সৌদি আরবে বসবাসের জন্য দুআ করছি, এভাবে দুয়া করা উচিত হচ্ছে কি?
Halal and Haram · Hanafi
Question
আমার হাসবেন্ড বর্তমানে একটি বিধর্মী দেশে পড়াশুনা করছেন। এখন আমার ইচ্ছা বাকি পড়াশুনা যেন সে কোনো মুসলিম দেশে কন্টিনিউ করে। আমি কি সৌদি আরবে তার পড়াশুনা কন্টিনিউ করা এবং পরবর্তীতে সেখানে আমাদের বসবাসের জন্য আল্লাহর কাছে দুয়া করতে পারব?
আমার কাছে মনে হয় সেখানে বসবাস করলে ক্যারিয়ারের পাশাপাশি আল্লাহ চাইলে সে দ্বীনি পরিবেশ পাবে। আর আমার যেহেতু ইসলামিক বিষয়ে ভবিষ্যতে আরো পড়াশুনা করার ইচ্ছা আছে, আমি ও সেরকম একটা পরিবেশ পেতে পারি।
আমার হাসবেন্ড এর সাবজেক্ট অনুযায়ী দেশে ভালো ক্যারিয়ার গড়ার সুযোগ খুবই কম। তাছাড়া বেশ কিছু পারিপার্শ্বিক কারণে মনে হয় বাইরে কোথাও সেটেল হলেই উত্তম হবে, দেশে থাকার ইচ্ছা উঠে গেছে।
সব কিছুর উর্ধ্বে মেইন বিষয় রাসূলের দেশের জন্য এক বিশেষ আকুলতা সৃষ্টি হয়েছে, যা নিবারণ করা কষ্টকর। আমি ইতিমধ্যে আল্লাহর কাছে সৌদি বসবাসের জন্য দুয়া করেছি। কিন্তু বুঝতে পারছি না আমার এরূপ আকুলতা আর দুয়া করা ঠিক হচ্ছে কি না।
Answer
بسم الله الرحمن الرحيم
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারকাতুহ
প্রথমেই আপনার প্রশংসনীয় মানসিকতার জন্য আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করছি। আপনি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর দেশের প্রতি যে আকুলতা অনুভব করছেন এবং দ্বীনি পরিবেশের জন্য চেষ্টা করছেন, তা অত্যন্ত প্রশংসনীয়। এখন প্রশ্ন হচ্ছে—এই আকুলতা ও দু‘আ করা কি শরী‘আতসম্মত?
উত্তর: সৌদি আরবে বসবাসের জন্য দু‘আ করা জায়েয এবং উত্তম
আপনার ইচ্ছা ও দু‘আ সম্পূর্ণ জায়েয এবং শরী‘আতের দৃষ্টিতে উৎসাহিত। নিম্নে এর কারণ ও প্রমাণ পেশ করছি:
১. দ্বীনি পরিবেশ ও ইলম অর্জনের গুরুত্ব
ইসলামে কল্যাণমূলক ও দ্বীনি পরিবেশে বসবাস করা অত্যন্ত পছন্দনীয়। আল্লাহ তাআলা বলেন:
إِنَّ الَّذِينَ آمَنُوا وَهَاجَرُوا وَجَاهَدُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ
“নিশ্চয়ই যারা ঈমান এনেছে, হিজরত করেছে এবং আল্লাহর পথে জিহাদ করেছে…” (সূরা আনফাল: ৭৪)
হিজরতের মূল উদ্দেশ্য হলো দ্বীন সংরক্ষণ ও উত্তম পরিবেশ লাভ করা। সৌদি আরব মক্কা-মদিনার পবিত্র ভূমি, সেখানে দ্বীনি শিক্ষা ও পরিবেশ অত্যন্ত সমৃদ্ধ। তাই আপনার স্বামী ও নিজের জন্য সেখানে পড়াশোনা ও বসবাসের পরিকল্পনা করা ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে উত্তম।
২. হাদীসে রাসূলের দেশের প্রতি ভালোবাসা
