সহশিক্ষা সম্পর্কে ইসলামী হুকুম
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
উত্তর:ক্ষতিতে যা লিখেছি ছাড়লে সেগুলা থেকে কিছুটা হলেও বাঁচা সম্ভব হতো,কারন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,যে ব্যক্তি বসে আছে সে দাঁড়িয়ে থাকা ব্যক্তির থেকে নিরাপদ,......
সহশিক্ষায় গেলে যেসব ক্ষতি বা ঝামেলার সম্মুখীন হতে হবে?
উত্তর :
সেই এসএসসি পরীক্ষা দেওয়ার আগে প্রাইভেট, স্কুলে যাওয়া ছেড়ে দিয়েিছলাম,অনলাইনে করতাম,যখন পরীক্ষা শুরু হলো,বাহিরে বের হয়ে আসলাম,তত ইমানি জজবা কমতে লাগলো,নজর হেফাজত 💔,গুনাহের পরিবেশে নরমাল লাগা শুরু করলো,সালাতে খুশু হারিয়ে গেলো,লম্বা সিজদা হারিয়ে গেলো,কান্নাও যেন বিলাসিতা হয়ে গেলো,কোমলত্ব, নূর হারিয়ে গেলো,আগের মতো তেমন ঘৃণা আসে নাহ সহশিক্ষার প্রতি,কারণ ওই যে জায়েজ আছে+উম্মাহর খিদমত+রোজগারের জন্য পড়া(মাহরাম কেউ না থাকলে তখন নিজে টিউশনি করিয়ে........ এই কথাগুলোই যেনো সহশিক্ষাকে নরমাল করার মাধ্যম।(আমার ক্ষেত্রে)
সবাই ঘরে ঢুকলে উম্মাহর খিদমত করবে কে,ডাক্তার হবে কে,
ইচ্ছে করছে সব ছেড়ে দিয়ে ঘরে ঢুকে যেতে,রবের দ্বীন পালন করবো,সংসার করবো,গুরুজনের সেবা করবো,বাচ্চা লালন পালন করবো,দ্বীনের ইলম অর্জন করবো, দ্বীনি শিক্ষা দিব,যতটুকু দুনিয়াবি শিখেছি ততটুকুই অন্যকে শিক্ষা দিব,
প্রয়োজনেও ঘর থেকে বের হতে মন চায় নাহ,মন চায় জীবনসঙ্গীর সাথে ফিতনা বিহীন কোথাও ঘুরতে যেতে,
চাকরি করতে মন চায় নাহ,আমাকে রব যে দায়িত্ব দিয়েছেন(পুরো নারী জাতিকে),সেটাই প্রকৃত কম্ফোর্টেবল জোন,সেখান থেকে নিজেকে প্রয়োজনে কিংবা অপ্রয়োজনে নিজেকে বের করলেই বিপদ,ক্ষতি হয়ই,
★কলেজে যেসব সমস্যার সম্মুখীন হই—
*পুরো রাস্তা হেঁটে যেতে হয়,১৫,২০ মিনিট লাগে,কলেজ কাছেই আছে তাই,যাওয়ার সময় বেশ অস্বস্তিকর লাগে, না জানি কোনখান দিয়ে পর্দা নষ্ট হয়ে গেলো,মায়ের বোরকা লং করে বানাতে দেয় নি,যার কারনে বোরকা উপরে উঠে যায় হাঁটার সময়,পায়জামা দেখা যায়,চোখের হেফাজত করতে কষ্ট হয়,বার বার পথ অতিক্রম করা লাগে যার কারনে আশেপাশে দেখতে হয়,
* ক্লাসে প্রবেশ এর সময় ছেলেদের সামনে দিয়ে ক্লাসে প্রবেশ করা লাগে, যা খুবই খারাপ লাগে,তারপর এক বিল্ডিং থেকে অন্য বিল্ডিং এ যাওয়া লাগে,যার দরুন ছেলেমেয়ে একসাথে দাঁড়িয়ে থাকে অন্য ক্লাসে প্রবেশের জন্য,মেয়েদের সাথে থাকলেও যেন মনে হয় আমার গায়ে ফিতনার বাতাস এসে লাগে,নজর হেফাজত 💔,
