অন্য মেয়ের কারনে উত্তেজিত অবস্থায় ১ বছরের কম মেয়ের গায়ে টাচ লাগলে কি হুরমত হয়?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
তখন দাড়াইতেছে বসতেছে এমন অবস্থা। তখন আমি ভাবলাম সরে শুই টাচ লাগলে বিপদ। তখন সরতে গিয়ে ওই অবস্থায় হাতের কবজির উলটা সাইট ১-২ সেকেন্ট এর জন্য মেয়ের গায়ে লাগে।
মেয়ের প্রতি তো কামনা বাসনা ভুলেও আসার কথা না ১ বছরের কম বয়স্ক মেয়ে। কিন্তু তার পর ও ভয়। কিন্তু গোপনাং দাড়াচ্ছিল উত্তেজিত ছিলো বাট ওই টাচের কারনে না। অন্য মেয়ের সাথে কথ বলার কারনে
এতে কি হুরমতে মুসাহারা হয়ে গেলো?
Answer
উত্তর: হুরমতে মুসাহারা হয়নি
প্রশ্নে বর্ণিত ঘটনা অনুযায়ী, আপনি আপনার এক বছরের কম বয়সী মেয়ের সঙ্গে শুয়ে ছিলেন এবং অন্য এক মেয়ের সাথে কথা বলার কারণে আপনার উত্তেজনা ও গোপনাঙ্গ শক্ত হয়ে যায়। এরপর আপনি সরে যাওয়ার সময় আপনার হাতের কবজির উল্টো পাশ ১-২ সেকেন্ড আপনার মেয়ের গায়ে লেগে যায়। এই অবস্থায় হুরমতে মুসাহারা (যার ফলে মেয়েটি আপনার জন্য চিরদিন হারাম হয়ে যায়) সাব্যস্ত হবে কি না—ইসলামী ফিকহের দৃষ্টিতে এর বিস্তারিত বিশ্লেষণ নিচে দেওয়া হলো।
১. হুরমতে মুসাহারার মূলনীতি (হানাফি মতে)
হানাফি ফিকহে হুরমতে মুসাহারা (মুহরিম হওয়া) দুটি কারণে সাব্যস্ত হয়:
- স্বামী-স্ত্রীর পূর্ণাঙ্গ মিলন (হালাল বা হারাম যেকোনো উপায়ে)
- শাহওয়াত (যৌন আকাঙ্ক্ষা) সহকারে অ-মাহরাম নারীকে স্পর্শ করা (কেশ, নখ ইত্যাদি ছাড়া শরীরের কোনো অংশ)।
তবে এই স্পর্শের ক্ষেত্রে নিম্নলিখিত শর্তগুলো জরুরি:
- স্পর্শকারী ব্যক্তি (পুরুষ) যৌন উত্তেজিত অবস্থায় থাকতে হবে (অর্থাৎ তার গোপনাঙ্গ শক্ত হবে অথবা স্পর্শ করার সময় উত্তেজনা কাজ করবে)।
- স্পর্শের উদ্দেশ্য হতে হবে যৌন কামনা (শাহওয়াত) — এমনকি যদি তা অনুভূতিহীনও হয়।
- স্পর্শ করা নারী এমন হতে হবে যে সাধারণত কামনার পাত্রী হতে পারে (সুস্থ মস্তিষ্কের অধিকারী, জীবিত)।
যদি স্পর্শটি অনিচ্ছাকৃত হয়, কিংবা স্পর্শকারীর কোনো যৌন কামনা না থাকে, অথবা স্পর্শকৃত নারী যদি এমন শিশু হয় যে সাধারণত কামনার পাত্রী নয় (যেমন ৩ বছরের নিচে বা একেবারে নাবালকা যার প্রতি পুরুষের স্বাভাবিক আকর্ষণ কাজ করে না) — তাহলে হুরমতে মুসাহারা সাব্যস্ত হবে না।
(সূত্র: রদ্দুল মুহতার, ৩/৩১২-৩১৪; ফাতাওয়া শামী, ৩/৩১২; ইমদাদুল ফাতাওয়া, ২/৪৬৩; ফাতাওয়া উসমানী, ২/৪১৭)
