টাকা তুলে কুরবানী দেয়া যায়?

Qurbani-Slaughtering · Hanafi

Question No: 203
Questioner: Nishat Nuha
Question Asked: 17 May 2026, 12:24 PM
Reviewed & Published: 17 May 2026, 03:57 PM
Views: 17
Tokens: 3,372
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম,
অনলাইনে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান নফল কুরবানীর জন্য যেকোনো পরিমাণ দান করতে বলে যা দিয়ে গরিব এলাকায় নফল কুরবানী দেয়া হয়, এতে ওই এলাকার গরিবদের মাংস বিতরণ করা হয়।
যে কোনো পরিমান টাকা তোলে এভাবে নফল কুরবানী দেয়া যায়? সেক্ষেত্রে কুরবানীটা কার হয়? এর সাওয়াব কী?
জাযাকাল্লাহ খাইর

Answer

ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।

আপনার প্রশ্নের জন্য জাযাকাল্লাহ খাইর। অনলাইনে নফল কুরবানীর জন্য যেকোনো পরিমাণ অর্থ সংগ্রহ করে গরিব এলাকায় কুরবানী দেওয়ার বিষয়টি ইসলামী ফিকহের দৃষ্টিতে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে বিশ্লেষণ করা জরুরি।

নফল কুরবানীর শারঈ বিধান ও শর্ত

নফল কুরবানী একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। হানাফি ফিকহ অনুযায়ী, নফল কুরবানী করার জন্য নির্দিষ্ট কিছু শর্ত ও পদ্ধতি রয়েছে:

১. পশু ও শরিকানা: নফল কুরবানীতে গরু/মহিষে সর্বোচ্চ ৭ ভাগ (শরিক) এবং ছাগল/ভেড়া/দুম্বায় ১ ভাগে কুরবানী করা যায়। প্রতিটি ভাগ একটি নির্দিষ্ট ব্যক্তির পক্ষ থেকে হতে হবে। একাধিক ব্যক্তি মিলে একটি পশু কুরবানী করলে প্রত্যেকের অংশ নির্দিষ্ট (যেমন ১/৭) হতে হবে এবং প্রত্যেকেই নিজ নিজ নামে কুরবানীর নিয়ত করবেন।

২. অর্থের পরিমাণ ও অংশীদারিত্ব: নফল কুরবানীতে কেউ যদি ১০০ টাকা, কেউ ৫০০ টাকা, আবার কেউ ১০০০ টাকা দেয়, তাহলে তা শুদ্ধ হবে না। কারণ, কুরবানীর পশুর মূল্যের উপর ভিত্তি করে প্রত্যেকের অংশ সমানুপাতিক হবে না, বরং প্রতিটি অংশ নির্দিষ্ট ও সমান হতে হবে। উদাহরণস্বরূপ, একটি গরু ৭ ভাগে কুরবানী করলে ৭ জন অংশীদারীর প্রত্যেকের জন্য সমান পরিমাণ অর্থ (মোট মূল্যের ১/৭) নির্ধারণ করতে হবে।

আপনার বর্ণিত পদ্ধতিতে কী সমস্যা?

আপনি যে পদ্ধতির কথা উল্লেখ করেছেন, সেখানে ‘যেকোনো পরিমাণ টাকা’ সংগ্রহের মাধ্যমে নফল কুরবানী করা ফিকহি দৃষ্টিকোণ থেকে শুদ্ধ নয়। কারণ:

  • অনির্দিষ্ট অংশীদারিত্ব: কে কত টাকা দিল, তার ভিত্তিতে পশুর মালিকানা নির্ধারিত হয় না। এটি একটি অস্পষ্ট ও অনিশ্চিত লেনদেন।
  • সঠিক নিয়ত ও উদ্দেশ্য: যারা টাকা দিচ্ছেন, তাদের মধ্যে অনেকে হয়তো কুরবানীর সওয়াব লাভের নিয়তে দিচ্ছেন, কিন্তু তাদের অর্থের পরিমাণ ও পশুর মূল্যের সাথে সামঞ্জস্য না থাকায় এটি কুরবানী হিসেবে গণ্য হবে না।
  • সওয়াবের অনিশ্চয়তা: যেহেতু কুরবানীটি কার পক্ষ থেকে হচ্ছে তা স্পষ্ট নয়, তাই দানকারীরা কুরবানীর পূর্ণ সওয়াব পাবেন না। বরং তাদের দানটি সাধারণ সাদকা হিসেবে গণ্য হবে।

কুরবানীটি কার হবে এবং সওয়াব কী?