* একা থাকতে পারি নাহ এখন,সহপাঠী কাউকে খুঁজে নেই,কারন শয়তান তো সব জায়গায় সুযোগ খুঁজে, সেখানের কেউ প্র্যাকটিসিং নাই,তাই দ্বীনি সার্কেলও নেই,তাদের সাথে পড়াশোনার খাতিরে মিশলেও সমস্যা হয়,কারন ফোনে গান চালিয়ে দেয়,দুনিয়াবি কথা বেশি বলে,যা আমার উপর ইফেক্ট ফেলে,আমি চেষ্টা করতে পারি,কিন্তু একটা ভালো আম যখন ৯ টা খারাপ আমের সাথে মিশে,তখন ওই ১ টাও নষ্ট হয়ে যায়,ফরজ পরিমান ইলম ও নেই,কিভাবে তাদের দাওয়াত দিব,তাই এ মাসে আইওএম এর ফারজে আইন কোর্সে ভর্তি হইচি দেড় মাসের ডিউরেশন।
* ক্লাসে স্যার যখন পড়া বুঝায়,নজর চলেই যায় তাদের দিকে,নাহলে মনোযোগ আসে নাহ,ভয়ে থাকি না জানি আমাকে এই বুঝি দাঁড়িয়ে পড়া জিজ্ঞেস করলো,সামনে ডেকে নিয়ে গেলো,💔
পড়া না পারলে হেনতেন কতা কিছু জিজ্ঞেস করে,
* ছুটি হওয়ার সময় একসাথে ছেলেমেয়ে বের হয়,যার দরুন ছেলেদের খুব কাছ দিয়েও যেতে হয়,
* কলেজে অ্যাটেন্ডেন্স না থাকলে সেই নাম্বার দিবে নাহ,যার দরুন ৩ দিনই যেতে হয়,মা বাবাকে বললেও বুঝে নাহ, আরও নিয়েছি ফিজিক্স,ক্লাস না করলে বুঝবো না কিছু,মানে স্যারদের সাথে তালে তাল মিলিয়ে করা লাগবে, প্র্যাকটিকেলে স্যারদের প্রশ্নের জবাব দিতে হবে, নাহলে অপমান করবে,,যদিও আমি নিউ অনার্সে পড়ি,আরও কতো নব্যফিতনা আছে,আমি ভালো করে জানি নাহ সেটা,কারন গিয়েছি কলেজে অল্প কয়েকদিন।
*যেদিনই কলেজে যাই শরীর খুব দুর্বল হয়ে যায়,স্বলাতে দাঁড়ালে খুশু আসে নাহ,যা উপরেই বলেছি।
* মা অসুস্থ, বাবা কাজে থাকেন,মা একা হয়ে জান আমি বাহিরে গেলে,তাই মা একাই সব রান্না বান্না সব করা লাগে একা হাতে,খুব অসুস্থ হয়ে জান সেদিন যেদিন কলেজে জাই,তারপরেও মা বলবে,আমি কষ্ট করি,তারপরেও তুই পড়ালেখা করে মানুষ হ।এতে কি মায়ের হক নষ্ট হয় নাহ??
* প্রাইভেট পড়া শুরু করলে আরো পাগল হই জামু,
*যদি না পড়ি তাহলে মা আরও কষ্ট পান।
★ঘরে যে সকল সমস্যা হয় :
* তারা সন্তুষ্ট হন শুধু একাডেমিক পড়া পড়লে,ইসলামিক কোনো বই পড়া দেখলেই তারা রাগ করেন,বলে সময় নষ্ট হয়,আজকেও মাইর খাইচি,পর্দা গাইডলাইন বইটা পড়ার কারনে।এভাবে আমার পড়ার প্রতি আগ্রহ নষ্ট হয়ে যায়,এখন আবার চেষ্টা করছি,
*যদি বলি ছেড়ে দিব সহশিক্ষা ,মনে হচ্ছে বড় কোনো কিছুই হবে,দ্বীন মানা আরও কঠিন হবে,অত্যাচার করবে,কথা শুনাবে,দ্বীনের ইলম অর্জন করতে পারছি নাহ,দ্বীনের ইলমে ১ ঘন্টা সময় দিলেও তারা মনে করে সময় নষ্ট।
*সালাতে মন বসে নাহ সহজে,দুয়ায় একাগ্রতা আসে নাহ,,
সহশিক্ষাকে কতটুকু অপছন্দ করেন?
