়নি (৪ মাস না হওয়ায়)।
শায়খ সালিহ আল-ফাওযান (হাফি.) বলেছেন:
"ঈলা কেবল ৪ মাসের শপথেই হয়। এর কম হলে তা ঈলা নয়, বরং ইয়ামীন (শপথ)। আর ইয়ামীন ভাঙলে কাফফারা দিতে হবে, তালাক হবে না।"
(আল-মুনতাকা মিন ফাতাওয়া আল-ফাওযান ২/৩৬৭)
৪. আপনি কি শর্তযুক্ত তালাক দিয়েছেন?
শর্তযুক্ত তালাক হল:
- "যদি তুমি বাইরে যাও, তাহলে তুমি তালাক"
- "যদি আমি ৪০ দিন না মিলি, তাহলে তুমি তালাক"
আপনার ক্ষেত্রে:
- আপনি স্পষ্টভাবে "তালাক" শব্দ ব্যবহার করেননি
- আপনি শর্তও উল্লেখ করেননি (যেমন: "যদি আমি ৪০ দিন না মিলি, তাহলে তুমি তালাক")
- আপনি কেবল বলেছেন "অটো হবে", যা একটি অপরিষ্কার বক্তব্য
ইবনুল কাইয়িম (রহি.) বলেছেন:
"যদি স্বামী অস্পষ্ট ভাষায় কোনো কথা বলে এবং তার নিয়ত তালাক না হয়, তাহলে সেটি তালাক হিসেবে গণ্য হবে না। তালাক স্পষ্ট শব্দে বা স্পষ্ট ইশারায় হতে হবে।"
(যাদুল মা‘আদ ৫/২২৮)
সুতরাং, আপনার কোনো উক্তির মাধ্যমে তালাক হয়নি।
৫. আপনি আগে জানতেন না – এতে কি কিছু পরিবর্তন হবে?
ইসলামে অজ্ঞতা (জাহেলিয়াত) কিছু ক্ষেত্রে দায় হ্রাস করে। তবে তালাকের ব্যাপারে বিষয়টি গুরুতর। যেহেতু আপনি স্পষ্ট তালাক শব্দ বলেননি, শর্তও পরিষ্কার করেননি, এবং আপনি নিয়ত করেছিলেন ঈলা (যা আপনি সঠিকভাবে বুঝতেন না) – তাই আপনার বক্তব্য তালাক হিসেবে গণ্য হবে না।
শায়খ ইবনু উসাইমীন (রহি.) বলেছেন:
"যদি কেউ তালাকের নিয়ত না করে, তালাক শব্দও না বলে, শুধু কিছু অস্পষ্ট কথা বলে, তাহলে তা তালাক নয়।"
(শারহুল মুমতি‘ ১৩/২৭৫)
৬. আপনার করণীয়
- কোনো তালাক হয়নি – আপনি এখনো বিবাহিত। স্ত্রীকে আশ্বস্ত করুন।
- প্রতিটি শপথ ভঙ্গের জন্য কাফফারা আদায় করুন। আপনি যতবার শপথ ভেঙেছেন (৪০ দিনের শপথ, ৩ মাসের শপথ), প্রতিটির জন্য পৃথক কাফফারা দিতে হবে। তবে আপনি যদি নিয়ত করতেন একই শপথ বারবার না করার, তাহলে এক কাফফারাই যথেষ্ট হতে পারে। উত্তম হল সতর্কতা অবলম্বন করে আলাদা আলাদা কাফফারা দেওয়া।
- তওবা করুন – ভবিষ্যতে এ ধরনের অস্পষ্ট বক্তব্য থেকে বিরত থাকুন। তালাকের বিষয়ে স্পষ্ট হোন এবং ইসলামী পদ্ধতি মেনে চলুন।
- স্ত্রীর সাথে সুসম্পর্ক গড়ে তুলুন এবং প্রয়োজনে একজন আলেমের কাছে গিয়ে বিস্তারিত জানিয়ে সমস্যার সমাধান করুন।
সারসংক্ষেপ:
- আপনার বক্তব্য ঈলা হিসেবে গণ্য নয় (কারণ সময় কম)।
- আপনার বক্তব্য শর্তযুক্ত তালাক হিসেবে গণ্য নয় (কারণ স্পষ্ট শর্ত ও তালাক শব্দ নেই)।
- আপনি শুধু শপথ করেছিলেন, যা ভেঙেছেন – তাই কাফফারা দিতে হবে।
- কোনো তালাক হয়নি। আপনার বিবাহ বৈধ আছে।
والله أعلم بالصواب
আপনার প্রশ্নের উত্তর সম্পূর্ণ হলো। প্রয়োজনে আরও জানাতে পারেন।