  • কুরবানী কার হবে: এই পদ্ধতিতে কুরবানীটি মূলত প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে বা সেই ব্যক্তির পক্ষ থেকে হচ্ছে, যিনি প্রকৃতপক্ষে পশুটি ক্রয় ও জবাই করছেন। অন্যদের দেওয়া অর্থ শুধুমাত্র একটি সাহায্য বা দান হিসেবে গণ্য হবে।
  • সওয়াব কী: এখানে টাকা দাতারা কুরবানীর সওয়াব পাবেন না বরং তারা সাধারণ দান-সাদকার সওয়াব পাবেন। আর প্রতিষ্ঠান বা উদ্যোক্তা ব্যক্তি যদি নফল কুরবানীর নিয়ত করে থাকেন, তবে তিনি কুরবানীর সওয়াব পাবেন।

হানাফি ফিকহের নির্দেশনা

  • ইমাম আবু হানিফা (রহ.) ও তাঁর অনুসারীদের মতে, নফল কুরবানীর জন্য পশুতে অংশীদারিত্ব নির্দিষ্ট ও সুষম হতে হবে। যেকোনো পরিমাণ অর্থ দিয়ে অংশীদার হওয়া জায়েজ নয়। (সূত্র: রদ্দুল মুহতার, ফাতাওয়া হিন্দিয়া)
  • মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) ও মুফতি তাকি উসমানি (দা.ব.) -এর মতেও নফল কুরবানীতে অর্থের পরিমাণ সমান না হলে বা অংশীদারিত্ব স্পষ্ট না হলে কুরবানী শুদ্ধ হবে না এবং অংশীদাররা কুরবানীর সওয়াব পাবে না। (সূত্র: জাওয়াহিরুল ফিকহ, ফাতাওয়া উসমানি)
  • মা’আরিফুল কুরআনে উল্লেখ আছে, কুরবানীর মূল উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন এবং নির্ধারিত পদ্ধতি অনুসরণ করা। পদ্ধতি লঙ্ঘন করলে ইবাদতটি পূর্ণাঙ্গ হয় না।

সতর্কতা ও সুপারিশ

  1. নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠান বেছে নিন: কোনো প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নফল কুরবানী দিতে চাইলে নিশ্চিত হোন যে তারা ইসলামী শরীয়াহ মোতাবেক পূর্ণ একটি কুরবানী পরিচালনা করছে। অর্থাৎ, তারা পূর্ণ একটি পশুর মূল্য (গরুর ১ ভাগ বা ছাগলের পূর্ণ মূল্য) নির্ধারণ করে দিচ্ছে এবং আপনার নামে নির্দিষ্টভাবে কুরবানী করছে।
  2. স্বচ্ছতা নিশ্চিত করুন: প্রতিষ্ঠানকে জিজ্ঞাসা করুন: "আপনারা কি পূর্ণ একটি কুরবানীর জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ (যেমন গরুর ১ ভাগের মূল্য) নিয়ে থাকেন? নাকি যেকোনো পরিমাণ অর্থ নেন?" যদি তারা যেকোনো পরিমাণ অর্থ নেয়, তবে বুঝবেন এটি শরীয়াহসম্মত নয়।
  3. নিজে কুরবানী করুন: নফল কুরবানীর জন্য সর্বোত্তম উপায় হলো নিজে বা নিজ পরিবারের পক্ষ থেকে পূর্ণ একটি পশু কুরবানী করা। যদি তা সম্ভব না হয়, তাহলে কোনো নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পূর্ণ একটি কুরবানীর (গরুর ১ ভাগ বা ছাগল) মূল্য পরিশোধ করে তাদের মাধ্যমে কুরবানী করানো।

সারসংক্ষেপ

  • যেকোনো পরিমাণ টাকা দিয়ে নফল কুরবানী দেওয়া যায় না। এটি ফিকহি দৃষ্টিকোণ থেকে শুদ্ধ নয়।
  • কুরবানীটি কার হবে তা স্পষ্ট নয়, তবে সাধারণত প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে হবে বলে ধরা হয়।
  • দানকারী ব্যক্তি কুরবানীর সওয়াব পাবেন না, বরং সাধারণ দানের সওয়াব পাবেন।
  • সঠিক পদ্ধতি হলো পূর্ণ একটি কুরবানীর জন্য নির্ধারিত পরিমাণ অর্থ (যেমন গরুর ১ ভাগের বর্তমান বাজার মূল্য) প্রদান করা এবং প্রতিষ্ঠানকে আপনার নামে কুরবানী করার নির্দেশ দেওয়া।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সহীহ বুঝ দান করুন এবং আমাদের ইবাদতগুলোকে কবুল করুন। (আমিন)

জাযাকাল্লাহ খাইর।



This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.