উত্তর:তীব্রভাবে করি,আমি পরীক্ষাও দিতাম নাহ,মা আমার পায়ে ধরে বলেছে পরীক্ষা দেওয়ার জন্য,কান্না করে দিয়েছে,তাই আর পারলাম নাহ,ইস্তিখারা করার পর দিয়েছি পরীক্ষা,টিকেও গেচি।
এখন যেন নরমাল হয়ে যাচ্ছে,গুনাহের পরিবেশে গেলে কি, গুনাহের আঁচ আমার গায়ে লাগবে নাহ?
বিয়েও হয়নি, তাই খুব শূন্যতা অনুভব করছি গায়রতবান জীবনসঙ্গীর,সে থাকলে হয়তো এই পরিবেশে যেতেই দিতো নাহ,আল্লাহ ভালো জানে।
এই পড়াশুনাতে কতোটুকু আগ্রহ পান?
উত্তর: আমার তেমন আগ্রহ নেই একাডেমিক পড়ার প্রতি,তবে যেহেতু সন্তানকে শিক্ষা দেওয়ার জন্য হলেও পড়তে হবে,উম্মাহর খিদমত,এসব ভেবে পড়ায় মন বসাতে চাই,কিন্তু যখন দেখি আমার ইমান নিয়া টানাটানি শুরু হয়,গুনাহ আমাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরতে থাকে তখনই বিষাদ লাগে,যদি না পড়ি তাহলে তে মা বাপের হক নষ্ট হবে তাই নাহ??
যে পড়াশোনা আমাকে রবের প্রিয় হতে দেয় নাহ,সেটাতে কিসের আগ্রহ আসবে?
এখন আমি কি করতে পারি?
ছাড়তেও পারি নাহ,গিলতেও পারি নাহ,,যতই নিজের প্রয়োজনেই বের হই তবুও ইমানি জজবা কমে,নূর নষ্ট হতে থাকে,
নারীদের কতটুকু ইলম অর্জন করলে সে দুনিয়া ও আখিরাতে ২ টাতেই সম্মানিত হতে পারবে??
আফওয়ান আপু, বেশ বড় হয়ে গেলো,মাফ করে দিয়েন,কষট হলেও পুরাটা পড়িয়েন,,একটু সাহায্য করুন আপু,ইং শা আল্লাহ, জাঝাকিল্লাহু খয়রন ফিদ্দুনিয়া ওল আখিরহ🌻
আসসালামু আলাইকুম আপু,একটু বললে মুনাসিব হয়,,আমি যদি সহশিক্ষা ছেড়ে দেই আমাকে তাহকে দ্বীনের ইলম বা দ্বীন পালন করতে দিবে নাহ(দিলেও কঠিন হয়ে যাবে?)
