মিথ্যা অভিজ্ঞতার সার্টিফিকেট তৈরি করে কমিশন নেওয়ার বিধান।
Halal and Haram · Hanafi
Question
উত্তরের আশায় অপেক্ষয়মান।
Answer
প্রশ্নের উত্তর:
আপনার কাজটি সম্পূর্ণরূপে হারাম এবং গুনাহের কাজ। কারণ:
১. মিথ্যা সার্টিফিকেট তৈরি করা: বাস্তবে কারো ২-৩ বছরের কাজের অভিজ্ঞতা না থাকলে মিথ্যা সার্টিফিকেট তৈরি করা স্পষ্ট জালিয়াতি (Forgery) এবং প্রতারণা। ইসলামে মিথ্যা বলা, প্রতারণা করা এবং জালিয়াতি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। কুরআনে আল্লাহ বলেন:
"আর তোমরা নিজেদের মধ্যে একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না এবং মানুষের সম্পদের কিছু অংশ জেনেশুনে অন্যায়ভাবে গ্রাস করার জন্য মামলা-মোকদ্দমার মাধ্যমে শাসকদের কাছে পেশ করো না।" (সূরা বাকারা: ১৮৮)
এছাড়া হাদীসে রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
"যে ব্যক্তি আমাদের প্রতি প্রতারণা করে, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়।" (সহীহ মুসলিম)
২. মধ্যস্থতাকারী হিসেবে দায়িত্ব: আপনি যদি শুধু মধ্যস্থতাকারী হন, তাহলেও আপনার কাজটি হারাম, কারণ আপনি অন্যায় কাজে সহযোগিতা করছেন। আল্লাহ বলেন:
"সৎকর্ম ও তাকওয়ায় তোমরা একে অপরকে সাহায্য করো, পাপ ও সীমালঙ্ঘনে সহযোগিতা করো না।" (সূরা মায়িদা: ২)
৩. কমিশন / সার্ভিস চার্জ নেওয়ার বিধান:
- সাধারণত কোনো হালাল কাজের মধ্যস্থতা করলে কমিশন নেওয়া জায়েজ। কিন্তু এখানে কাজটি নিজেই হারাম (মিথ্যা সার্টিফিকেট তৈরি), তাই এর বিনিময়ে টাকা নেওয়াও হারাম।
- আপনি প্রতি সার্টিফিকেটে ৮০০ টাকা নিচ্ছেন, যেখানে আপনার খরচ মাত্র ২০০ টাকা। অর্থাৎ ৬০০ টাকা লাভ করছেন। মোট ৪০০০ টাকা খরচ করে ১৬০০০ টাকা নিচ্ছেন, অর্থাৎ ১২০০০ টাকা লাভ। এই অতিরিক্ত লাভ শুধু তখনই জায়েজ হবে যদি কাজটি বৈধ হয়। কিন্তু যেহেতু কাজটি হারাম, তাই পুরো টাকাই হারাম।
তওবা ও টাকা ফেরত দেওয়ার বিধান:
- যদি আপনি ইতিমধ্যেই এই কাজ করে ফেলেন এবং অর্থ উপার্জন করে থাকেন, তাহলে তওবা করতে হবে এবং প্রাপ্ত অর্থ ফেরত দেওয়া wajib (অবশ্যই প্রয়োজন)। কেননা আপনাকে প্রতারণার মাধ্যমে টাকা নেওয়ার কারণে ঋণ (জিম্মা) আছে।
- তওবা কবুল হওয়ার শর্ত:
১. কাজটি বন্ধ করা,
২. কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত হওয়া,
৩. ভবিষ্যতে না করার দৃঢ় সংকল্প করা,
৪. যদি কারো হক নষ্ট করে থাকেন, তবে তা আদায় করা (অর্থাৎ যাদের কাছ থেকে টাকা নিয়েছেন, তাদের ফেরত দেওয়া)।
আপনার প্রশ্ন: "আমার টাকা নেওয়া টা কি হারাম হবে? আমারো তো শ্রম দিতে হচ্ছে।"
- উত্তর: হারাম কাজে শ্রম দিলেও তা যায়েজ হয় না। কারণ শ্রমের বিনিময় বৈধ হতে হলে কাজটি হালাল ও বৈধ হতে হবে। এখানে কাজটি মিথ্যা ও প্রতারণামূলক, তাই শ্রমের কোনো মূল্য ইসলামে নেই।
উপসংহার ও পরামর্শ:
- অবিলম্বে এই কাজ বন্ধ করুন।
- আপনি প্রতারণার মাধ্যমে যাদের কাছ থেকে টাকা নিয়েছেন, তাদের সন্ধান করে সেই টাকা ফেরত দিন। যদি ফেরত দেওয়া সম্ভব না হয় (যেমন তাদের খুঁজে পাওয়া না যায়), তাহলে সাওয়াবের নিয়তে দান করে দিন।
- তবে সতর্কতা: দান করলেও যাদের হক নষ্ট করেছেন, তাদের নিকট ক্ষমা চাওয়া আবশ্যক। ইমাম আবু হানিফা ও অন্যান্য হানাফি ফকীহগণ বলেছেন: "হারাম উপার্জন থেকে তওবা করতে হলে মালিকের কাছে ফেরত দেওয়া জরুরি, তা না হলে দান করলেও কবুল হবে না।" (ফাতাওয়া উসমানি, ২/৪৫; রদ্দুল মুহতার, ৬/৩৮৪)
আল্লাহ তাআলা বলেন:
"নিশ্চয়ই আল্লাহ তওবাকারীদের ভালোবাসেন এবং পবিত্রতা অর্জনকারীদের ভালোবাসেন।" (সূরা বাকারা: ২২২)
আপনি যদি সত্যিই অনুতপ্ত হয়ে তওবা করেন এবং ক্ষতিগ্রস্তদের হক আদায় করেন, তাহলে আল্লাহ মাফ করবেন ইনশাআল্লাহ।
রেফারেন্স:
- কুরআন: সূরা বাকারা: ১৮৮, সূরা মায়িদা: ২
- হাদীস: সহীহ মুসলিম, "প্রতারণা" অধ্যায়
- ফাতাওয়া উসমানি (২/৪৫, ২/১২০)
- রদ্দুল মুহতার (৬/৩৮৪-৩৮৫, ইমদাদুল ফাতাওয়া)
- আল-হিদায়া (জালিয়াতি অধ্যায়)
- বাহিশতি জেওর (প্রতারণা ও জালিয়াতি)
সর্বোত্তম জ্ঞান আল্লাহর নিকট।