২. আপনার ঘটনার বিশ্লেষণ
-
আপনার উত্তেজনা: আপনার গোপনাঙ্গ শক্ত হয়েছিল অন্য মেয়ের সাথে কথা বলার কারণে, আপনার মেয়ের প্রতি কোনো কামনা বা ইচ্ছা ছিল না।
-
স্পর্শের ধরন: আপনি নিজে সরে যাচ্ছিলেন যাতে মেয়ের গায়ে লেগে না যায়; এটি সম্পূর্ণ অনিচ্ছাকৃত এবং মাত্র ১-২ সেকেন্ড স্থায়ী ছিল।
-
স্পর্শের অঙ্গ: হাতের কবজির উল্টো পাশ (কবজির পিছন দিক) যা সাধারণত কামোদ্দীপক স্পর্শ বলে গণ্য হয় না।
-
স্পর্শকৃত শিশু বয়স: আপনার মেয়ের বয়স ১ বছরের কম। এই বয়সের শিশু সাধারণত যৌন কামনার পাত্রী হয় না। ইসলামি ফিকহে ২-৩ বছরের কম বয়সী শিশুর ক্ষেত্রে শাহওয়াত সহকারে স্পর্শ করলেও হুরমতে মুসাহারা সাব্যস্ত হয় না—বরং অধিকাংশ হানাফি ফকীহর মতে, ছেলে বা মেয়ে উভয় ক্ষেত্রেই ২ বছরের নিচে হলে স্পর্শের কারণে হুরমতে মুসাহারা হয় না। (সূত্র: রদ্দুল মুহতার, ৩/৩১৩; ফাতাওয়া আলমগীরী, ১/২৭৯; বাহেশতী জেওর, ৭/২১)
-
আপনার মানসিক অবস্থা: আপনি নিজেই লিখেছেন, “মেয়ের প্রতি তো কামনা বাসনা ভুলেও আসার কথা না”—এটি সুস্পষ্ট যে আপনার কোনো কু-ইচ্ছা ছিল না।
৩. সিদ্ধান্ত ও ফতোয়া
উপরোক্ত আলোচনার ভিত্তিতে আপনার মেয়ের সাথে এই অনিচ্ছাকৃত স্পর্শের কারণে হুরমতে মুসাহারা সাব্যস্ত হয়নি। আপনার মেয়ে আপনার জন্য মাহরাম (যার সাথে বিবাহ চিরদিনের জন্য হারাম) ছিলই, এখনও তাই আছে এবং ভবিষ্যতেও তাই থাকবে। এতে কোনো নতুন হারামিয়াত বা নিষিদ্ধতা এসেছে বলে মনে করার কোনো কারণ নেই।
তবে, এই ঘটনা থেকে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা নেওয়া জরুরি:
-
গুনাহ থেকে সাবধানতা: আপনি যখন নিজের স্ত্রী ছাড়া অন্য কোনো নারীর সাথে যৌন উত্তেজনা সৃষ্টি হয় এমন কথা বলেন, এটি অশালীন কাজ ও গুনাহ। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَلَا تَقْرَبُوا الزِّنَا ۖ إِنَّهُ كَانَ فَاحِشَةً وَسَاءَ سَبِيلًا
“আর ব্যভিচারের কাছেও যেও না, নিশ্চয় তা অশ্লীল ও নিকৃষ্ট পথ।” (সূরা বনী ইসরাঈল, আয়াত: ৩২)নারী-পুরুষের সাথে বিনা প্রয়োজনে কথাবার্তা কিংবা উত্তেজনাপূর্ণ নজর বিনিময় থেকেও বিরত থাকা উচিত। তওবা করুন।
-