যদি সহশিক্ষায় গিয়ে পড়ি,বা দুনিয়াবি ইলম অর্জন করি তাহলে দ্বীনের বিষয়ে ছাড় দেন,তাও যদি দুনিয়াবি ইলমের থেকে যদি দ্বীনের ইলমে একটু বেশি সময় দিই,তাহলে অনেক বকে,মারেও।
তখন বলে আমি নাকি সারাক্ষন আরবি নিয়ে পড়ে থাকি,
সহশিক্ষায় পড়তে গিয়ে আমার ক্ষতি হচ্ছে,মানে আমি হচ্ছে ওইরকম,আমার মধ্যে অন্যের প্রভাব সহজে পড়,যেই পরিবেশে থাকি,এজন্যই আমি সহশিক্ষা পড়তে চাই নাহ,,
★ আরেকটি বিষয়,আমি আপনাদের ফারজে আইন দেড়মাসের কোর্সটা নিয়েছি,+ অন্য একটা একাডেমিতে নাজেরা পড়ছি,তো সেগুলার ক্লাস রাতে হয়,৭:৩০-৮:৫০ পর্যন্ত,নাজেরা ৮:৩০ থেকে,তো রাতের আর বেশি একাডেমিক পড়তে পারি নাহ,তাই মা বেশ রাগ করেন,অনেক কথা শুনায়,জানিনা নাহ ২ টা কোর্স ই করতে দিবে কিনা!!
আমি কি করবো শাইখ,,ফরজ পরিমান ইলমও যদি শিখতে না পারি, আমার দুনিয়ার পড়া দিয়ে কি হবে?
Answer
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।
আপনার দীর্ঘ ও হৃদয়গ্রাহী প্রশ্নটি পড়ে আমরা আপনার দ্বীনি উদ্বেগ ও চেষ্টা বুঝতে পারছি। আল্লাহ তাআলা আপনার এই চেষ্টা ও চিন্তাকে কবুল করুন এবং আপনার জন্য সহজ পথ বের করে দিন। আমিন।
আপনার প্রশ্নের সাথে সংযুক্ত বিভিন্ন দিক রয়েছে—সহশিক্ষার বিধান, পিতামাতার আনুগত্য, ফরজ ইলম অর্জনের প্রয়োজনীয়তা এবং নারীর জীবনের লক্ষ্য। আমরা ক্রমান্বয়ে উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করব, ইনশাআল্লাহ।
১. সহশিক্ষা (ছেলে-মেয়ে একত্রে শিক্ষা) কি ইসলামী দৃষ্টিতে জায়েজ?
ইসলাম নারী-পুরুষের পৃথকীকরণ ও পর্দা অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে। কুরআন ও হাদিসে স্পষ্ট নির্দেশ আছে যে, নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা হারাম।
- কুরআন: يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ قُلْ لِأَزْوَاجِكَ وَبَنَاتِكَ وَنِسَاءِ الْمُؤْمِنِينَ يُدْنِينَ عَلَيْهِنَّ مِنْ جَلَابِيبِهِنَّ (সূরা আল-আহযাব: ৫৯) — হে নবী, আপনার স্ত্রী ও কন্যাদের এবং মুমিনদের স্ত্রীদের বলুন, তারা যেন তাদের বড় চাদর নিজেদের ওপর টেনে দেয়।
- হাদিস: لَا يَخْلُوَنَّ رَجُلٌ بِامْرَأَةٍ إِلَّا كَانَ ثَالِثَهُمَا الشَّيْطَانُ (তিরমিযি) — কোনো পুরুষ কোনো নারীর সাথে নির্জনে মিলিত হবে না, তবে তাদের তৃতীয়জন হবে শয়তান।
- হানাফি ফিকাহ: রদ্দুল মুহতার (১/৪০৬)-এ এসেছে, নারী-পুরুষের মেলামেশা ও দেখাদেখি নিষিদ্ধ, যদি না শরয়ি প্রয়োজন থাকে (যেমন চিকিৎসা, সাক্ষ্য ইত্যাদি) এবং সেও পর্দার সঙ্গে।