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) মক্কা ত্যাগের সময় বলেছিলেন:
وَاللَّهِ إِنَّكِ لَخَيْرُ أَرْضِ اللَّهِ وَأَحَبُّ أَرْضِ اللَّهِ إِلَى اللَّهِ
“আল্লাহর কসম! তুমি আল্লাহর সর্বোত্তম ভূমি এবং আল্লাহর নিকট সবচেয়ে প্রিয় ভূমি।” (তিরমিযী: ৩৯২৫)
এই হাদীস প্রমাণ করে মক্কা (এবং পুরো সৌদি আরব) আল্লাহর নিকট বিশেষ মর্যাদার অধিকারী। তাই এ ভূমির প্রতি আকুলতা ও সেখানে বসবাসের দু‘আ করাও ভালোবাসারই বহিঃপ্রকাশ।
৩. হানাফি ফিকহের দলিল
ইমাম আবূ হানীফা (রহ.)-এর মতে, যেসব স্থানে দ্বীন পালন সহজ হয়, সেখানে হিজরত করা মুস্তাহাব। (রদ্দুল মুহতার: ৪/১২২) ইবনু আবিদীন (রহ.) লিখেছেন:
“মুসলিমদের জন্য অমুসলিম দেশে বসবাস করা ততক্ষণ পর্যন্ত মাকরূহ নয়, যতক্ষণ ধর্মীয় স্বাধীনতা থাকে; তবে উত্তম হলো মুসলিম দেশে বসবাস করা।” (রদ্দুল মুহতার: ৪/১২২)
আপনার স্বামী বর্তমানে বিধর্মী দেশে থাকলেও তিনি পড়াশোনা শেষ করে মুসলিম দেশে যেতে চান—এটি অত্যন্ত প্রশংসনীয়।
৪. ক্যারিয়ার ও পারিপার্শ্বিক কারণ
ইসলাম বৈধ উপায়ে জীবিকা ও ক্যারিয়ার গঠনের অনুমতি দেয়। আপনার স্বামীর সাবজেক্ট অনুযায়ী দেশে ভালো সুযোগ না থাকায় বিদেশে সেটেল হওয়া জায়েয, বিশেষত যদি সেখানে দ্বীনি পরিবেশ ও বৈধ জীবনযাপন নিশ্চিত হয়। দু‘আ করার মাধ্যমে আল্লাহর নিকট উত্তমটি চাওয়া ঈমানের দাবি।
৫. দু‘আ ও আকুলতার বিধান
দু‘আ কোনো ভালো বিষয়ের জন্য করা জায়েয। আপনি যদি আল্লাহর সন্তুষ্টি ও দ্বীনের কল্যাণের জন্য সৌদি আরব চান, তবে তা ইবাদত হিসেবে গণ্য হবে। রাসূল (ﷺ) বলেছেন:
الدُّعَاءُ هُوَ الْعِبَادَةُ
“দু‘আ ইবাদতের মূল।” (তিরমিযী: ৩৩৭১)
আপনার আকুলতা যদি রাসূলের দেশের প্রতি ভালোবাসা ও দ্বীনি পরিবেশ লাভের তাগিদে হয়, তবে তা প্রশংসনীয়।
কিছু শর্ত ও সতর্কতা
- নিয়ত পরিশুদ্ধ করুন: মনে রাখবেন মূল লক্ষ্য আল্লাহর সন্তুষ্টি ও দ্বীন সংরক্ষণ, কেবল ক্যারিয়ার নয়।
- ইস্তিখারা করুন: সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আল্লাহর কাছে ইস্তিখারা (সালাতুল ইস্তিখারা) করুন।
- সৌদি আরবের আইন মেনে চলুন: সেখানে বসবাস করলে স্থানীয় আইন ও সংস্কৃতির প্রতি সম্মান জানানো জরুরি।
উপসংহার
আপনার ইচ্ছা ও দু‘আ সম্পূর্ণ জায়েয। আপনি নিশ্চিন্তে আল্লাহর কাছে আপনার স্বামীর পড়াশোনা সৌদি আরবে সম্পন্ন করার এবং সেখানে বসবাসের জন্য দু‘আ করতে পারেন। আপনার আকুলতা স্বাভাবিক ও উত্তম। আল্লাহ তাআলা আপনার নেক ইচ্ছা পূরণ করুন এবং আপনার পরিবারকে দ্বীনি পরিবেশ দান করুন। আমীন।
وَاللَّهُ أَعْلَمُ بِالصَّوَابِ