সন্তানের সাথে ঘুমানো: নিজের সন্তান (ছেলে বা মেয়ে) সাথে ঘুমানো স্বাভাবিক হলেও, উত্তেজিত অবস্থায় সেরকম অবস্থানে থাকা বিপজ্জনক। তাই আপনি যেমন সরে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন, ঠিক তেমনি শেষ পর্যন্ত উত্তেজিত অবস্থায় নিজের সন্তানের গায়ে লাগতে পারে এমন কোনো অবস্থা এড়িয়ে চলুন।
-
নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করুন: আপনি যদি প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ হন, তাহলে শাহওয়াত নিয়ন্ত্রণ করা আপনার দায়িত্ব। অশ্লীল কথাবার্তা, অপ্রয়োজনীয় নারীদের সাথে যোগাযোগ এসমস্ত বিষয় থেকে দূরে থাকাই উত্তম।
৪. প্রাসঙ্গিক কুরআন ও হাদিস
-
কুরআন:
وَالَّذِينَ هُمْ لِفُرُوجِهِمْ حَافِظُونَ
“আর যারা নিজেদের লজ্জাস্থানকে সংরক্ষণ করে।” (সূরা মু’মিনূন, আয়াত: ৫)
إِلَّا عَلَىٰ أَزْوَاجِهِمْ أَوْ مَا مَلَكَتْ أَيْمَانُهُمْ فَإِنَّهُمْ غَيْرُ مَلُومِينَ
“তবে তাদের স্ত্রী বা তাদের মালিকানাধীন দাসীদের ছাড়া; নিশ্চয় তারা এতে নিন্দিত হবে না।” (সূরা মু’মিনূন, আয়াত: ৬) -
হাদিস:
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: **“তোমাদের প্রত্যেকের জন্য নিজ স্ত্রীর সাথে মিলন করাও সাদাকা।” সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেন: “ইয়া রাসূলাল্লাহ, নিজ স্ত্রীর সাথে কামনা চরিতার্থ করায় সওয়াব হয়? তিনি বললেন: “তোমরা কি মনে কর যদি হারাম পথে তা চরিতার্থ করতে, তাহলে কি গুনাহ হতো? ঠিক তেমনি হালাল পথে চরিতার্থ করায় সওয়াব হয়।” (মুসলিম: ২৩৯০)
শিক্ষা: কামনা বাসনা চরিতার্থ করতে হবে শুধুমাত্র হালাল পথে (বিবাহের মাধ্যমে)।
৫. পরামর্শ
- এই ঘটনার পরে আপনার মেয়ের সাথে আগের মতোই আচরণ করুন। ওর প্রতি কোনো ধরনের কু-নজর সহকারে কিছু মনে করবেন না।
- আপনার স্ত্রীর সাথে বৈধ সম্পর্ক আরও মজবুত করুন এবং অপ্রয়োজনীয় নারীদের সাথে কথা বলা, দেখা-সাক্ষাৎ করা বন্ধ করুন।
- যদি আপনি অতীতে অন্য কোনো নারীর প্রতি কু-প্রবৃত্তি নিয়ে কিছু করে থাকেন, তাহলে তা থেকে তওবা করুন। আল্লাহ তওবাকারীকে ক্ষমা করেন।
উত্তর সংক্ষেপে:
আপনার মেয়ের সাথে ঘটনাক্রমে স্পর্শের কারণে হুরমতে মুসাহারা হয়নি। এ নিয়ে কোনো দুশ্চিন্তার প্রয়োজন নেই। তবে অন্য নারীর সাথে অশালীন কথাবার্তা ও উত্তেজিত অবস্থায় সন্তানের সাথে এক বিছানায় থাকা থেকে বিরত থাকা জরুরি।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে হারাম থেকে বেঁচে থাকার তাওফিক দান করুন। আমীন।