- বেহেশতী জেওর (ভলিউম ২, অধ্যায় ‘পর্দা’)-এ মাওলানা আশরাফ আলী থানভী (রহ.) বিস্তারিত বলেন যে, বিদ্যালয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গিয়ে সাধারণত পর্দা রক্ষা কঠিন হয়, তাই তা থেকে দূরে থাকাই উত্তম।
সহশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সাধারণত পর্দা ও গোয়া-গারদ রক্ষা করা অত্যন্ত কঠিন। আপনার নিজস্ব অভিজ্ঞতায় আপনি যেভাবে নজর হেফাজতের কষ্ট, সালাতে খুশু কমে যাওয়া, শারীরিক দুর্বলতা—এসব বর্ণনা করেছেন, তা সম্পূর্ণ বাস্তব। হাদিসে এসেছে, যে ব্যক্তি বসে আছে সে দাঁড়িয়ে থাকা ব্যক্তি অপেক্ষা নিরাপদ (তিরমিযি)। অর্থাৎ যে সরাসরি ফিতনার পরিবেশে যায়, সে অধিক ঝুঁকিতে থাকে।
সারসংক্ষেপ: সহশিক্ষায় অংশগ্রহণ জায়েজ হবে না যদি তাতে পর্দা ভঙ্গ, নারী-পুরুষের অননুমোদিত মেলামেশা, বা দ্বীনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। আপনার বর্তমান অবস্থায় সেটি স্পষ্টই আপনার ইমান ও আমলের ক্ষতি করছে। তাই আপনাকে বের হওয়ার পথ খুঁজতে হবে।
২. পিতামাতার বিরোধিতা ও আনুগত্যের সীমা
আপনি জানতে চেয়েছেন, সহশিক্ষা ছেড়ে দিলে আপনার মা-বাবা কি দ্বীনি শিক্ষা থেকে বিরত রাখবেন?
ইসলামে পিতামাতার আনুগত্য ওয়াজিব, কিন্তু সেটা কেবল বৈধ বিষয়ে। لَا طَاعَةَ لِمَخْلُوقٍ فِي مَعْصِيَةِ الْخَالِقِ — সৃষ্টিকর্তার নাফরমানীতে সৃষ্টির আনুগত্য নেই। (মুসনাদ আহমদ)
সুতরাং যদি আপনার মা-বাবা আপনাকে এমন শিক্ষায় বাধ্য করেন যা আপনার দ্বীনের জন্য ক্ষতিকর (যেমন পর্দা ভঙ্গ বা ফিতনার পরিবেশ), নবীজি (সা.)-এর হাদিস অনুযায়ী আপনার ওপর তাদের কথা মানা জরুরি নয়। তবে মুমিনের উচিত নম্রতা ও কৌশলে বোঝানো।
- রদ্দুল মুহতার (৯/৫৫৩)-এ এসেছে, পিতা-মাতা যদি সন্তানকে এমন কাজে বাধ্য করেন যা তার দ্বীনের জন্য ক্ষতিকর, তবে সন্তান তা প্রত্যাখ্যান করতে পারে এবং তাদের সন্তুষ্টির জন্য নিজের দ্বীনি বাধ্যবাধকতা পরিত্যাগ করবে না।
- ফতোয়ায়ে উসমানি (২/২৫৮)-এ মুফতি তকি উসমানি (দা. বা.) লেখেন, “পড়াশোনা যদি দ্বীন ও ঈমান বিনষ্ট করার কারণ হয়, তবে তা ত্যাগ করা ফরজ, যদিও পিতামাতা অসন্তুষ্ট হন।”
তবে আপনি তাদের সাথে উত্তম ব্যবহার করবেন, তাদের জন্য দোয়া করবেন, এবং সম্ভব হলে বিকল্প ব্যবস্থা—যেমন অনলাইন ক্লাস, মেয়েদের স্কুল/কলেজ (যদি থাকে) —গ্রহণের চেষ্টা করবেন।
৩. নারীর কতটুকু ইলম অর্জন করা ফরজ?
ইসলাম বলে, طلب العلم فريضة على كل مسلم — ইলম অর্জন করা প্রত্যেক মুসলিমের ওপর ফরজ। (ইবনে মাজাহ) এটি ফরজে আইন (প্রত্যেকের জন্য আবশ্যক) ও ফরজে কিফায়া (সমাজের জন্য যথেষ্ট) দুই প্রকার।
- ফরজে আইন ইলম: তওহিদ, নামাজ, রোজা, হালাল-হারাম, পর্দা, বিবাহ ইত্যাদি জীবনের মৌলিক বিষয় জানা।
- নারীর জন্য ফরজে আইন ইলম অর্জন করা যেমন ফরজ, তেমনি তার সন্তান ও পরিবারকে দ্বীনি শিক্ষা দেওয়াও তার দায়িত্ব।
আপনি ইতিমধ্যে ফারজে আইন কোর্স ও নাজেরা শুরু করেছেন—এটি খুব ভালো উদ্যোগ। এই ইলম অর্জনের জন্য আপনার সাধ্যমত চেষ্টা করা ফরজ। বাকি দুনিয়াবি শিক্ষা (সায়েন্স, আর্টস ইত্যাদি) ফরজে কিফায়া বা অনুমোদিত, তবে তাও পর্দা ও দ্বীনি চেতনা রক্ষা করে হতে হবে। আপনার ক্ষেত্রে একাডেমিক পড়াশোনা আপনার ঈমানের জন্য ক্ষতিকর হচ্ছে, তাই আপনি ফরজ ইলম অর্জনে বেশি সময় দেওয়ার অধিকার রাখেন।
মা’রিফুল কুরআন (সূরা আল-মুজাদিলা, ৫৮:১১)-এর তাফসিরে মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) লেখেন, ইসলামী ইলম অর্জন নারী-পুরুষ সবার জন্য ফরজ; কিন্তু দুনিয়াবি ইলম যতটুকু প্রয়োজন ততটুকুই যথেষ্ট।
৪. আপনার বর্তমান পরিস্থিতিতে করণীয়
আপনি লিখেছেন—ছাড়তেও পারছেন না, গিলতেও পারছেন না। তবে আপনি ইতিমধ্যে একটি ফারজে আইন কোর্স ও নাজেরা শুরু করেছেন। নিচের পদক্ষেপগুলো বিবেচনা করতে পারেন:
১. প্রথম অগ্রাধিকার: আপনার ফরজ ইলম অর্জন চালিয়ে যান। এটি আপনার ঈমান রক্ষার মূল ভিত্তি। মায়ের রাগ ও বকা সত্ত্বেও আপনি এগুলো চালিয়ে যান, তবে মায়ের সাথে নরম আচরণ করুন এবং তাকে বুঝানোর চেষ্টা করুন।
২. সহশিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে ধীরে ধীরে সরে আসা:
- কলেজে অ্যাটেন্ডেন্স বাধ্যতামূলক থাকলে, কেবল জরুরি ক্লাসে যান, এবং পূর্ণ পর্দা মেনে চলুন (যত লম্বা বোরকা সম্ভব, মুখ ঢাকা, চোখের পর্দা)।
- সম্ভব হলে মেয়েদের জন্য আলাদা কলেজ বা অনলাইন প্রোগ্রাম খুঁজুন। যদি না থাকে, তাহলে নিজে পড়াশোনা করে শুধু পরীক্ষা দিন (একাডেমিক পরীক্ষা জায়েজ) — তবে ক্লাসে না গেলে মা-বাবাকে বোঝান।
- মা-বাবার সামনে দলিল পেশ করুন—তাদের বলুন আপনার ঈমান নষ্ট হচ্ছে, আর ঈমান নষ্ট হলে তারা এর জন্য জবাবদিহি করবেন।
৩. মা-বাবার সাথে আলোচনা:
- তাদের বোঝানোর চেষ্টা করুন, আপনি একাডেমিক পড়াশোনা পুরোপুরি ছাড়ছেন না, বরং দুনিয়াবির পাশাপাশি দ্বীনি ইলমও নিচ্ছেন। দেখান যে দ্বীনি শিক্ষার কারণে আপনি চাকরি বা সমাজসেবায় আরও ভালোভাবে অবদান রাখতে পারবেন।
- তবে যদি তারা অতিরিক্ত রাগান্বিত হন এবং আপনাকে দ্বীনি শিক্ষা থেকে বিরত রাখেন, তাহলে আপনি মেনে চলবেন না (যেহেতু তা নাফরমানি)। তবে চুপিসারে সময় বের করে পড়বেন।
৪. অন্যের প্রভাব থেকে বাঁচা:
- আপনি লিখেছেন, “একটা ভালো আম যখন ৯টা খারাপ আমের সাথে মিশে, তখন ওই ১টাও নষ্ট হয়ে যায়।” এটি একটি বাস্তব উপলব্ধি। তাই আপনার উচিত যতটা সম্ভব একা থাকা বা অন্তত দ্বীনি বান্ধবী খোঁজা। যদি না পান, তাহলে ক্লাসে একেবারে প্রয়োজন মেটানো এবং বাকি সময় বাড়িতে কাটানো।
- নির্দিষ্ট সময়ে কুরআন তিলাওয়াত, জিকির ও দোয়া করুন—এগুলো আপনার ঈমানি জজবা বাড়াবে।
৫. নিজের ভবিষ্যত পরিকল্পনা:
- আপনি চাকরির পরিবর্তে ঘরোয়া জীবন, সংসার, সন্তান লালন-পালন ও দ্বীন শিক্ষায় আগ্রহী। এটি নারীর জন্য উত্তম পথ। ইসলাম নারীর প্রাথমিক দায়িত্ব ঘর ও পরিবারকে দ্বীনি চেতনায় গড়ে তোলার কথা বলে।
- বেহিশতী জেওর-এ মাওলানা থানভী (রহ.) বলেন, “সর্বোত্তম নারী সেই, যে আপন ঘরে থাকে ও পরিবারের দ্বীনি তরবিয়ত করে।”
- আপনি যদি বিবাহ না করেই থাকেন, তাহলে আল্লাহর কাছে দোয়া করুন—একজন গায়রতমান ও দ্বীনদার স্বামী দান করুন। তিনি আপনার জীবনসঙ্গী হলে সহশিক্ষার ফিতনা থেকে রক্ষা পেতে পারতেন। এখনও সময় আছে; আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করুন।
৫. বিশেষ উত্তর: আপনার ছোট ছোট প্রশ্ন
প্রশ্ন: “সহশিক্ষায় গেলে কি গুনাহের আঁচ আমার গায়ে লাগবে?”
উত্তর: হাদিসে এসেছে—إِنَّ الْعَبْدَ لَيُحْرَمُ الرِّزْقَ بِالذَّنْبِ يُصِيبُهُ (ইবনে মাজাহ) — বান্দা কখনো কখনো নিজের গুনাহের কারণে রিজিক থেকে বঞ্চিত হয়। গুনাহের পরিবেশে থাকার কারণে আপনি যদি পাপ না-ও করেন, তবুও আপনার ঈমানের ওপর প্রভাব পড়ে। তাই গুনাহের আঁচ অবশ্যই লাগে—মনে, চিন্তায়, শরীরে। আপনার ইমানের দুর্বলতা ও সালাতে খুশু চলে যাওয়া তার প্রমাণ।
প্রশ্ন: “যে পড়াশোনা রবের প্রিয় হতে দেয় না, সেটাতে কিসের আগ্রহ আসবে?”
উত্তর: একেবারে সঠিক কথা। তাই আপনার অগ্রাধিকার হল সেই ইলম—যা আপনাকে আল্লাহর নৈকট্য দান করে। একাডেমিক পড়াশোনা শুধু প্রয়োজন হিসেবে, কিন্তু অন্তর না দিয়ে, ফরজ ইলমের বিকল্প নয়।
প্রশ্ন: “মায়ের হক নষ্ট হয় নাকি আমি না পড়লে?”
উত্তর: আপনার মা যদি আপনাকে একাডেমিক পড়াশোনায় বাধ্য করেন, সেটা তার দৃষ্টিভঙ্গি। কিন্তু আপনার ওপর ফরজ হলো এমন ইলম অর্জন করা যা আপনার ঈমান রক্ষা করে। মায়ের আনুগত্য যদি আপনাকে ফরজ ইলম থেকে বিরত রাখে, তাহলে মায়ের আনুগত্য না করে আপনি আল্লাহর হক (ফরজ ইলম) আদায় করবেন। এবং মায়ের সাথে সদ্ব্যবহার করবেন, তার সেবা করবেন, কিন্তু সীমার মধ্যে।
৬. ফারজে আইন কোর্স ও নাজেরা—মায়ের রাগ
আপনি বলেন, রাতে ৭:৩০-৮:৫০ পর্যন্ত ক্লাস, তারপর নাজেরা আরেকটি একাডেমিতে। মা রাগ করেন এবং বলেন একাডেমিক পড়া হয় না।
এক্ষেত্রে আপনার কর্তব্য:
- মাকে বোঝান যে এই কোর্সগুলো আপনার ঈমানের জন্য অত্যাবশ্যক।
- সময় ব্যবস্থাপনা করুন—একাডেমিক পড়া দিনের বেলায় করুন, আর দ্বীনি ক্লাস রাতে।
- আপনি ফারজে আইন কোর্সটি দেড় মাসের—এটি শেষ করাই উচিত। এরপর হয়তো আপনি একাডেমিক পড়ায় বেশি সময় দিতে পারবেন।
৭. উপসংহার ও দোয়া
প্রিয় বোন,
আপনি যে দ্বীনের ব্যাপারে এত চিন্তিত ও সচেতন, এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে বড় নেয়ামত। অনেক মেয়ে একাডেমিক পড়াশোনায় মগ্ন হয়ে দ্বীন ভুলে যায়, কিন্তু আপনি ইমানের কথা ভাবছেন—এটি খুব বড় সাফল্য।
আমাদের পরামর্শ:
- সবার আগে ফরজ ইলম অর্জন করুন—আপনার কোর্স ও নাজেরা শেষ করুন।
- সহশিক্ষার পরিবেশ থেকে ধীরে ধীরে সরে আসুন—যতটা সম্ভব কম যান, পূর্ণ পর্দা পালন করুন, প্রয়োজনে অনলাইনে পড়ার ব্যবস্থা নিন।
- মা-বাবার সাথে নরম আচরণ করুন—তাদের দোয়া চান, কিন্তু দ্বীনের ব্যাপারে আপস করবেন না।
- আল্লাহর কাছে বেশি করে দোয়া করুন—সজ্ঞানে একটি দ্বীনদার ও গায়রতমান জীবনসঙ্গীর জন্য, এবং নিজের ইমান রক্ষার জন্য।
- মনে রাখবেন, আপনি যদি দ্বীনের জন্য কষ্ট করেন, আল্লাহর সাহায্য আসবে। কুরআনে এসেছে—وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا (সূরা আত-তালাক: ২) — যে আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য বের হওয়ার পথ তৈরি করে দেন।
রেফারেন্স সমূহ:
- কুরআন: সূরা নূর (২৪:৩০-৩১), সূরা আহযাব (৩৩:৫৯)
- হাদিস: তিরমিযি (২১৬৫), ইবনে মাজাহ (২২৪), মুসনাদ আহমদ
- হানাফি ফিকাহ: রদ্দুল মুহতার (১/৪০৬; ৯/৫৫৩), ফতোয়ায়ে উসমানি (২/২৫৮), বেহেশতী জেওর (পর্দা অধ্যায়), মা’রিফুল কুরআন (মুফতি শফি রহ.-এর তাফসির)
- ফতোয়ায়ে আলমগিরি (৫/৩৫৩): নারীদের জন্য মসজিদে যাওয়া ও বাজারে যাওয়ার নিয়ম
- আল-হিদায়া: পর্দা সংক্রান্ত বিধান
- শারহু মা’আনি আল-আসার (তাহাবী): হাদিসের ব্যাখ্যায় পর্দার গুরুত্ব
আল্লাহ তাআলা আপনাকে সবচেয়ে ভালো পথ দেখান, আপনার ইমান মজবুত করুন, এবং আপনার মা-বাবাকে সঠিক পথ বুঝানোর তাওফিক দান করুন। আমিন।